বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কেন এই সংকট

পুরো লন্ডন শহরসহ যুক্তরাজ্যের অন্যান্য অংশে গ্যাস স্টেশনগুলোতে গ্যাস ফুরিয়ে গেছে। চলমান এই সংকট ৭০-এর দশকে সৃষ্ট জ্বালানিসংকটের বিষয়টি মনে করিয়ে দিচ্ছে। ওই সময় পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর বৈশ্বিক জোট ‘ওপেক’ তেল রপ্তানি বন্ধ করায় চরম জ্বালানিসংকট দেখা দেয়। কিন্তু এবারের সংকটটি একেবারে ভিন্ন। জ্বালানি সরবরাহ করার মতো চালক না থাকায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যোর অধিকাংশ ট্রাকচালকের বয়স হয়েছে। অনেকে অবসরে চলে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে করোনা মহামারির কারণে শিক্ষানবিশ চালকদের ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স’ পেতে দেরি হচ্ছে। পণ্য পরিবহনের সঙ্গে জড়িত কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, পুরোনো চালকদের ধরে রাখতে চলতি বছর প্রায় ২৫ শতাংশ কিংবা তারও বেশি বেতন বাড়িয়েছে তারা।
চলমান জ্বালানিসংকট রেস্তোরাঁগুলোতেও প্রভাব ফেলেছে। খাবার ও অন্যান্য মুদিপণ্য পেতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে রেস্তোরাঁগুলোর পণ্যের তাকগুলো খালি হয়ে পড়েছে। গ্যাস স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের সংকটের খবরে উদ্বিগ্ন চালকেরা। সরবরাহ ফুরিয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কায় সাম্প্রতিক সময়ে গাড়িচালকদের মধ্যে অতিরিক্ত গ্যাস নেওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে, যা সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

ব্রেক্সিটের প্রভাব

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) পর যুক্তরাজ্য ভয়াবহ শ্রমিক–সংকটের মুখে পড়েছে। যদিও এটিকে সংকটের মূল কারণ হিসেবে ধরা ঠিক হবে না।

যুক্তরাজ্যের পণ্যবাহী যানবাহন পরিচালনায় যুক্ত সংগঠন ‘দ্য রোড হলেজ অ্যাসোসিয়েশন’ বলছে, দেশটি প্রায় এক লাখ চালকের সংকট রয়েছে। এই চালকের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশই ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য ছেড়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে দেশটির চালকদের আকৃষ্ট করতে তাঁদের দৈনিক কর্মঘণ্টা বাড়িয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। এ ছাড়া দ্রুত লাইসেন্স সরবরাহেরও ব্যবস্থা করেছে তারা। চালকসংকট নিরসনে পাঁচ হাজার বিদেশি ট্রাকচালকের জন্য তিন মাসের ‘কাজের অনুমতির ভিসা’ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি পণ্য সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়, এমন নিয়মও স্থগিত করেছে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সরকার।

কিন্তু সরকারের কিছু সমালোচক বলছেন, যুক্তরাজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই চালকসংকট রয়েছে। এই সমস্যা নিরসনে সরকারের নেওয়ার পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট নয়। তাঁদের মতে, করোনা মহামারিকালে প্রায় দুই লাখ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর নাগরিক যুক্তরাজ্য ছেড়েছেন, যা ২০১৬ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ। ওই বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে যুক্তরাজ্যের নাগরিকেরা ভোট দেন এবং ইইউভুক্ত দেশগুলো থেকে অভিবাসীর সংখ্যা সীমিত করার কথা জানায়। এসব কারণে ভ্রমণ, খাদ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে বিদেশি চালক নিয়োগ দেওয়ার পথ কঠিন হয়ে পড়ে।

default-image

পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত সেনাবাহিনী

জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় সামনের দিনগুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে পাম্পে পাম্পে জ্বালানি সরবরাহের কথা জানিয়েছেন দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী। বুধবার তিনি টুইট করেন, সরকারের রিজার্ভ ট্যাংকারের বহর পৌঁছে যাবে পাম্পগুলোতে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।

পেট্রোল রিটেইলার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, এখন আগের চেয়ে বেশিসংখ্যক স্টেশনে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাজ্য সরকারি কর্মকর্তারা আশা করছেন, সামনের দিনগুলোতে সংকট প্রকট হবে, এমন আশঙ্কায় কয়েক দিন ধরে অনেক নাগরিক অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত করেছেন। শিগগিরই এই প্রবণতা স্বাভাবিক হবে। এরপরও যদি জ্বালানিসংকট খারাপের দিকে যায়, তাহলে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর ১৫০ জন ট্যাংকারচালককে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

তবে ট্যাক্সিচালক, খাদ্য সরবরাহকারী এবং যাদের জীবনযাত্রা সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, তাঁরা এখনো বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছে। লাইসেন্সড ট্যাক্সি ড্রাইভারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক স্টিভ ম্যাকনামারা বলেন, তাঁদের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সদস্য গত মঙ্গলবার জ্বালানি না পাওয়ায় কাজে যেতে পারেননি। বুধবার বিবিসিকে বলেন, ‘জ্বালানি তেল ছাড়া একজন ট্যাক্সিচালক বেকার।’

জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রী জনসনের

চলমান সংকট নিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন শুধু প্রয়োজন হলেই গাড়িতে জ্বালানি ভরানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। বরিস বলেন, ‘আমি জানি, জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে চিন্তা করা কতটা হতাশাজনক ও উদ্বেগজনক। তবে আমরা পরিস্থিতির উন্নতি দেখতে শুরু করেছি। জ্বালানি খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি যে পাম্পগুলোতে সরবরাহকারীরা স্বাভাবিক কাজে ফিরতে শুরু করেছেন। আর তাই আমি সবাইকে যার যার কাজ করে যাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। এ জন্য স্বাভাবিকভাবে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু জ্বালানি নেওয়া উচিত।’
*নিউইয়র্ক টাইমস ও বিবিসি অবলম্বনে মেহেদি হাসান

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন