ট্রাম্প কেন গ্রিনল্যান্ডে আগ্রহী
আরেকটি সপ্তাহ, আরও একটি উদ্ভট আবহাওয়া, যেমনটা হয়তো আপনি কখনো শোনেননি।
আমি যখন এটা লিখছি, যুক্তরাজ্য তখন দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা এক ঝড় আর তুষারপাতের (ওয়েদার বম্ব) মোকাবিলা করতে গুটিসুটি হয়ে ঘরে বসে আছে। আবার দ্য গার্ডিয়ানের খবর বলছে, সুমেরু অঞ্চলের বল্গা হরিণেরা ঠিক উল্টো পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করছে। সেখানে অস্বাভাবিক উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে বৃষ্টিপাত বাড়ছে আর বৃষ্টির পানি মাটির ওপর কঠিন বরফ হয়ে জমে যাচ্ছে। বল্গা হরিণেরা তাদের খুর দিয়ে খুঁড়ে সহজে খাবার খুঁটে তুলতে পারছে না।
সুমেরুর মতো প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা নির্ভর করে নিবিড়ভাবে খাপ খাওয়াতে পারার ওপর। সেখানে আবহাওয়ার ধারায় সামান্য পরিবর্তনও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে, আর সেটা শুধু বল্গা হরিণের ওপরই পড়ে না।
মালিকানার সঙ্গে একটি যে সুবিধা আসে, তা হলো ভূগর্ভস্থ বিপুল সম্পদের ওপর অধিকার। বরফে জমা দেশটি উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেসব সম্পদ উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে।
কয়েক দশক ধরেই রাজনীতিকেরা আসন্ন ‘জলবায়ু যুদ্ধ’ নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, এই সংঘাতের নেপথ্যে থাকবে খরা, বন্যা, দাবানল ও ঝড়ের মতো দুর্যোগ, যা মানুষকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করবে অথবা ফুরিয়ে আসা প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেবে।
অনেকে হয়তো ভেবেছিলেন, এই সংকট নাতিশীতোষ্ণ মৃদু আবহাওয়ার ইউরোপের দোরগোড়ায় কড়া নাড়বে না। এটা বিপর্যয় ঘটাবে দূরের কোনো খরাপীড়িত মরুভূমিতে বা সমুদ্রে ডুবতে থাকা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপে। তাঁদের জন্য এ সপ্তাহে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নিয়ে হোয়াইট হাউসের আপাতদৃষ্টিতে উদ্ভট কথাবার্তা এক চাঁছাছোলা বার্তা।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রধান জেনারেল স্যার গুইন জেনকিন্স বেশ কিছুদিন ধরেই বলে আসছেন যে জলবায়ু সংকটের কারণে উত্তর মেরুতে বরফ গলে যাওয়ার বিষয়টি এক তীব্র প্রতিযোগিতার সূচনা করেছে। প্রতিযোগিতাটি বরফমুক্ত হতে থাকা সুমেরু অঞ্চলে সম্পদ, ভূখণ্ড এবং আটলান্টিকে প্রবেশের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পথ নিয়ে।
এই পরিস্থিতি উত্তর ইউরোপের জন্য কতটা হুমকিস্বরূপ, তা বুঝতে হলে কোনো মানচিত্রের দিকে না তাকিয়ে, একটি গ্লোবের ওপরের দিক থেকে দেখুন।
পূর্বাভাস বলছে, ২০৪০-এর দশকের শুরুর দিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সুমেরুর চারপাশের বরফশীতল জলরাশি গ্রীষ্মকালে প্রায় বরফমুক্ত হয়ে পড়বে। এই জলরাশি হচ্ছে রাশিয়াকে কানাডা ও গ্রিনল্যান্ড থেকে আলাদা করা মহাসাগরটি।
এর ফলে এশিয়া থেকে উত্তর আমেরিকায় যাওয়ার একটি নতুন সংক্ষিপ্ত পথ খুলে যেতে পারে। পৃথিবীর মধ্যভাগ ঘুরে না গিয়ে পথটি সরাসরি ওপরের দিক দিয়ে যাবে। এটি বাণিজ্য, জাহাজ চলাচল ও মৎস্য আহরণের জন্য নতুন পথ তৈরি করবে। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, আক্রমণের জন্যও নতুন পথ খুলে দেবে।
গলে যাওয়া বরফের নিচ থেকে সংঘাতের নতুন এক ক্ষেত্র উন্মোচিত হচ্ছে এবং এর ওপর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে ক্রমেই জড়িয়ে পড়ছে চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র।
অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা যখন সুমেরু অঞ্চলকে স্বৈরাচারী শাসকের দাবার বোর্ডে পরিণত করছে, তখন পথের কাঁটা হয়ে থাকা দুর্ভাগা এলাকাগুলো ঘুঁটি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এদের মধ্যে পড়েছে গ্রিনল্যান্ড থেকে শুরু করে কানাডার বিস্তীর্ণ এলাকা, আছে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষিত নরওয়ের স্ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জ।
একদিক দিয়ে দেখলে, বরফগলা মেরুর হুমকির মতো এর সুযোগগুলোও এসব দেশের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। না হলে সুমেরুর এই সীমান্ত রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কেনই–বা মিত্র অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করাটা জরুরি মনে করবে?
ট্রাম্প ইউক্রেনে নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে বিরল খনিজ উত্তোলনের অধিকার চেয়েছিলেন, আর গাজায় বোমাবিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপের ওপর হোটেল তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাহলে পরিবেশগত বিপর্যয় থেকেও চটজলদি কিছু মুনাফা কামিয়ে নেওয়ার চেষ্টা তিনি করবেন না-ই বা কেন?
এমনিতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে ডেনমার্কের এই স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা মোতায়েন রয়েছেন। তার ওপর ডেনমার্ক এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সেখানে সাদরে আরও সৈন্য নিতে পারে।
মালিকানার সঙ্গে একটি যে সুবিধা আসে, তা হলো ভূগর্ভস্থ বিপুল সম্পদের ওপর অধিকার। বরফে জমা দেশটি উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেসব সম্পদ উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে।
গ্রিনল্যান্ড কেবল তেল বা গ্যাসেরই নয়, বরং বিরল খনিজ পদার্থেরও বিশাল এক উৎস। এগুলো ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি থেকে শুরু করে ডেটা সেন্টারের প্রসেসর পর্যন্ত সবকিছু তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় জেতার আকাঙ্ক্ষার জন্য এই খনিজ সম্পদগুলো আমেরিকার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো ঔপনিবেশিক অর্থনীতির জন্য মালয়ের রাবার বা ভারতের বস্ত্র যেমন ছিল, তেমনই।
প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য পাগলামির পেছনে গভীর কোনো যৌক্তিক পরিকল্পনা খোঁজাটা অবশ্য প্রায়ই অর্থহীন কাজ হয়ে থাকে। তবে ট্রাম্পের বলয়ে অন্ধ মতাদর্শবাদী আর প্রযুক্তিজগতের ভাইবেরাদারদের অভাব নেই। তাঁরা নানাভাবে এমন কাজের পক্ষে যুক্তি খাড়া করিয়ে তা ট্রাম্পকে গেলানোর ক্ষমতা রাখেন।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প গজ গজ করেছেন যে গ্রিনল্যান্ডের ‘সর্বত্র চীনা ও রুশ জাহাজে ভর্তি’। এ থেকে ধারণা করা যায়, যদিও সুমেরুতে খনিজ উত্তোলন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে এখনো বহু বছর বাকি, কেউ নিশ্চয় তাঁকে বুঝিয়েছে যে এত ভালো একটা সুযোগের ক্ষেত্রে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের জিততে দিতে পারেন না। সাবেক আবাসন ব্যবসায়ী হিসেবে সম্পদ উন্নয়নের এই ধারণা বোঝা তাঁর জন্য খুবই সহজ।
ট্রাম্প ইউক্রেনে নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে বিরল খনিজ উত্তোলনের অধিকার চেয়েছিলেন, আর গাজায় বোমাবিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপের ওপর হোটেল তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাহলে পরিবেশগত বিপর্যয় থেকেও চটজলদি কিছু মুনাফা কামিয়ে নেওয়ার চেষ্টা তিনি করবেন না-ই বা কেন?
