default-image

অপরাধ বাড়ছে, বাড়ছে অপরাধীর সংখ্যা। তাদের ওপর নজরদারি করার জন্য তৎপর হতে হচ্ছে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের। অপরাধের ধরন বদলে যাওয়ায় তাদেরও হতে হচ্ছে অনেক বেশি কৌশলী। গোয়েন্দাদের কর্মকাণ্ড কীভাবে চলে—এ প্রশ্নটা অনেকেরই মনে তড়পায়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের নানা দিক।
চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ফ্রান্সের প্যারিসে ব্যঙ্গাত্মক সাময়িকী শার্লি এবদোর কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় বেশ কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। যারা এই হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের ব্যাপারে ২০১১ সালে মার্কিন গোয়েন্দারা ফ্রান্স কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিল। মার্কিন গোয়েন্দারা তখন জানিয়েছিল, ফ্রান্সের এক নাগরিক সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণ নিতে ইয়েমেন গেছেন। ওই বছরের নভেম্বর থেকে ফ্রান্সের গোয়েন্দারা সাইদ কোয়াচি নামের ওই ব্যক্তির ওপর গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। সাইদ ও তাঁর ছোট ভাই শরিফের মোবাইল ফোনে আড়ি পাতা হয়। ২০১৩ সালের শেষ দিকে শরিফের ওপর থেকে গোয়েন্দা নজরদারি প্রত্যাহার করে নেয় ফ্রান্সের গোয়েন্দারা। এর মাস ছয়েক পর সাইদের ওপর থেকেও নজরদারি প্রত্যাহার করা হয়। এভাবেই আলজেরীয় বংশোদ্ভূত ফ্রান্সের এই দুই ভাই গোয়েন্দাদের নজরদারি থেকে মুক্ত হন।
এতে অবশ্য সাইদ ও শরিফ নির্দোষ থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হয় না। আর মার্কিন গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্য ভুল ছিল। ৭ জানুয়ারি প্যারিসে এই দুই ভাই ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শার্লি এবদোর কার্যালয়ে হামলা চালান। এতে ১২ জনের প্রাণহানি ঘটে।

গোয়েন্দা নজরদারি প্রত্যাহারের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে ফ্রান্সকে। এ কথা সত্য যে সিরিয়া ও ইরাকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) পক্ষে যুদ্ধ করে ফেরা সব জিহাদির ওপর নজরদারি করা চাট্টিখানি কথা না। তা করতে গিয়ে তাদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। শুধু মোবাইল ফোনে নজরদারি করে অপরাধীকে পাকড়াও করার মতো সময় এখন আর নেই। যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অপরাধ কৌশলে পরিবর্তন এসেছে, সেকেলে কৌশল নিয়ে নেই অপরাধীরা।

গোয়েন্দা নজরদারির জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সন্দেহভাজনের ওপর সরাসরি নজরদারি করা। ফোনে আড়ি পাতা হয় জেনে এখন আর সন্ত্রাসীরা ফোনে কথাবার্তা বলে না। তাই সন্দেহভাজন অপরাধী কখন, কোথায় গেল, সেগুলো উপস্থিত থেকে নজরদারি করলে ভালো ফল দেয়। তবে এ ক্ষেত্রে জনবল প্রধান সমস্যা।

ফ্রান্সের বিচারব্যবস্থার সন্ত্রাসবাদবিষয়ক প্রধান তদন্তকারী মার্ক ত্রেভিদিক নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ফোনে আড়ি পেতে কোনো লাভ হয় না। অপরাধী এখন ফোনে কথা বলে না। তবে সশরীরে উপস্থিত থেকে নজরদারি করা অর্থ ও জনবলের অপচয় এবং বিষয়টি ব্যয়বহুল বলে মনে করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফ্রান্সের সাবেক এক সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তা। তাঁর সঙ্গে একমত মার্কিন গোয়েন্দারাও।

কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ফিলিপ এ পার্কারের মতে, কোনো সন্দেহভাজনের ওপর ২৪ ঘণ্টা নজর রাখতে হলে জনবলের অপচয় হয়। আট ঘণ্টা করে হলে দিনে তিনটি শিফট বা ১২ ঘণ্টা করে হলে দুটি শিফটে কাজ করতে হয়। নাম প্রকাশ না করে একজন কর্মকর্তা বলেন, এক শিফটে একজন গোয়েন্দা থাকলে চলে না; অন্তত চারজন প্রয়োজন। সে হিসাবে আট ঘণ্টার শিফটে প্রয়োজন ১২ জন আর ১২ ঘণ্টার শিফটে প্রয়োজন আটজন গোয়েন্দার। গাড়িসহ সহায়ক আরও অনেক কিছু প্রয়োজন এমন নজরদারির জন্য। আবার এই ১২ জন একটানা কাজ করলে লোকে চিনে ফেলতে পারে বা মানুষ সন্দেহ করতে পারে। তাই দলে ২৪ জনের মতো গোয়েন্দা রাখতে হয়, যাতে তারা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কাজ করতে পারে।

চাকরিজীবনের বেশির ভাগ সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও রাশিয়ার চরদের ওপর গোয়েন্দাগিরি করা ফিলিপ এ পার্কার বলেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তি সব সময় চলাচল করে না। সে ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি যখন কোনো বাসায় অবস্থান নিয়ে থাকে, তখন তাকে পুরোপুরিভাবে নজরদারিতে রাখা যায় না। এটা এ ধরনের গোয়েন্দাগিরির ক্ষেত্রে এক ধরনের সীমাবদ্ধতা।

এ ধরনের নজরদারির ক্ষেত্রে কত অর্থ খরচ হয়? বিষয়টি বুঝতে হলে এফবিআই গোয়েন্দাদের ঘণ্টাভিত্তিক বেতন বিশ্লেষণ করতে হবে। একজন এফবিআই গোয়েন্দা আট ঘণ্টার শিফট হিসাবে সপ্তাহে এক হাজার ২৩০ ডলার বেতন পান। সে অনুযায়ী ২৪ জন গোয়েন্দার বেতনই দাঁড়ায় সাড়ে ২৯ হাজার ডলারের বেশি। এর সঙ্গে আছে গাড়িভাড়াসহ অন্যান্য খরচ। একজন সন্দেহভাজনের ওপর নজরদারির জন্য সপ্তাহে এ পরিমাণ ব্যয় অবশ্যই বেশি। আর এটি যদি দিনের পর দিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে এ কর্মকাণ্ড যে কতটা ব্যয়বহুল হয়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিজ্ঞাপন
ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন