চীনের নেতৃত্বে ২৯ দেশের এআই জোট, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কী চ্যালেঞ্জ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে গত শুক্রবার চীনের সাংহাই শহরে শুরু হয়েছে একটি শীর্ষ সম্মেলন। এ আয়োজন চার দিন ধরে চলবে। এ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রযুক্তি দুনিয়ার পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে বেইজিং।
‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন’ (ডব্লিউএআইসি) নামের এই সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতি এআই খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই প্রযুক্তির ওপর যেন কোনো একটি দেশের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, তাঁর এ মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করেই। প্রযুক্তি ও এআই খাতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা এখন তীব্র। দুই দেশই মনে করে, এ খাতে প্রতিপক্ষের অগ্রগতি অন্য পক্ষকে আটকে দেওয়ার সচেতন প্রচেষ্টার অংশ।
সম্মেলনের প্রথম দিন চীন এমন সব অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রদর্শন করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে।
চীনের তৈরি এআই মডেলগুলো বিশ্বজুড়ে ক্রমে বেশি হারে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। তাই বেইজিং নিজেকে নতুন বৈশ্বিক এআই ব্যবস্থার নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তারা চেষ্টা করছে, দ্রুত বিকাশমান এই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানানো।
শীর্ষ সম্মেলন শুরুর আগের দিন গত বৃহস্পতিবার ‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থা’ (ডব্লিউএআইসিও) গঠনের ঘোষণা দেয় চীন। সাংহাইয়ে এ সংস্থার ২৯টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা এতে স্বাক্ষর করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
২০১৮ সালে যাত্রা শুরুর পর এবার নবমবারের মতো বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন (ডব্লিউএআইসি) অনুষ্ঠিত হলো। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল—‘এআই পার্টনারশিপ ফর আ ব্রাইটার ফিউচার’ বা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে এআই অংশীদারত্ব।
এআইয়ের উন্নয়ন কোনো একক দেশের একক প্রদর্শনী হওয়া উচিত নয়। এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি সিম্ফনি হওয়া উচিতসি চিন পিং, চীনের প্রেসিডেন্ট
সি চিন পিং কী বলেছেন
ওপেন-সোর্স এআই যে ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ এনে দিয়েছে, তা কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে ডব্লিউএআইসির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সি চিন পিং বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর এআই সক্ষমতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে চীন ভূমিকা রাখছে, যাতে ‘নতুন ধরনের ঐতিহাসিক বৈষম্য’ তৈরি না হয়। পাশাপাশি আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে এআই খাতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
সির ভাষ্যে, ‘এআইয়ের উন্নয়ন কোনো একক দেশের একক প্রদর্শনী হওয়া উচিত নয়। এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি সিম্ফনি (ঐকতান) হওয়া উচিত।’
চীনের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘এআই খাতে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে অতিরঞ্জিত করা বা একটি দেশের নিরাপত্তাকে অন্য দেশের নিরাপত্তার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার চেষ্টার বিরোধিতা আমাদের যৌথভাবে করতে হবে।’
এআই উন্নয়নে ‘মানুষকেন্দ্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গির ওপরও জোর দেন সি। তিনি বলেন, উপযুক্ত বিধিবিধান, প্রযুক্তিগত নজরদারি, আগাম সতর্কতা ও জরুরি পদক্ষেপের মতো সুরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে, ‘এআই সব সময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’
ডব্লিউএআইসিও কী
‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থা’ (ডব্লিউএআইসিও) নামের আন্তসরকারি সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে গত বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) গঠিত হলেও গত বছর থেকে বৈশ্বিক এআই জোট গঠনের ধারণা প্রচার করে আসছিল বেইজিং।
সংস্থাটির ঘোষিত লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং বিভিন্ন দেশে এমন এআই নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে প্রযুক্তিটি মানুষের জন্য নিরাপদ ও উপকারী হয়।
সাংহাইভিত্তিক ডব্লিউএআইসিওর ২৯ প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল, রাশিয়া ও পাকিস্তানের মতো ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ।
বিশ্লেষকদের ধারণা, জাতিসংঘে এআই–সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের জন্য বেইজিং এই জোটকে ব্যবহার করতে পারে।
‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থা’ (ডব্লিউএআইসিও) গঠনের ঘোষণা দিয়েছে চীন। সাংহাইয়ে এ সংস্থার ২৯টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদেশের প্রতিনিধিরা এতে স্বাক্ষর করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
চীনের শিল্পনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চিপ (ইলেকট্রনিক যন্ত্রের মূল উপাদান) উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়ে ব্যবহার পর্যন্ত স্বনির্ভর একটি দেশীয় এআই পরিবেশ গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে দেশটি।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের ‘চিপ যুদ্ধ’ আরও তীব্র হয়েছে। উন্নত সামরিক অস্ত্র ও এআইভিত্তিক ব্যবস্থার মতো চিপনির্ভর প্রযুক্তির উৎপাদনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় রয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির শীর্ষ এই দুই দেশ।
সবচেয়ে আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর (চিপ তৈরির মূল উপাদান) পাওয়ার ক্ষেত্রে চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। তারপরও এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল ডেটা সেন্টার চালানোর সক্ষমতায় এগিয়ে রয়েছে দেশটি। পাশাপাশি চিপ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ উৎপাদনেও চীনের আধিপত্য রয়েছে।
স্বল্প মূল্যের বিদ্যুতের প্রাচুর্যও চীনকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। এআই প্রযুক্তির বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে দেশটি এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্প্রসারণের ফলে এই ব্যবধান আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর মাধ্যমে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সমর্থন নিয়ে প্রযুক্তি পরিচালনায় রাষ্ট্রকেন্দ্রিক যে দৃষ্টিভঙ্গি চীন অনুসরণ করে, সেটিকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চায় বেইজিং।অরিন্দ্রজিৎ বসু, সুশাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ
যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে চীনের ওপর প্রযুক্তি আমদানিতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। বেইজিংয়ের দাবি, চীনের এআই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ চীনে সদর দপ্তর থাকা বা চীনা মূল কোম্পানির অধীন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করে। জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর কাছে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য (ডুয়েল ইউজ) প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করে বেইজিং।
এদিকে এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। বিশেষ করে সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে এআই সম্মেলনের আয়োজন এবং ডব্লিউএআইসিও জোটের নেতৃত্ব দিয়ে এআই–সংক্রান্ত বৈশ্বিক নীতিমালা প্রণয়নে প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে বেইজিং।
বৈশ্বিক এআই ব্যবস্থায় ডব্লিউএআইসিওর অবস্থান কোথায়
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রথম ডব্লিউএআইসিও গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।
তখন বিশ্লেষকেরা ধারণা করেছিলেন, চীন শুধু নিজস্ব এআই অবকাঠামো রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের আগে বৈশ্বিক এআই নীতিমালা ও প্রতিষ্ঠান গঠনে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্ব পর্যায়ে নিজের স্বার্থ প্রতিফলিত করার চেষ্টা করছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইন্টারনেটের উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া এবং এর বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর কারণে দীর্ঘদিন ধরে এ প্রযুক্তি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে চীন। এ কারণে নিজ দেশের ভেতরে ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণ ও আলাদা কাঠামোর মধ্যে রাখার চেষ্টা করেছে বেইজিং।
সাংহাইভিত্তিক ডব্লিউএআইসিওর ২৯ প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল, রাশিয়া ও পাকিস্তানের মতো ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগে আন্তর্জাতিক কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া চীনের জন্য সেই প্রবণতা বদলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মধ্যম ও নিম্ন আয়ের যেসব দেশ চীনের ঘনিষ্ঠ, তাদের সমর্থন জাতিসংঘে বেইজিংয়ের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তনপ্রতিষ্ঠান ‘কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’-এর জন্য লেখা এক বিশ্লেষণে সুশাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অরিন্দ্রজিৎ বসু লিখেছেন, ‘ওয়াশিংটন যখন বৈশ্বিক সাইবার ও এআই নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া থেকে দ্রুত সরে যাচ্ছে এবং সাইবার কূটনীতিতে আর্থিক সহায়তাও কমিয়ে দিচ্ছে, তখন বেইজিং বৈশ্বিক নেতৃত্ব দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।’
তিনি আরও লেখেন, ‘এর মাধ্যমে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সমর্থন নিয়ে প্রযুক্তি পরিচালনায় রাষ্ট্রকেন্দ্রিক যে দৃষ্টিভঙ্গি চীন অনুসরণ করে, সেটিকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চায় বেইজিং।’