যদিও ব্রিটিশদের চোখে এগুলো সাম্রাজ্যবাদের এক নতুন যুগ বলে মনে হতে পারে, তবে অভিবাসীবিরোধী অতীতপ্রেমী ‘মাগা’ অনুসারীরা হয়তো এর মধ্যে আরও বেশি করে আমেরিকার গল্পের প্রতিধ্বনিই খুঁজে পাবেন। সে গল্পটা সার বেঁধে ওয়াগনে করে পশ্চিমে পাড়ি জমিয়ে ভাগ্য গড়ার গল্প। দেশের সীমানা বড় করে চলার গল্প। আদিবাসীদের জমি দখলে নিয়ে বাণিজ্য আর সহিংসতার হাতিয়ার দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে লেগে থাকার গল্প।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলছেন, লক্ষ্যটা গ্রিনল্যান্ড আক্রমণ করা নয়, বরং কিনে নেওয়া, অন্ততপক্ষে একচেটিয়া সামরিক প্রবেশাধিকারটি আদায় করা।
মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সাবেক মিত্রদের সম্পর্ক কত দ্রুত ভেঙে পড়েছে, এ কথাটা তারই আভাস দেয়। এ যেন বলা যে বন্ধুরা ভয় পেয়ো না। আমরা তো কেবল তোমাদের শোষণ করতে চাইছি, মেরে ফেলতে তো চাইনি।
ট্রাম্পের চঞ্চল মনোযোগ কিংবদন্তিতুল্য। আজ এখানে তো কাল সেখানে। সেই বিবেচনায় এটা বোঝা কঠিন যে গ্রিনল্যান্ডের ভাগ্যে কী আছে। হতে পারে, একসময় বিষয়টা তাঁর কাছে একঘেয়ে লাগবে এবং তিনি অন্য কিছু নিয়ে মেতে উঠবেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে দেশের ব্যর্থতা থেকে মানুষের নজর সরাতে বিদেশে নাটক তৈরির প্রয়োজনীয়তাও কমে আসবে।
অথবা হোয়াইট হাউস হয়তো পুতিনের কৌশল ধার করে গ্রিনল্যান্ডবাসীর ডেনমার্ক থেকে স্বাধীন হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগাবে। এটাকে পুঁজি করে এমন এক অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উসকে দেবে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে তাতিয়ে তোলা খুবই সহজ। তারপর যুক্তরাষ্ট্রকে হঠাৎ উদয় হওয়া এক নিরীহ ত্রাণকর্তা রূপে হাজির করবে, যে তাদের নিরাপত্তা দিতে এবং বড়লোক বানাতে এসেছে।
তবে যেটাই হোক না কেন, আমাদের মেনে নেওয়া ভালো যে সংঘাতের এই সবে শুরু, শেষ নয়। উষ্ণ হতে থাকা বিশ্বের নতুন মানচিত্রে জমি, পানি আর প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে এমন মারাত্মক সব দ্বন্দ্ব আসতেই থাকবে।
উত্তপ্ত পৃথিবী অবশ্যই সবচেয়ে ভয়াবহ হবে প্রান্তিক সেই মানুষদের জন্য, যাদের মরুময় জমিতে আর কোনো ফসল ফলবে না। নিচু জনপদগুলো মাথা জাগিয়ে রাখতে লড়ে চলবে। ঝড়ে ছিন্নভিন্ন হবে দরিদ্র জনপদ। সৌভাগ্যবান নাতিশীতোষ্ণ ইউরোপের অঞ্চলগুলোর চেয়ে তারাই ভুগবে বেশি।
সরকারগুলো যদি জাতীয় স্বার্থের পিছে না ছুটে সুমেরুর বরফ গলার মতো ঘটনাকে মানবজাতির জন্য ঝুঁকি বিবেচনা করে একজোট হয়ে মোকাবিলায় নামত, তাহলে ভালো হতো।
কিন্তু ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে একগুচ্ছ আন্তর্জাতিক জলবায়ু উদ্যোগ থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে আমরা তেমন পৃথিবীতে বাস করছি না।
কাজেই আর কিছু না হোক, বিপদাপন্ন গ্রিনল্যান্ড আমাদের মনে করিয়ে দিক যে জলবায়ু সংকটের ভূরাজনৈতিক পরিণতিগুলো আমরা বুঝতেই শুরু করিনি। বাড়তে থাকা তাপমাত্রা আর তার পরিণতিকে ঠেকাতে আমরা যতটুকু করতে পারি, ততটুকুই গুরুত্বপূর্ণ। ইচ্ছেমতো ক্ষতি যা করা হয়েছে, সেটা আর ফেরানো যাবে না। এখন এটুকুই ভরসা।
গ্যাবি হিনসলিফ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের একজন কলাম লেখক।