default-image

যেকোনো জাতি-গোষ্ঠীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শিল্পকর্মের নিদর্শন শোভা পায় জাদুঘরে। যেখানে পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন, বৈজ্ঞানিক, শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক মূল্যবান জিনিসপত্র সাধারণ মানুষের জন্য প্রদর্শন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে জাদুঘর। যেখানে সংরক্ষিত আছে হাজার হাজার বছরের পুরোনো মানবসভ্যতার নিদর্শন ও ইতিহাস।

সম্প্রতি সেনেগালের রাজধানী ডাকারে ব্ল্যাক সিভিলাইজেশন নামের একটি জাদুঘর উদ্বোধন করা হয়েছে। এই জাদুঘরে অন্য সবের মধ্যে আছে একটি তরবারি, একটি কোরআন শরিফ ও অপরিচ্ছন্ন চামড়ার একজোড়া স্যান্ডেল। এসব ব্যবহার করতেন পশ্চিম আফ্রিকার রাজনৈতিক নেতা, ইসলামিক পণ্ডিত ও সুফি সেনা কমান্ডার হাদিজ ওমর তাল, যিনি ১৮৬৪ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজ জাতিগোষ্ঠীর জন্য বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের অনেক স্মারক, নমুনা ও স্মৃতি হস্তগত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ওসবের ঠাঁই হয়েছে ফ্রান্সের বিভিন্ন জাদুঘরে। শুধু তাঁর নয়, আফ্রিকান ইতিহাস ও সংস্কৃতির অনেক কিছুই ফরাসি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। সম্প্রতি ডাকারে ওই জাদুঘর উদ্বোধন হওয়ায় অস্থায়ীভাবে ফ্রান্স এসব ফেরত দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাদুঘর নিয়ে কাজ করছে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর নেতৃত্বাধীন একটি কমিশন। গত বছরের নভেম্বরে কমিশনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আফ্রিকার ৯৫ শতাংশ সাংস্কৃতিক নিদর্শন রয়েছে আফ্রিকা মহাদেশের বাইরে। এসবের বেশির ভাগ বিভিন্ন সময় লুট, চুরি, জোরজবরদস্তি কিংবা ধার নেওয়া হয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে আর ফেরত আসেনি। এবার সেসব ফিরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন।

২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেন, ‘বেশ কিছু আফ্রিকান দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্মারক ফ্রান্সে পড়ে থাকার বিষয়টি আমি মেনে নিতে পারি না। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে আফ্রিকান ঐতিহ্যের নিদর্শনগুলো আমি ফেরত দিতে চাই।’

ফ্রান্সের মিউজিয়ামগুলোর পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করার আগেই মাখোঁর এমন বক্তব্যে বিস্মিত ও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন তাঁরা। ফ্রান্সের সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী জিন-জ্যাকস অ্যালাগুন স্থানীয় সংবাদপত্র লি ফিগারোকে বলেন, কমিশনের সুপারিশ ফ্রান্সের মিউজিয়ামগুলোয় আফ্রিকান সংগ্রহকে খালি করতে প্রভাবিত করবে।

default-image

ব্রিটিশ মিউজিয়ামেও আছে বিভিন্ন দেশের পুরাকীর্তি। এটিও একই ধরনের চাপে পড়েছে। মিউজিয়ামটির পরিচালক হার্টউইগ ফিশার জানান, বেনিন ব্রোঞ্জের জন্য নাইজেরিয়া ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। তুরস্ক ও গ্রিস একই দাবি জানিয়েছে। কমিশনের ওই প্রতিবেদনে নাখোশ হয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিবেদনটি মোটেই আমাদের জন্য সহায়ক নয়।’

এবারই প্রথম নয়, পাশ্চাত্যের জাদুঘরগুলো এর আগেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। ব্রিটেন ও গ্রিসের মধ্যে পুরোনো বিরোধের অন্যতম ছিল এথেন্সের মার্বেল মূর্তি। পরে ১৮১৬ সালে ব্রিটিশ সরকার তাদের মিউজিয়ামের জন্য তা কিনে নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্রিসের সাহায্যের প্রয়োজন ছিল ব্রিটেনের। তখন ব্রিটেনের পররাষ্ট্র দপ্তর গ্রিসের পুরোনো নিদর্শনগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে পরিকল্পনা করেছিল। পরে সংকট কেটে গেলে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চুরি যাওয়া ঢাল-তলোয়ার ফেরত চেয়ে রাশিয়ার কাছে আবেদন জানায় জার্মানি সরকার। রাশিয়া তা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের গবেষণা কেন্দ্র ও জাদুঘরগুলোর তত্ত্বাবধানকারী প্রতিষ্ঠান স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউট হাজার হাজার সমাধিস্তম্ভ ও পবিত্র বস্তু নেটিভ আমেরিকান উপজাতিদের ফেরত দিয়েছে।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশ জায়ারের (বর্তমানে কঙ্গো প্রজাতন্ত্র) সাবেক প্রেসিডেন্ট মোবুতু সেস সেকো ১৯৭৩ সালে প্রথম আফ্রিকান শিল্পকর্মের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি জনসমক্ষে আনেন। সে সময় নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের আগে চুরি যাওয়া মূল্যবান জিনিসপত্র ফেরতের সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সেসব ফেরত পেলে আমরা আমাদের ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনিদের ইতিহাস শিক্ষা দিতে পারি।’

গত কয়েক দশকে ইউরোপিয়ান মিউজিয়ামের কিউরেটেরা কেন আফ্রিকান পুরাকীর্তি সম্পদ ফেরত দেননি, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, দুর্নীতি একমাত্র সংকট নয়। শিল্পকর্মকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের মধ্যে সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি হয়। তাই তাঁরা সেসব ফিরিয়ে দেওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন। এ ছাড়া শিল্পকর্ম ফেরতসংক্রান্ত অর্থনৈতিক জটিলতাও আছে।

default-image

নিজ নিজ জাতিগোষ্ঠীর পুরাকীর্তি, শিল্পকর্ম, প্রত্নসম্পদ ও ঐতিহাসিক নিদর্শন ফেরত দেওয়ার বিষয়ে প্রচারণা চালিয়েছে জার্মানিস গ্রিন পার্টি। তারা বলেছে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে জার্মান উপনিবেশের সময় হস্তগত হওয়া বার্লিনে অবস্থিত জাদুঘরগুলোর ২০ হাজার জাতিগত শিল্পকর্ম ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। অবশ্য এই প্রচারণাকে থোড়াই কেয়ার করেছে তানজানিয়া।

ফ্রান্সের কাছে ১০০ প্রাচীন সামগ্রী ফেরত চেয়েছে আইভরি কোস্ট। দেশটি বলছে, সেসব প্রদর্শনী করার জন্য তাদের গ্যালারি আছে। ইউনেসকোর সহযোগিতায় মালির গাওতে নতুন একটি জাদুঘর চালু হয়েছে। খুব শিগগির আরও একটি জাদুঘর উদ্বোধন করা হবে টিম্বাকটুতে। ১৮৯২ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বেনিনের রাজপ্রাসাদ থেকে শিল্পকর্ম লুট করে নিয়ে যায় ফরাসি সেনারা। সম্প্রতি বেনিনে জাদুঘরের জন্য তিনটি ভবন নির্মিত হচ্ছে। তারাও সেসব শিল্পকর্ম ফেরতের জন্য ফ্রান্সের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কিছু দেশের জাদুঘরের শিল্পকর্ম হারানোর আশঙ্কা ও অন্য কিছু দেশের তা প্রাপ্তির সম্ভাবনা। ফলে, এই একবিংশ শতাব্দীতে দেশে-দেশে জাদুঘরের সংকট ও সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।

নাইজেরিয়ার ইদো রাজ্য সরকার ও রাজকীয় আদালত দেশটির বেনিন শহরে জাদুঘর ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। ১৮৯৭ সালে লুট হওয়া সাংস্কৃতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারে চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। এরই মধ্যে দেশটি হাজারের অধিক বেনিন ব্রোঞ্জের সন্ধান পেয়েছে ইউরোপ, আমেরিকার ও ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। খুব শিগগির মিউজিয়াম ভবনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে যাচ্ছে ইদো রাজ্য সরকার। যেখানে গ্যালারিসহ থাকবে একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট। মূল্যবান সম্পদ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা ইদো রাজ্যের নির্বাহী গভর্নর গডউইন ওবাসেকি বলেন, ‘আমরা কে, তা ফের জানান দেওয়া হবে।’

বিজ্ঞাপন
ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন