কীভাবে, কোথায় যাচ্ছে ইউক্রেনীয়রা
প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে পোল্যান্ডে ঢুকতে কখনো কখনো ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের ৬০ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। আর রোমানিয়ায় যারা গিয়েছে, তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০ ঘণ্টার মতো সময়। অনেকে তো ইউক্রেনের শহরগুলো ছাড়তে গিয়ে ট্রেনে জায়গাও পায়নি।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৫ লাখের বেশি মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ঠাঁই নিয়েছে। তার মধ্যে পোল্যান্ডে গিয়েছে ১০ লাখ ৬০ হাজার। পোলিশ বর্ডার গার্ড গতকাল সোমবার জানায়, রোববার ১ লাখ ৪২ হাজার ৩০০ জন ইউক্রেনীয় দেশটির সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেছে।
বর্ডার গার্ড টুইটারে জানিয়েছে, পোলিশ-ইউক্রেনীয় সীমান্তে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। আজ (রোববার) সকাল সাতটায় ৪২ হাজার মানুষ ইউক্রেন থেকে পোল্যান্ডে আসে।
জাতিসংঘের হিসাবে ইউক্রেনের ১৫ লাখের বেশি বাসিন্দা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে ঠাঁই নিয়েছে। গত রোববার জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি মলদোভান সীমান্ত পরিদর্শনের পর বলেন, পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে।
গত রোববার তিনি টুইট করে বলেন, এটি আরও জটিল রূপ নিতে পারে। গত ১০ দিনে ১৫ লাখের বেশি মানুষ ইউক্রেন ছেড়েছে।
ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বলেন, প্রাথমিকভাবে প্রতিবেশী দেশগুলো বেশ ভালোভাবেই পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। ভালো প্রস্তুতি ছিল তাদের। কিন্তু এই সংখ্যা যদি বাড়তে থাকে, তাহলে সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।
কোথায় পালাচ্ছে ইউক্রেনীয়রা
ইউক্রেনের লোকজন পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশ পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, মলদোভা ও রোমানিয়ার দিকে বেশি ছুটছে। এ ছাড়া বেলারুশ ও রাশিয়ায় কিছুসংখ্যক লোক ঠাঁই নিয়েছে।
ইউক্রেন ছাড়ছে কীভাবে
শরণার্থীদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, তাদের কোনো ধরনের কাগজপত্র লাগবে না। তবে দেশ ছাড়ার সময় তাদের সঙ্গে দেশি বা বিদেশি পাসপোর্ট ও শিশুদের জন্মসনদ রাখতে বলা হয়েছে।
দেশগুলো কীভাবে সহায়তা করছে?
পোল্যান্ডসহ ইউক্রেনের সঙ্গে সীমান্তবর্তী দেশগুলো শরণার্থীদের ওই দেশগুলোতে কোনো আত্মীয়স্বজন না থাকলে বিভিন্ন অভ্যর্থনাকেন্দ্রেই থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে তাদের খাবার ও ওষুধসহায়তা দেওয়া হয়। পোল্যান্ড আহত ইউক্রেনীয়দের সরিয়ে নিতে একটি মেডিকেল ট্রেন প্রস্তুত করছে। হাঙ্গেরি ও রোমানিয়া খাদ্য ও কাপড়ের জন্য শরণার্থীদের অর্থসহায়তা দিচ্ছে। শিশুদের স্থানীয় স্কুলে জায়গা দেওয়া হচ্ছে। চেক প্রজাতন্ত্র এই শরণার্থীদের দেশটিতে থাকার জন্য বিশেষ ভিসার আবেদনের সুযোগ দিয়েছে।
পোল্যান্ড ও স্লোভাকিয়া শরণার্থীদের জন্য সহায়তা দিতে ইইউকে অনুরোধ করেছে। এর ফলে গ্রিস ও জার্মানি স্লোভাকিয়ায় তাঁবু, কম্বল ও মাস্ক পাঠিয়েছে। ফ্রান্স পোল্যান্ডে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেন থেকে পালিয়ে আসা লোকজনের জন্য ইইউভুক্ত ২৭টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত থাকা ও কাজ করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের সব ধরনের সামাজিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে। আবাসন, চিকিৎসা ও সন্তানদের স্কুলে পড়ানোরও সুযোগ পাবেন ইউক্রেনীয়রা।
যুক্তরাজ্য কীভাবে সাহায্য করছে
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, তাঁর দেশ দুই লাখ ইউক্রেনীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে পারবে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও চাইলে কোনো ইউক্রেনীয়কে এ দেশে আসতে স্পনসর করতে পারে। হোম অফিস (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) দ্রুতই এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে পারবে বলে আশা করছে।
ব্রিটিশ নাগরিকত্ব রয়েছে, এমন কেউ যিনি সাধারণত ইউক্রেনেই থাকেন, তাঁর পরিবার চাইলে যুক্তরাজ্যে পারিবারিক অভিবাসন ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন। কিয়েভে ভিসা প্রসেসিং সেন্টার বর্তমানে বন্ধ আছে। কিন্তু পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লভিভে প্রসেসিং সেন্টার খোলা আছে। লোকজন চাইলে সেখান থেকে কাছের দেশগুলোর জন্য আবেদন করতে পারেন।
কত ইউক্রেনীয় দেশেই বাস্তুচ্যুত
জাতিসংঘের হিসাবে এই সংঘাতে অন্তত ১ লাখ ৬০ হাজার ইউক্রেনীয় নিজ দেশে বাস্তুহারা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আশঙ্কা এই সংখ্যা ৭০ লাখে পৌঁছাতে পারে আর ১ কোটি ৮০ লাখ ইউক্রেনীয় এই সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন জানিয়েছে, তারা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত লোকজনকে সহায়তার চেষ্টা করছে। কিন্তু পরিস্থিতি সহায়তাকর্মীদের জন্য অনিরাপদ। এরপরও পশ্চিম ইউক্রেনে যাওয়াটা সহজ হওয়ায় সেখানে জাতিসংঘ সহায়তা প্রদানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসি