বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তবে চলতি বছরে করোনার টিকা উদ্ভাবন আর গণটিকা কার্যক্রমের কারণে ইউরোপের মানুষের মধ্যে আশা জেগেছিল। করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকাকে শক্ত হাতিয়ার ভেবেছিল তারা। ইউরোপে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে করোনা পরিস্থিতি খানিকটা স্বাভাবিকও হয়ে উঠেছিল। দেশে দেশে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়। অফিস-আদালত, রেস্তোরাঁ, পানশালা—প্রায় সবই খুলে দেওয়া হয়। এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের ফ্লাইটও পুনরায় চালু হয়। ভেঙে পড়া অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউরোপে আবার করোনা সংক্রমণ বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। গেল সপ্তাহে রেকর্ড সংখ্যক (২২ থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত) ৬৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষের করোনা শনাক্ত হয়েছে ইউরোপের দেশগুলোতে। শনাক্তের এ সংখ্যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। করোনার বিস্তার ঠেকাতে আবারও দেশে দেশে লকডাউনসহ নানা বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। বড়দিনের উৎসবের মধ্যে এই অঞ্চলে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। জার্মানিসহ কয়েকটি দেশে করোনার ডেলটা ধরনের দাপটের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে এই ভাইরাসের নতুন ধরন অমিক্রন ছড়িয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বছরের শেষটা ইউরোপবাসী দুশ্চিন্তা নিয়েই শেষ করতে যাচ্ছে। আবারও আশঙ্কা জেগেছে, অমিক্রনের দাপটে ইউরোপ কি পুনরায় করোনার কেন্দ্র হতে যাচ্ছে?

ভেঙেছে অতীতের রেকর্ড

default-image

এর মধ্যেই জার্মানিতে দৈনিক সংক্রমণের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বছরের শেষে এসে দেশটিতে এক দিনে সর্বোচ্চ ৩৭ হাজার করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্তের রেকর্ড হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে তো বেহাল। চলতি মাসেই যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো দৈনিক করোনা সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে।

বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ফ্রান্সে যে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে, তা এখন পর্যন্ত ইউরোপের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। ফ্রান্সে মঙ্গলবার ১ লাখ ৭৯ হাজারের বেশি মানুষের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। করোনাভাইরাসের মহামারি শুরুর পর থেকে এক দিনে এত সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি দেশটিতে। এর আগে এক দিনের ব্যবধানে কোনো দেশেই এত বেশি রোগী শনাক্ত হয়নি। গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে নতুন করে ১ লাখ ২৯ হাজারের বেশি মানুষের সংক্রমণ ধরা পড়েছে।

এদিকে ইউরোপের যে দেশগুলোয় সংক্রমণের রেকর্ড হয়েছে, সেগুলোর অন্যতম ইতালি। দেশটিতে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৭৮ হাজার মানুষ, মারা গেছেন ১৭৫ জন। গ্রিসে আক্রান্ত হয়েছেন ২১ হাজার, মারা গেছেন ৬১ জন। পর্তুগালে আক্রান্ত হয়েছেন ১৭ হাজার, মারা গেছেন ১৯ জন।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, ইউরোপে যেসব দেশ করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম যুক্তরাজ্য। দেশটিতে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৪৭ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ডিসেম্বরের শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যে করোনা রোগী ছিল ১৪ লাখের বেশি। বলা হচ্ছে, ২০২০ সালে যুক্তরাজ্যে মহামারি আঘাত হানার পর এই প্রথম একসঙ্গে এত রোগী ছিল না। দেশটিতে এখন পর্যন্ত অমিক্রনে আক্রান্ত রোগী মারা গেছেন ১৪ জন।

ইউরোপের আরেক দেশ রাশিয়াও বছরের শেষটা ভালোভাবে কাটাতে পারেনি। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি এক সপ্তাহে রাশিয়ায় করোনায় আক্রান্ত ৮ হাজার ১০০ জনের মৃত্যু হয়। একই সময়ে ইউক্রেনে মারা যান ৩ হাজার ৮০০ জন। রোমানিয়া ও হাঙ্গেরির মতো দেশগুলোতেও এক দিনে করোনায় মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে ডিসেম্বরে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইউ) প্রকাশিত সর্বশেষ হিসাব, মহামারি শুরুর পর থেকে ইউরোপে এখন পর্যন্ত ৮ কোটি ৯০ লাখের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আর মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, করোনার অন্য সব ধরনের তুলনায় অমিক্রন অতিসংক্রামক। এখন পর্যন্ত ইউরোপেই অমিক্রনের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। এক সংবাদ সম্মেলনে ডব্লিউএইচওর ইউরোপীয় অঞ্চলের প্রধান হ্যান্স ক্লুগ বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই অঞ্চলে আরও ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এর জন্য তিনি টিকা কার্যক্রমের ধীর গতিকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই করোনা মোকাবিলার কৌশল পরিবর্তন করতে হবে।’ তাঁর আশঙ্কা, আবারও করোনার কেন্দ্রে পরিণত হতে যাচ্ছে ইউরোপ। অঞ্চলটিতে করোনা সংক্রমণ আবারও বেড়ে যাওয়ার পেছনে স্বাস্থ্য সুরক্ষা পদক্ষেপে গাছাড়া ভাবকে দায়ী করেছেন ক্লুগ।

বছর শেষে টিকা কার্যক্রমে ধীর গতি

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি ইউরোপে টিকাদান হার কমে গেছে। স্পেনে ৮০ শতাংশ মানুষ টিকার দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছেন। অন্যদিকে জার্মানিতে ৬৬ শতাংশ মানুষকে টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে। গত অক্টোবর পর্যন্ত রাশিয়ার মাত্র ৩২ শতাংশ মানুষকে টিকার পূর্ণ ডোজ দেওয়া হয়েছে। ডব্লিউএইচওর তথ্য, ইউরোপীয় অঞ্চলের ৫৩ দেশের মধ্যে কমপক্ষে ৩৮টি দেশে অমিক্রন শনাক্ত হয়েছে।

সম্প্রতি ডব্লিউএইচওর কোভিড-১৯-এর কারিগরিবিষয়ক প্রধান ও মহামারি বিশেষজ্ঞ মারিয়া ভ্যান কারখোভ বলেন, ‘প্রচুর টিকা ও সরঞ্জাম সরবরাহ’ সত্ত্বেও গত চার সপ্তাহে ইউরোপজুড়ে করোনা সংক্রমণ ৫৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তাঁর সহকর্মী মাইক রায়ান বলেন, ইউরোপের বর্তমান অভিজ্ঞতা ‘পুরো বিশ্বের জন্য সতর্কতামূলক’।

যত চিন্তা অমিক্রন নিয়ে

ইউরোপের যত চিন্তা এখন অমিক্রন নিয়ে। অমিক্রনের কারণে করোনার সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে, চলতি শীতে তা কোন দিকে মোড় নেয়, সে ভবিষ্যদ্বাণী কেউ করতে পারছেন না। তবে ডব্লিউএইচও বলছে, ইউরোপে এই শীতে করোনায় মৃত্যুর মিছিল থামানো কঠিন হয়ে যাবে।

default-image

এর আগে নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শনাক্ত হয় অমিক্রন। করোনাভাইরাসের এখন পর্যন্ত যতগুলো ধরন শনাক্ত হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশিবার জিনগত রূপবদল (মিউটেশন) করেছে অমিক্রন। অন্য ধরন এমনকি একসময় বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া ডেলটার তুলনায় অমিক্রন বেশি সংক্রামক হওয়ায় এই ধরন নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

ডব্লিউএইচও বলছে, অমিক্রন ধরনটি উচ্চ বৈশ্বিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ ইঙ্গিত দিচ্ছে, অমিক্রন টিকার কার্যকারিতা হ্রাস করে।

অমিক্রন ঠেকাতে দেশে দেশে নানা পদক্ষেপ

অমিক্রনের ধাক্কা সামলাতে আবারও ইতালি, স্পেন ও গ্রিস—বছর শেষে ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করেছে। স্পেনের উত্তর কাতালোনিয়া রাতে কারফিউ জারি করেছে। নেদারল্যান্ডসে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। তবে যেসব দেশে হুট করে করোনা সংক্রমণ বেড়েছে, তারা কঠোর বিধিনিষেধের পথে এখনই হাঁটছে না, বরং টিকাদানের ওপরই জোর দিচ্ছে তারা। ইংল্যান্ড আপাতত বিধিনিষেধের পথে না হাঁটলেও স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড সামাজিক মেলামেশা ঠেকাতে ব্যবস্থা নিয়েছে। সংক্রমণের লাগাম টানতে বিধিনিষেধ জারি করেছে ফিনল্যান্ড, পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডসসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বিধিনিষেধ কার্যকরের চেয়ে এ বছরের শেষ নাগাদ দেশের সব প্রাপ্তবয়স্ককে বুস্টার ডোজ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তাঁর বড়দিনের বার্তায় করোনা প্রতিরোধী টিকা নিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। টিকা নেওয়াকে পরিবার ও দেশের জন্য বড়দিনের ‘দারুণ’ উপহার হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি সামাল দিতে বিধিনিষেধ ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে জার্মানি। ২৮ ডিসেম্বর থেকে ১০ জনের বেশি লোক ব্যক্তিগত কাজে একত্র হতে পারবেন না। বন্ধ থাকবে নৈশ ক্লাবগুলো। একই দিন থেকে ফুটবল খেলা দেখতে মাঠে উপস্থিত থাকতে পারবেন না দর্শকেরা।

এর আগে ২৬ ডিসেম্বর থেকে পর্তুগালের পানশালা ও নৈশ ক্লাবগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই দিন থেকে জানুয়ারির ৯ তারিখ পর্যন্ত বাধ্যতামূলকভাবে বাসা থেকে কাজকর্ম করতে হবে। বাসার বাইরে ১০ জনের বেশি মানুষ জড়ো হওয়ার ওপরও থাকছে নিষেধাজ্ঞা।

ফিনল্যান্ডের পানশালা ও রেস্তোরাঁগুলো ২৪ ডিসেম্বর থেকে রাত ১০টায় বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরে ২৮ ডিসেম্বর থেকে তিন সপ্তাহ রেস্তোরাঁগুলো রাত ৮টায় বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি আসন সীমিত রাখার বিধিনিষেধও দেওয়া হয়েছে। বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে সুইডেন সরকার। দেশটির পানশালা, ক্যাফে ও রেস্তোরাঁগুলোর ওপরও নতুন নির্দেশনা এসেছে।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন