পারমাণবিক চুক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষই নমনীয়তা প্রদর্শন করছে। এমনকি ওয়াশিংটন নির্দিষ্ট মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ মেনে নিতেও ‘রাজি’ বলে মনে হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এ তথ্য জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় মধ্যস্থতা করছে তুরস্ক।
হাকান ফিদা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ মেনে নিতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে, যা একটি ইতিবাচক দিক।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইরান এখন বুঝতে পারছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো প্রয়োজন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও বুঝতে পারছে যে ইরানের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাদের ওপর জোর খাটানো এখন অর্থহীন।
পাল্টাপাল্টি অবস্থান
এ পর্যন্ত ওয়াশিংটন দাবি করে আসছিল যে ইরানকে তাদের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করতে হবে। উল্লেখ্য, ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে সাধারণত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করে বলেছেন, তেহরান আর্থিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ তাদের পারমাণবিক অধিকারের দাবিতে অনড় থাকবে।
তবে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনে করেন, তেহরান ‘আন্তরিকভাবেই একটি প্রকৃত চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়’। বিনিময়ে তারা সমৃদ্ধকরণের মাত্রায় বিধিনিষেধ এবং কঠোর পরিদর্শন ব্যবস্থা মেনে নিতে প্রস্তুত, যেমনটি তারা ২০১৫ সালের চুক্তিতে করেছিল।
কূটনৈতিক তৎপরতা
কূটনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে গত সপ্তাহে ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনীতিকেরা আলোচনায় বসেন। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই অঞ্চলে নৌবহর মোতায়েন করায় নতুন করে সামরিক উত্তেজনার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমনকি গত মঙ্গলবার ট্রাম্প জানিয়েছেন, আলোচনা শুরুর প্রস্তুতির মধ্যেই তিনি মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর কথা ভাবছেন।
তবে হাকান ফিদান সতর্ক করে বলেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই আলোচনা যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়, তবে তা ‘যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনবে না’।
ইসরায়েলের নাশকতা চেষ্টা
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান আলোচনায় ইসরায়েল নাশকতার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ইরানের নীতিনির্ধারক আলী লারিজানি। তাঁর দাবি, এই আলোচনার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ উসকে দিতে চাইছে ইসরায়েল।
গত শুক্রবার ওমানের মাসকাটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় দফা আলোচনার প্রস্তুতি চলাকালে গত বুধবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে কিছু কঠোর ‘নীতিমালা’ প্রস্তাব করেন। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো না গেলেও তিনি ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চান।
ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে অনড় তেহরান
তেহরান এখনো ওয়াশিংটনের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব পায়নি। লারিজানি বলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর বিষয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি সাধারণ ঐকমত্য রয়েছে। তবে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি
যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় গত জুনের মতো আবারও হামলা চালায়, তবে ইরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন লারিজানি। তিনি স্পষ্ট জানান, তেমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে তেহরান।
ওয়াশিংটন ও তেহরান পরবর্তী দফার আলোচনার কথা বিবেচনা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। আলোচনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য মিশ্র সংকেত দিয়ে চলেছেন। প্রথম দফার আলোচনাকে ‘খুব ভালো’ হিসেবে বর্ণনা করলেও, ওয়াশিংটনের দাবি না মানলে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দিয়ে রেখেছেন তিনি।