default-image

গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ইকুয়েডর ৩৪০টি বিদেশি নৌযানকে তাদের জলসীমায় মাছ ধরতে দেখে। এসব নৌযানের অধিকাংশই চীনের। ইকুয়েডরের পশ্চিমাঞ্চলের গ্যালাপাগোস আইল্যান্ডের বিশেষ অর্থনৈতিক জোনের কাছে বিদেশিদের মাছ শিকার করার বিষয়টি দেশটির উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে।

আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী, এ ধরনের কোনো জাহাজ বা নৌযানকে জিপিএসভিত্তিক অটোমেটিক আইডেনটিফেকশন সিস্টেম (এআইএস) বহন করতে হয়। এতে ওই জাহাজের অবস্থান শনাক্ত করা যায়। নিয়ম হচ্ছে সমুদ্রে ওই সিস্টেমটি সব সময় নৌযানকে চালু রাখতে হবে। কিন্তু ইকুয়েডরের জলসীমায় মাছ ধরার সময় ওই নিয়ম মানা হয়নি। এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে ৫৫০ বারের বেশি। এভাবে রেডিও সংকেত বন্ধ রাখার অর্থ দাঁড়ায় ওই জাহাজগুলো জেনে বুঝেই অবৈধভাবে ইকুয়েডরের জলসীমায় ঢুকে মাছ শিকার করছিল।

পৃথিবীর কক্ষপথে হকআইয়ের মতো রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সিযুক্ত (আরএফ) বুদ্ধিমান কৃত্রিম উপগ্রহের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। এ বছরের জানুয়ারি মাসে কক্ষপথে এ ধরনের কৃত্রিম উপগ্রহ ছিল এক ডজনের মতো। বছর শেষে এর সংখ্যা ৬০টি পার হয়ে যেতে পারে।

তবে স্থানীয় কর্মকর্তারা ও ইকুয়েডরের নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত এ অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁরা বলেন, সব নৌযান ও জাহাজ নিয়ম মেনেই মাছ শিকার করেছে। তবে, গত অক্টোবরে গোল বাধায় যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াভিত্তিক কৃত্রিম উপগ্রহ পরিচালনা প্রতিষ্ঠান হকআই ৩৬০ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তারা ঘোষণা দেয়, ইকুয়েডরের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৪ বার বিদেশি জাহাজ ঢোকার বিষয়টি শনাক্ত করেছে। ওই সময় নৌযানগুলো থেকে সংকেত পাঠানো বন্ধ ছিল। হকআইয়ের তৈরি স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ সংকেত বন্ধ থাকলেও একবারে নিখুঁতভাবে জাহাজের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই কৃত্রিম উপগ্রহ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছে।

ইকোনমিস্টের তথ্য অনুযায়ী, হকআইয়ের তৈরি এসব কৃত্রিম উপগ্রহকে ‘স্মলস্যাটস’ বা ছোট কৃত্রিম উপগ্রহ বলে। এগুলোর আকার বড় আকারের মাইক্রোওয়েভ ওভেনের মতো। এগুলো কম খরচে তৈরি ও মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা যায়। ২০১৮ সালে হকআই তাদের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহের গ্রুপ (ক্লাস্টার) হিসেবে তিনটি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে। এখন এগুলো কক্ষপথে অবস্থান করছে এবং পৃথিবীর ওপর নজর রাখছে। এর অর্থ, এই কৃত্রিম উপগ্রহ পৃথিবীর নির্দিষ্ট প্রতিটি পয়েন্ট নির্দিষ্ট বিরতিতে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রাথমিকভাবে ওই কৃত্রিম উপগ্রহ যে তথ্য সংগ্রহ করে, তা আর্কটিক সাগরে নরওয়ের দ্বীপ স্যালবার্ডের একটি ট্র্যাকিং স্টেশনে ডাউনলোড করা হয়। ইকুয়েডরের ওই ঘটনার জানাজানির পর হকআইয়ের ব্যবসা হু হু করে বেড়ে গেছে। ডজনখানেক সরকার তাদের গ্রাহক হয়েছে। এর বাইরে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও হকআইয়ের গ্রাহক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। হকআই তাদের দ্বিতীয় গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি করেছে অ্যান্টার্কটিকায়। গত ২৪ জানুয়ারি আরও তিনটি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এ বছর আরও কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করেছে তারা। আরও বেশি গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি করে নেটওয়ার্ক আরও বড় করার পরিকল্পনাও রয়েছে হকআইয়ের।

default-image

হকআইয়ের এই সাফল্য দেখে হাত গুটিয়ে নেই অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো। কমপক্ষে আরও ছয়টি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান এ ধরনের সিস্টেম পরিচালনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুইলটি অ্যানালাইটিকসের পূর্বাভাস হচ্ছে, পৃথিবীর কক্ষপথে হকআইয়ের মতো রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সিযুক্ত (আরএফ) বুদ্ধিমান কৃত্রিম উপগ্রহের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। এ বছরের জানুয়ারি মাসে কক্ষপথে এ ধরনের কৃত্রিম উপগ্রহ ছিল এক ডজনের মতো। বছর শেষে এর সংখ্যা ৬০টি পার হয়ে যেতে পারে।

রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সিযুক্ত (আরএফ) বুদ্ধিমান কৃত্রিম উপগ্রহ

রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সিযুক্ত (আরএফ) বুদ্ধিমান কৃত্রিম উপগ্রহগুলো তথ্য স্থানান্তর দুটি উপায়ে শনাক্ত করতে পারে। একটি হচ্ছে ট্রাইলাটেরাসন। এটি মূলত নির্দিষ্ট কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে সংকেত আসার সময়ের মিনিটের পার্থক্যের ওপর নির্ভর করে। আরেকটি হচ্ছে ড্রপলার ইফেক্ট। উৎস এবং পর্যবেক্ষকের মধ্যকার আপেক্ষিক গতির কারণে কোনো তরঙ্গ-সংকেতের কম্পাঙ্ক পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ডপলার ক্রিয়া (ইংরেজি: ড্রপলার ইফেক্ট) বলা হয়। হকআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই দুটি পদ্ধতি মিলিয়ে তারা উৎসের ৫০০ মিটারের মধ্যে বস্তুর অবস্থান শনাক্ত করতে পারে। লুক্সেমবার্গভিত্তিক ক্লেয়স স্পেস নামের একটি সংস্থা গত নভেম্বরে তাদের প্রথম গুচ্ছ কৃত্রিম উপগ্রহ চালু করে। চলতি বছরের শেষ আরও দুটি সিস্টেম তারা স্থাপন করবে। তারা দাবি করছে, এতে ২০০ মিটারের মধ্যে কোনো বস্তুকে তারা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করবে।

একগুচ্ছ কৃত্রিম উপগ্রহের তৈরি সিস্টেম আকাশ থেকে দুই হাজার কিলোমিটার প্রশস্ত অঞ্চলের ওপর নজরদারি করতে পারে। প্রতি দেড় ঘণ্টায় তা পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকায় নজরদারি করে। তবে অন্যান্য গোয়েন্দা কৃত্রিম উপগ্রহের সঙ্গে এর পার্থক্য রয়েছে। গোয়েন্দা উপগ্রহে সাধারণত অপটিক্যাল ক্যামেরা বসানো থাকে। অন্যদিকে রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সিযুক্ত বা আরএফ স্যাটেলাইট মেঘের মধ্য দিয়েও পর্যবেক্ষণ জারি রাখতে পারে। এর রিসিভার মোবাইল নেটওয়ার্কের পরিবর্তে স্যাটেলাইট ফোন, ওয়াকিটকি ও অন্যান্য রাডার সংকেত ধরতে পারে।

হরাইজন টেকনোলজিসের প্রধান জন বেকনার বলেন, অবৈধভাবে চলাচলকারী জাহাজগুলোতে তাদের জিপিএসভিত্তিক অটোমেটিক আইডেনটিফেকশন সিস্টেম বন্ধ রাখে। কিন্তু যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত গিয়ার ও সংঘর্ষ এড়ানোর নেভিগেশন রাডার বন্ধ করে না। এটা ধরেই কাজ করতে সক্ষম হবে তাদের সিস্টেম।
আরএফ কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করাটা সাশ্রয়ী। অন্যান্য স্যাটেলাইটে থাকা রোবটিক হাই-রেজল্যুশন ক্যামেরাগুলো দামি। কিন্তু আরএফ কৃত্রিম উপগ্রহগুলো এত দামি নয়। হরাইজন বলছে, তাদের কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি, বিমা ও উৎক্ষেপণ করতে ১৪ লাখ ডলারের বেশি খরচ হবে না।

default-image

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল জিওস্পাশিয়াল-ইনটেলিজেন্স এজেন্সি (এনজিএ) দেশটির বিভিন্ন গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। তারা আরএফ ইনটেলিজেনস ব্যাপক আকারে ব্যবহার করে থাকে। তারা হকআইয়ের তথ্য ব্যবহার করে গেরিলা ক্যাম্প শনাক্ত করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কাজও করে থাকে। এ কৃত্রিম উপগ্রহ প্রচলিত যুদ্ধজাহাজ এবং উন্নত অস্ত্রসজ্জিত স্পিডবোটও শনাক্ত করতে পারে। এ ধরনের দ্রুতগতির স্পিডবোট সাধারণত ইরান তাদের প্রতিরক্ষাকাজে ব্যবহার করে থাকে।
ইকোনমিস্ট তাদের প্রতিবেদনে বলে, রবার্ট কার্ডিলো আগে যুক্তরাষ্ট্রের এনজিএ নামের সংস্থাটিতে কাজ করতেন। তিনি এখন হকআইতে পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন।

কর্ডিলো বলেন, রাশিয়াসহ কয়েক ডজন দেশের নৌবাহিনী অটোমেটিক আইডেনটিফেকশন সিস্টেম বা এআইএস সংকেতকে বোকা বানিয়ে বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধজাহাজ হাজির করে। এসব জায়গায় তাদের জাহাজ সাধারণত যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু আরএফ বুদ্ধিমত্তাকে এভাবে বোকা বানানো যায় না। আরএফ কৃত্রিম উপগ্রহগুলো আকারে এত ছোট হয় যে তা কোনো শত্রুপক্ষ সহজে ধ্বংস করে ফেলতেও পারে না।

সামরিক ব্যবহার ছাড়াও এনজিএর পক্ষ থেকে আরএফ তথ্য অনৈতিক আর্থিক কর্মকাণ্ড ধরার কাজেও লাগানো হয়। এ ক্ষেত্রে অবৈধ মাছ শিকার ধরার বিষয়টি একটি উদাহরণ। এর বাইরে জলদস্যুদের উৎপাত ঠেকানো একটি বিশেষ দিক। ২০২০ সালে কঙ্গোর গারাম্বা ন্যাশনাল পার্কের ব্যবস্থাপকেরা হকআইয়ের তথ্য ব্যবহার করে হাতি শিকারি ও অবৈধ শিকারিদের ধরার কাজ করেছেন। কৃত্রিম উপগ্রহের এ তথ্যের বাণিজ্যিক ব্যবহার আরও আছে। ক্লেওস নামের প্রতিষ্ঠানের প্রধান বলেন, টেলিকম প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন ক্ষতিকর ট্রান্সমিটারগুলো শনাক্ত করতে এ ধরনের প্রযুক্তি কাজে লাগাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

গুচ্ছ স্যাটেলাইট ব্যবহার করে রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি বা আরএফ বুদ্ধিমত্তা সংগ্রহ করার বিষয়টি কৌশলগত। তবে ফ্রান্সের রেনসের আনসিন ল্যাবসের প্রকৌশলীরা মনে করে, এটি পুরোনো পদ্ধতি। এই মুহূর্তে তাদের তিনটি কৃত্রিম উপগ্রহ কক্ষপথে রয়েছে। তারা ১০টি দেশের নৌবাহিনীর কাছে তথ্য বিক্রি করে। তাদের ক্রেতার তালিকায় রয়েছ ফ্রান্স।

এ ছাড়া সমুদ্রপথের ইনস্যুরেন্স কোম্পানিও তাদের গ্রাহক। তারা ক্লাস্টার বা গুচ্ছ কৃত্রিম উপগ্রহের বদলে একেকটি কৃত্রিম উপগ্রহ স্বাধীনভাবে পরিচালনা করে। তারা এমন একটি শনাক্তকরণ পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে, যা ৫ হাজার মিটারের মধ্যে নিখুঁতভাবে কোনো কিছুর অবস্থান শনাক্ত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমেই কাজটি করা যায়। তবে এই কৃত্রিম উপগ্রহ কীভাবে কাজ করে, তা এখনো গোপন রয়ে গেছে। এ তথ্য চুরি করতে অনেক সাইবার আক্রমণ চালানো হলেও ফ্রান্স সরাসরি একে সুরক্ষা দিয়ে আসছে।

তবে আনসিনল্যাবসের ওই প্রযুক্তি গোপন থাকলেও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী এখন চলে এসেছে। একই রকম প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে হরাইজন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের দাবি, তারা তিন হাজার মিটারের মধ্যে কোনো বস্তুর অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে তিনটি ভিন্ন কক্ষপথ থেকে তিনটি পৃথক কৃত্রিম উপগ্রহ পরিচালনার পরিকল্পনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এটি প্রতি দুই ঘণ্টায় পৃথিবীকে স্ক্যান করবে। হরাইজন তাঁদের পরিকল্পনার মধ্যে অনন্য রাডার পালস ফিঙ্গারপ্রিন্ট লাইব্রেরি নামের প্রযুক্তি যুক্ত করেছে। এতে কোন নৌযান থেকে সংকেত আসছে বা সেটি কোথায় ছিল, সেসব তথ্যও পাওয়া যাবে।

বসে নেই আনসিনল্যাবসও। তারা ইতিমধ্যে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে হাজারো নৌযানের রাডার ফিঙ্গারপ্রিন্ট ক্যাটালগ তৈরি করেছে। তারাও গ্যালাপাগোসে অবৈধ নৌযান থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ইকুয়েডর কর্তৃপক্ষ এখন ওই তথ্য নিয়ে কী করে, তা–ই দেখার বিষয়। আকাশের নজরদারি কল্যাণে ইকুয়েডর এসব বিষয় জানত না, এ অজুহাত তো আর খাটবে না।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন