জেনোসাইড অস্বীকারের বৈশ্বিক রাজনীতি-৩
কম্বোডিয়া: ‘খেমার রুজ’দের গণহত্যা ও অস্বীকারের কৌশল
এই সিরিজ রচনার প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে যথাক্রমে আমেরিকা ও তুরস্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং তাদের দেশে সংঘটিত গণহত্যার ইতিহাস ও অস্বীকারের রাজনীতি নিয়ে আলোচনার পর এবার তৃতীয় পর্বে আমরা দৃষ্টি নিবদ্ধ করব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ার দিকে। বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে অন্যতম ভয়ংকর ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায় রচিত হয়েছিল এই দেশটিতে।
১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত পল পটের নেতৃত্বাধীন চরমপন্থী কমিউনিস্ট গোষ্ঠী ‘খেমার রুজ’ কম্বোডিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। মাত্র চার বছরের শাসনামলে তৎকালীন ৮০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ অনাহার, বাধ্যতামূলক শ্রম, অমানবিক নির্যাতন এবং নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে প্রাণ হারায়।
খেমার রুজরা কম্বোডিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ খেমার জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করার পাশাপাশি সেদেশের দুটি সুনির্দিষ্ট সংখ্যালঘু গোষ্ঠী—জাতিগত ভিয়েতনামী এবং চাম মুসলিমদের ওপর সুপরিকল্পিত গণহত্যা বা জেনোসাইড চালিয়েছিল।
দীর্ঘ চার দশকের লড়াইয়ের পর ২০১৮ সালে জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত আন্তর্জাতিক হাইব্রিড ট্রাইব্যুনাল ‘Extraordinary Chambers in the Courts of Cambodia’ (ECCC) ঐতিহাসিক রায়ে খেমার রুজের শীর্ষ নেতা নুওন চেয়া (Nuon Chea) ও খিউ সামফানকে (Khieu Samphan) গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। কিন্তু এই আইনি স্বীকৃতি রাতারাতি আসেনি। এর পেছনে লুকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর কূটচাল, পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের স্খলন এবং কম্বোডিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এক দীর্ঘমেয়াদি ‘অস্বীকৃতি’ বা ‘Denial’ ক্যাম্পেইন।
গণহত্যার অকাট্য প্রমাণ এবং ‘একজনের বিপরীতে ত্রিশজন’ নীতি
পশ্চিমা শিক্ষাবিদদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে এসেছিলেন যে খেমার রুজদের হত্যাকাণ্ডে কোনো সুনির্দিষ্ট জাতিগত উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু ১৯৭৮ সালের ১০ মে খেমার রুজদের রাষ্ট্রীয় রেডিওতে প্রচারিত ‘One Against 30’ বা ‘একজনের বিপরীতে ত্রিশজন’ নীতি এই দাবিকে ভুল প্রমাণিত করে। পল পট সরকার হিসাব কষে দেখিয়েছিল যে ভিয়েতনামের ৫ কোটি জনসংখ্যাকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য কম্বোডিয়ার মাত্র ২০ লাখ সৈন্যই যথেষ্ট। সম্প্রচারে বলা হয়, ‘আমাদের ৮০ লাখ মানুষের দরকার নেই। ভিয়েতনামের ৫ কোটি মানুষকে ধ্বংস করতে আমাদের মাত্র ২০ লাখ সৈন্য প্রয়োজন, এবং এরপরও আমাদের ৬০ লাখ মানুষ বেঁচে থাকবে।’
পশ্চিমা শিক্ষাবিদদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে এসেছিলেন যে খেমার রুজদের হত্যাকাণ্ডে কোনো সুনির্দিষ্ট জাতিগত উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু ১৯৭৮ সালের ১০ মে খেমার রুজদের রাষ্ট্রীয় রেডিওতে প্রচারিত ‘One Against 30’ বা ‘একজনের বিপরীতে ত্রিশজন’ নীতি এই দাবিকে ভুল প্রমাণিত করে।
পশ্চিমা ইতিহাসবিদ ইওর্গ মেনজেল এটিকে স্রেফ ‘যুদ্ধকালীন প্রোপাগান্ডা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও দালিলিক ও ডেমোগ্রাফিক প্রমাণ ছিল ভয়াবহ। ১৯৭৫ সালের পর কম্বোডিয়ায় থেকে যাওয়া ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার ভিয়েতনামীর প্রায় ১০০ ভাগকেই ১৯৭৭-৭৮ সালের মধ্যে হত্যা করা হয়। চাম মুসলিমদের ক্ষেত্রেও প্রায় ৩৬ শতাংশ (প্রায় ৯০ হাজার মানুষ) প্রাণ হারায়।
অস্বীকারের মনস্তত্ত্ব: বুদ্ধিবৃত্তিক স্খলন ও তথ্য ধামাচাপা
ইতিহাসবিদ টনি টেলর (Tony Taylor) তাঁর ‘Denial: History Betrayed’ গ্রন্থে গণহত্যা অস্বীকারের যে ৪টি প্রধান কৌশল বা রূপ বর্ণনা করেছেন, কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে তার প্রতিটিই অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল।
১৯৭৯ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন দশক কম্বোডিয়ার স্কুলগুলোর ইতিহাস বইয়ে খেমার রুজ আমলের কথা প্রায় উল্লেখই ছিল না। ফলে নব্বইয়ের দশকে জন্ম নেওয়া অনেকেই বিশ্বাস করত না যে তাদের দেশে এমন বীভৎস ঘটনা ঘটেছিল। তারা একে ‘রূপকথা’ বা ‘পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা’ মনে করত।
১. সাধারণ অস্বীকৃতি: এটি হলো অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও নির্লজ্জভাবে সত্যকে অস্বীকার করা। খোদ পল পট দাবি করেছিলেন যে এই বিশাল হত্যাকাণ্ডের জন্য ‘ভিয়েতনামী এজেন্টরা’ দায়ী। খেমার রুজের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা নুওন চেয়া দাবি করেন, ‘আমি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছুই জানতাম না... আমি কেবল ভালো কাজের রিপোর্ট পেতাম।’ এমনকি ইয়েং সারি প্রথমে বন্দিশালার নথিপত্র দেখে সত্যতা স্বীকার করলেও পরে তা অস্বীকার করে বসেন।
২. সুকৌশলে শব্দচয়ন ও রাজনৈতিক ভাষার খেলা: এই কৌশলের মাধ্যমে অস্বীকারকারীরা সরাসরি ঘটনাকে মিথ্যা না বলে এমন সব শব্দ ব্যবহার করেন, যা ঘটনার ভয়াবহতাকে লঘু করে দেয়। যেমন—শিক্ষাবিদ ডেভিড চ্যান্ডলার গণহত্যার বদলে একে ‘শুদ্ধি অভিযান’ বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। আন্তর্জাতিক চুক্তিতেও এই কৌশল দেখা যায়। ১৯৯০ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের শান্তিচুক্তির খসড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের চাপে খেমার রুজদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ‘গণহত্যা’ বা ‘মানবাধিকার’ শব্দগুলো মুছে ফেলে কেবল ‘অতীতের নীতি ও চর্চা’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়।
৩. ফ্যান্টাসি বা কল্পনার আশ্রয়: অনেক সময় অস্বীকারকারীরা নিজেদের মতাদর্শিক ফ্যান্টাসির জগতে বাস করেন এবং বাস্তবতাকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেন। পশ্চিমা শিক্ষাবিদ মাইকেল ভিকারির ক্ষেত্রে এটি চরম আকার ধারণ করেছিল। ‘কৃষক বিপ্লবের’ প্রতি রোমান্টিক মোহ এবং শহরের মানুষের প্রতি বিদ্বেষ থেকে তিনি শহরের মানুষদের ‘অলস ও ষড়যন্ত্রকারী’ আখ্যা দিয়ে মন্তব্য করেন, ‘নমপেন শহরের সঙ্গে যা ঘটেছিল, তারা ঠিক সেটারই যোগ্য ছিল।’ পরবর্তীকালে তিনি ইয়েং সারির আইনি প্রতিরক্ষা দলেও যোগ দেন।
৪. সত্য ধামাচাপা দেওয়া বা কাজের মাধ্যমে অস্বীকৃতি: প্রমাণ লুকিয়ে রাখা বা ধ্বংস করার মাধ্যমে অস্বীকার করার এই কৌশলটি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এবং কিছু জাতিসংঘ কর্মকর্তা দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছিল। ১৯৭৭-৭৮ সালে যখন হত্যাযজ্ঞ তুঙ্গে, তখন সিআইএ ভুল রিপোর্ট দেয় যে হত্যাকাণ্ডের মাত্রা কমে এসেছে। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাও পরবর্তীকালে জাতিসংঘ কর্মকর্তা স্টিফেন আর হেডার খেমার রুজ নেতাদের দায়মুক্তি দেওয়ার জন্য এবং সত্য ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষাবিদ ডেভিড চ্যান্ডলার গণহত্যার বদলে একে ‘শুদ্ধি অভিযান’ বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন এবং দাবি করতেন যে ভিয়েতনামীদের হত্যা করা হয়নি, বরং ‘নিজ দেশে ফেরত পাঠানো’ হয়েছিল। লেখক ফিলিপ শর্ট চাম মুসলিমদের উচ্ছেদ ও হত্যাযজ্ঞকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদবিরোধী ‘স্কুলবাস নীতির’ (কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ শিশুদের একসঙ্গে বাসে নেওয়ার নীতি) সঙ্গে তুলনা করে এই চরম মানবতাবিরোধী অপরাধকে অবমাননাকরভাবে লঘু করে দেখিয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক চুক্তিতেও চলে শব্দের খেলা। ১৯৯০ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের শান্তিচুক্তির খসড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের চাপে খেমার রুজদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ‘গণহত্যা’ বা ‘মানবাধিকার’ শব্দগুলো মুছে ফেলে কেবল ‘অতীতের নীতি ও চর্চা’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়।
স্নায়ুযুদ্ধের ভূরাজনীতি: জাতিসংঘে বৈধতা ও চীনের ভূমিকা
আন্তর্জাতিক কূটচালের সবচেয়ে নগ্ন রূপটি দেখা যায় জাতিসংঘের সদর দপ্তরে। ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের হস্তক্ষেপে খেমার রুজদের পতনের পর নমপেনে নতুন সরকার গঠিত হলেও পশ্চিমা বিশ্ব ও চীন তাকে স্বীকৃতি দেয়নি। উল্টো এক অভাবনীয় দেউলিয়াত্বের পরিচয় দিয়ে, ১৯৭৯ সাল থেকে নব্বইয়ের দশকের শুরু পর্যন্ত জাতিসংঘে কম্বোডিয়ার আসনটি খেমার রুজদের দখলেই রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ‘ভিয়েতনামের আগ্রাসন’ ঠেকানোর যুক্তিতে এমন একটি ঘাতক বাহিনীকে সমর্থন জুগিয়েছিল।
এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের অপরাধ লুকানোর ভয়ও কাজ করেছিল। ১৯৭০ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জারের নির্দেশে কম্বোডিয়ায় ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করা হয়। মার্কিন বিশ্লেষকেরা ভয় পাচ্ছিলেন যে খেমার রুজদের বিচার করতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের এই পুরোনো যুদ্ধাপরাধ সামনে চলে আসবে।
অন্যদিকে খেমার রুজদের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক ছিল চীন। মাও সে–তুংয়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত পল পটকে চীন সামরিক, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং ডেথ ক্যাম্পের নকশা তৈরিতেও সাহায্য করেছিল। পরবর্তীকালে ইসিসিসি গঠনের সময় চীন পর্দার আড়াল থেকে চাপ প্রয়োগ করে এর কার্যপরিধি সীমিত করার চেষ্টা করে, যাতে তাদের নিজেদের ঐতিহাসিক সম্পৃক্ততা মুছে ফেলা যায়।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও স্মৃতিভ্রংশ
কম্বোডিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গণহত্যা অস্বীকারের বিষয়টি ছিল আরও জটিল। ১৯৭৯ সালের পর যারা ক্ষমতায় আসেন, তাদের অনেকেই (যার মধ্যে দীর্ঘকালীন প্রধানমন্ত্রী হুন সেনও ছিলেন) একসময় খেমার রুজের মাঝারি বা নিম্নসারির কমান্ডার ছিলেন। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে হুন সেন সরকার ‘Win-Win Policy’ গ্রহণ করে খেমার রুজ নেতাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। ইয়েং সারিকে ১৯৯৬ সালে রাজকীয় ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়। ‘পুরোনো ক্ষত জাগিয়ে তুললে গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে’—এই যুক্তিতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি কায়েম করা হয়।
এর সবচেয়ে বড় শিকার হয় কম্বোডিয়ার তরুণ প্রজন্ম। ১৯৭৯ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন দশক কম্বোডিয়ার স্কুলগুলোর ইতিহাস বইয়ে খেমার রুজ আমলের কথা প্রায় উল্লেখই ছিল না। ফলে নব্বইয়ের দশকে জন্ম নেওয়া অনেকেই বিশ্বাস করত না যে তাদের দেশে এমন বীভৎস ঘটনা ঘটেছিল। তারা একে ‘রূপকথা’ বা ‘পশ্চিমা প্রোপাগান্ডা’ মনে করত। ২০০৭ সালে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ডেমোক্রেটিক সেন্টার অব কম্বোডিয়া (DC-Cam)-এর প্রচেষ্টায় প্রথমবারের মতো ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হয়।
তদুপরি, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ফলে খেমার রুজের সাবেক সৈনিকেরা সাধারণ সমাজে ফিরে আসে। ভুক্তভোগীদের প্রতিদিন তাদের পরিবারের হত্যাকারীর পাশেই বসবাস করতে হতো। এই মনস্তাত্ত্বিক অস্বীকৃতি সমাজে ন্যায়বিচারের ধারণাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিল।
অস্বীকৃতির ভয়াবহ পরিণতি: ১৯৯২-৯৩ সালের দ্বিতীয় গণহত্যা
ইতিহাস অস্বীকার করার এবং অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়ার সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিণতি হলো নতুন করে অপরাধ সংঘটনের পথ তৈরি হওয়া। ১৯৯০ সালে জাতিসংঘের চুক্তিতে খেমার রুজদের বিচার না করে শান্তি প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার কারণে তারা চরম বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর ফলে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ (UNTAC)-এর উপস্থিতিতেই ১৯৯২ সালের এপ্রিল থেকে তারা কম্বোডিয়ায় বসবাসরত জাতিগত ভিয়েতনামী বেসামরিক নাগরিকদের ওপর দ্বিতীয় দফায় গণহত্যা শুরু করে।
খেমার রুজ হাইকমান্ড থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশ আসে ভিয়েতনামী নারী, পুরুষ ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করার জন্য। জাতিসংঘের মানবাধিকার শাখার পরিচালক ডেনিস ম্যাকনামারা প্রকাশ্যে সতর্ক করলেও, UNTAC-এর তথ্য ও শিক্ষা বিভাগের উপপ্রধান স্টিফেন হেডার এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই অকাট্য প্রমাণগুলোকে জনসমক্ষে প্রকাশ না করে গোপন ফাইলে বন্দী করে রাখেন। এই ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা ও তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার কারণে প্রায় ২০০ ভিয়েতনামী নিহত হয় এবং হাজার হাজার মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়।
উপসংহার
দীর্ঘ চার দশকের নিরলস অস্বীকৃতি, পরাশক্তিগুলোর রাজনৈতিক কূটচাল, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত স্মৃতিভ্রংশ এবং পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের স্খলনের পরও সত্য শেষ পর্যন্ত উদ্ভাসিত হয়েছে। ২০১৮ সালে ECCC-এর চূড়ান্ত রায় সব মিথ্যাচারকে ভুল প্রমাণ করে খেমার রুজ নেতাদের গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে।
কম্বোডিয়ার এই রক্তাক্ত ইতিহাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে স্নায়ুযুদ্ধের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লোভ কীভাবে ১৭ লাখ মানুষের মৃত্যুর সত্যকে আড়াল করে রাখতে পারে। জেনোসাইড স্কলার গ্রেগরি স্ট্যান্টন যেমনটা বলেছিলেন, অস্বীকৃতি হলো গণহত্যার সর্বশেষ পর্যায়। এটি কেবল মৃতদের প্রতি অবিচার নয়, বরং এটি অপরাধীদের দায়মুক্তি দিয়ে সমাজে নতুন করে সহিংসতার বীজ বপন করে। তবে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ‘অস্বীকৃতি ক্যাম্পেইন’ সাময়িকভাবে তথ্য আড়াল করতে পারলেও, ঐতিহাসিক প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত সত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব।