সুড়ঙ্গ শুধু পথ নয়, বরং মানুষের মেধা-মনন, প্রযুক্তি ও সাহসের প্রতীক। একেকটি সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে মাটি, পাথর বা সমুদ্রের তলদেশের গভীরে মানুষের স্বপ্ন যেন পথ খুঁজে পায়। বিশ্বের নানা দেশে সেচ, পানি সরবরাহ, রেলপথ বা সড়ক যোগাযোগের জন্য অসংখ্য সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। এসব সুড়ঙ্গের মধ্যে কিছু প্রযুক্তি ও মানবিক অভিজ্ঞতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হয়ে আছে। বিশ্বের বিস্ময়কর ১০টি সুড়ঙ্গের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিয়ে এ আয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক মেট্রোপলিটান অঞ্চলে পানির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে এক দীর্ঘ পানিপরিবাহী সুড়ঙ্গ। প্রায় ১৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গের নাম ‘ডেলাওয়ার অ্যাকুয়াডাক্ট’। এটি ডেলাওয়ার নদী ও এর আশপাশের জলাধার থেকে পানি সংগ্রহ করে শহরের হাজার হাজার বাসিন্দার নিত্যপ্রয়োজনীয় পানির প্রয়োজন মেটায়।
১৯৩৭ সালে এই সুড়ঙ্গের প্রাথমিক নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৪৫ সালের দিকে মূল সুড়ঙ্গের কাজ শেষ হয়। পাথর, মাটি ও পানিরোধী কংক্রিট দিয়ে তৈরি এ নেটওয়ার্ক এখন পর্যন্ত অসাধারণ এক প্রকৌশল কীর্তি হিসেবে টিকে আছে। সুড়ঙ্গটির অধিকাংশ অংশ মাটির নিচে হলেও কিছু অংশ মাটি বা জলাধারের ওপর দিয়ে গেছে।
ফিনল্যান্ডের পেইয়ান্নে ওয়াটার সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার। রাজধানী হেলসিঙ্কিসহ কয়েকটি বড় শহরে পানি সরবরাহের জন্য এ সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। এটি পেইয়ান্নে হ্রদের কাছাকাছি এলাকা থেকে পানি নিয়ে শহরাঞ্চলে পৌঁছে দেয়। ১৯৭০-এর দশকে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। মূল অংশের কাজ শেষ হয় ১৯৮২ সালের দিকে।
এ সুড়ঙ্গের পানিতে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। তাই পানির বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে বালু বা ছোট পাথরের স্তর (গ্রাভেল ফিল্টারিং) ব্যবহার করা হয়েছে। ফিনল্যান্ডের পানির নিরাপত্তার জন্য পেইয়ান্নে ওয়াটার সুড়ঙ্গ বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের দাহুওফাং ওয়াটার সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮৫ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। এটি দাহুওফাং জলাধার থেকে পানি সংগ্রহ করে শুষ্ক অঞ্চলের শহর ও কৃষিভূমিতে সরবরাহের জন্য তৈরি করা হয়েছে। সুড়ঙ্গের পথজুড়ে ভূগর্ভস্থ খালের পাশাপাশি এক দীর্ঘ পানিপ্রবাহ তৈরি করা হয়েছে, যা শুষ্ক ভূমিকে সবুজ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রকৌশলীদের চোখে এটি একধরনের বিশাল জলসেতু, যেখানে প্রতিটি অংশ একে অপরের সঙ্গে মিলে একটি পানিপ্রবাহের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। চীনের পানিনিরাপত্তা ও ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প।
দক্ষিণ আফ্রিকার অরেঞ্জ-ফিশ রিভার সুড়ঙ্গ একটি বহুমুখী প্রকল্প। প্রায় ৮২ দশমিক ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ পানিপরিবাহী প্রকল্প অরেঞ্জ নদীর পানি ধরে রেখে ফিশ নদীর দিকে পাঠিয়ে তা শুষ্ক ও খরাপ্রবণ অঞ্চলে পৌঁছে দেয়।
এ সুড়ঙ্গের মাধ্যমে প্রবাহিত পানি শুধু মানুষের প্রয়োজন মেটায় না, বরং পরিবেশকে পুনরুজ্জীবিত করে, গাছপালা ও পশুপাখির জীবনধারণে সহায়তা করে। দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলবর্তী এলাকার মরুকরণ রোধে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুড়ঙ্গটির নির্মাণকাজ ১৯৬৬ সালে শুরু হয়ে ১৯৭৫-৭৬ সালের দিকে শেষ হয়।
সুইডেনের বলমেন ওয়াটার সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮২ কিলোমিটার। এটি বলমেন লেক থেকে পানি সংগ্রহ করে দক্ষিণের সুকানে অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে নিয়ে আসে। এরপর সেখানে পানি পরিশোধন করে নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
এ সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ ১৯৭৫ সালে শুরু হয়ে ১৯৮৭ সালের মধ্যে শেষ হয়। ভূগর্ভের ৩০ থেকে ৯০ মিটার গভীরে অবস্থিত সুড়ঙ্গটির পানির প্রবাহ কোনো পাম্প ছাড়া স্বয়ংক্রিয় প্রবাহে পরিচালিত হয়।
চীনের চেংডু মেট্রো লাইন-৬ শহরটির মেট্রোব্যবস্থার একটি দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ রেলসুড়ঙ্গ। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার। সুড়ঙ্গটি ওয়াংকং টেম্পল থেকে লানজিয়াগৌ পর্যন্ত বিস্তৃত। এতে ৫৬টি স্টেশন আছে।
সুড়ঙ্গটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে এবং শেষ হয় ২০১৯ সালে। তবে সাধারণ যাত্রী পরিবহন শুরু হয় ২০২০ সালের শেষের দিকে। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম একটানা মেট্রোসুড়ঙ্গগুলোর মধ্যে অন্যতম। সুড়ঙ্গটির কারণে চেংডু নগরীর উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে দ্রুত যাতায়ত সহজ হয়েছে।
পাকিস্তানের নিলম–ঝিলম হাইড্রোপাওয়ার প্রকল্পের সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে দেশটির নিলম নদীর পানি ঝিলম নদীর দিকে সরবরাহ করা হয়। এ পানি দিয়ে মোট ৯৬৯ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। পাহাড়ের নিচে পাথর কেটে বয়ে চলা সুড়ঙ্গের ওপর ভিত্তি করেই প্রকল্পটি চলছে।
পুরো প্রকল্পে প্রায় ৫০ কিলোমিটার সুড়ঙ্গ রয়েছে। নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে। নানা বাধা পেরিয়ে ২০১৮ সালে এটি পুরোপুরি চালু হয়। এটি নির্মাণ করা প্রকৌশলীদের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল।
মেক্সিকো সিটির এমিসর ওরিয়েন্টে সুড়ঙ্গ একটি দীর্ঘ বর্জ্য নিষ্কাশন সুড়ঙ্গ। এটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬২ দশমিক ৫ কিলোমিটার। ২০০৮ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ২০১৯ সালে। সুড়ঙ্গটি পানি, বৃষ্টির পানি ও বর্জ্য একসঙ্গে শহরের বাইরে নিয়ে যায়।
এসব বর্জ্য মেক্সিকোর হিডালগো রাজ্যের অ্যাটোটোনিলকো ওয়েস্টওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে পৌঁছে পরিশোধিত হয়। ভারী বর্ষণের সময় সুড়ঙ্গটি শহরে বন্যা ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চীনের গুয়াংজু মেট্রো লাইন-৩-এর অধিকাংশ অংশ ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ দিয়ে তৈরি। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৭ দশমিক ৩৩ কিলোমিটার। হাইবাং থেকে এয়ারপোর্ট নর্থ পর্যন্ত বিস্তৃত এই সুড়ঙ্গ শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণ এবং পূর্ব থেকে পশ্চিম অঞ্চলে যাত্রীদের দ্রুত যাতায়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষ এ লাইন ব্যবহার করে।
২০০৫ সালে শুরু হয়ে সুড়ঙ্গটির কাজ শেষ হয় ২০১৮ সালে। শহরের ব্যস্ততম অঞ্চলে নির্বিঘ্নে যোগাযোগের জন্য এটি অপরিহার্য।
সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া গটথার্ড বেস সুড়ঙ্গ দেশটির উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে। প্রায় ৫৭ দশমিক ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সুড়ঙ্গ রেল যোগাযোগকে দ্রুততর করেছে। নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
এ সুড়ঙ্গের কোনো কোনো অংশ আল্পসের প্রায় ২ দশমিক ৩ কিলোমিটার নিচে। বিশ্বের দীর্ঘতম ও গভীরতম রেলসুড়ঙ্গগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। সুড়ঙ্গটি আল্পসের দুই পাশের ইউরি ও টিচিনো ক্যান্টনকে যুক্ত করেছে।
তথ্যসূত্র: ওয়ার্ল্ডঅ্যাটলাস অবলম্বনে