ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত হচ্ছে পুতিনের

এবারের নির্বাচনে তাঁর তিন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও কেউ-ই তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেননি। ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে দুই বছর ধরে রাশিয়ার রাজনীতিতে আধিপত্য দেখিয়ে আসছেন পুতিন।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ক্ষমতা আরও ছয় বছরের জন্য পাকাপোক্ত হচ্ছে। আজ শুক্রবার থেকে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিন দিনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। নির্বাচনে পুতিনের কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচনে তিনিই জিততে চলেছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে দুই বছর ধরে পুতিন রাশিয়ার রাজনীতিতে আধিপত্য দেখিয়ে আসছেন। এবারের নির্বাচনে তাঁর তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও তাঁরা দৃশ্যমান কোনো চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেননি।

ক্রেমলিন বলেছে, পুতিন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯৯ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন। এবারের নির্বাচনেও তাঁর জয়ের সম্ভাবনা বেশি। কারণ, রুশ সমাজে তাঁর ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। তিনি রাশিয়াকে সোভিয়েত-পরবর্তী যুগে বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করেছেন এবং পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন।

রাশিয়ায় বিরোধী দলের পরিচিত মুখ ছিলেন অ্যালেক্সি নাভালনি। গত মাসে তিনি কারাগারে আকস্মিকভাবে মারা যান। ক্রেমলিনের সমালোচকদের কেউ কেউ নির্বাসনে রয়েছেন, আবার কেউ কারাগারে। এই নির্বাচনকে বিরোধীরা ‘প্রহসনের’ ভোট বলে মন্তব্য করেছেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্যমতে, রাশিয়ার এই নির্বাচনে মোট ভোটার ১১ কোটি ২৩ লাখ। প্রবাসী ১৯ লাখ ভোটার নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ১১ কোটি ৩৫ লাখ ৭৪ হাজার ৫৫০টি ব্যালট ছাপা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আগাম ভোট পড়েছে ২০ লাখ।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল আটটায় রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় কামচাটকা উপদ্বীপে ভোট গ্রহণের মধ্য দিয়ে নির্বাচন শুরু হয়। স্থানীয় সময় আগামী রোববার রাত আটটায় পশ্চিমাঞ্চলীয় কালিনিনগ্রাদে সর্বশেষ ভোট হবে। যেসব অঞ্চলকে নিজেদের সীমানায় রাশিয়া অন্তর্ভুক্ত করেছে, সেগুলোতেও ভোট হচ্ছে। ইউক্রেন এই নির্বাচনের কড়া সমালোচনা করছে। তারা বলছে, এখানে নির্বাচন অবৈধ ও এর কোনো মূল্য নেই।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, অল রাশিয়া পিপলস ফ্রন্টের প্রার্থী তথা বর্তমান প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে মূল লড়াই হচ্ছে রুশ কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী নিকোলাই খারিতনভের। এ ছাড়া লড়াইয়ে রয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপিআর) লিওনিদ স্লুৎস্কি এবং ইউনিয়ন অব প্রগ্রেসিভ পলিটিক্যাল ফোর্সেসের ভ্লাদিস্কভ ডাভানকোভ। তবে তাঁরা কেউই পুতিনের কোনো সমালোচনা করেননি।

রাশিয়ায় সাধারণত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৭ থেকে ৮ কোটি ভোট পড়ে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পড়েছিল।

৭১ বছর বয়সী পুতিন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। ১৯৯৯ সালে তিনি রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হন। ২০০০ সালে ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০০৪ সালের নির্বাচনে তিনি ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ২০০৮ সালে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায় দিমিত্রি মেদভেদেভ প্রেসিডেন্ট হন আর প্রধানমন্ত্রী হন পুতিন। এরপর ২০১২ সালে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়ে আবার প্রেসিডেন্ট হন তিনি। এর পর থেকে তিনিই প্রেসিডেন্ট পদে রয়েছেন।

* ‘প্রহসনের’ ভোট বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীরা।
* কঠিন সময়ে জনগণকে পাশে থাকার আহ্বান পুতিনের।
* ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পাবেন, আভাস সরকারি জরিপ প্রতিষ্ঠানের।  

রাশিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, একজন প্রেসিডেন্ট দুই মেয়াদে টানা সর্বোচ্চ আট বছর ক্ষমতায় থাকতে পারেন। ২০০৮ সালে সংশোধনী এনে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ ছয় বছর করা হয়। ২০২০ সালের আরেক সংশোধনীতে ২০২৪ সাল থেকে পুতিনের ক্ষমতার মেয়াদ আবার বাড়ানো হয়। এখন তিনি ২০৩৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পাবেন।

পশ্চিমাদের চোখে পুতিন স্বৈরাচার হলেও দেশে তাঁর প্রতি ৮৫ শতাংশ জনসমর্থন রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর তিনি বিরোধীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন জোরদার করেন। তাঁর কট্টর সমালোচকদের মধ্যে কেউ বিদেশে পালিয়ে গেছেন, কেউ রুশ কারাগারে বন্দী।

২০০০ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাশিয়ার ক্ষমতায় আছেন পুতিন। এবারের নির্বাচনে পুতিনের জয় কার্যত নিশ্চিত বলেই ধারণা রুশ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। অর্থাৎ তাঁর সামনে এখন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দুই নেতার রেকর্ড ভাঙার অপেক্ষা। টানা ২৪ বছর ক্রেমলিনে ক্ষমতায় ছিলেন জোসেফ স্তালিন। এবার মস্কোর কুর্সিতে বসতে পারলে নতুন নজির স্থাপন করবেন পুতিন।

ভোটের মধ্যে রাশিয়ায় পুতিনবিরোধী বিক্ষোভের আহ্বান করেছেন বিরোধীরা। নাভালনি সমর্থকেরা ‘নুন এগেইনস্ট পুতিন’ নামে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। তবে রুশ কর্মকর্তারা ভোটের সময় যেকোনো বিক্ষোভের বিরুদ্ধে লোকজনকে সতর্ক করেছেন। ক্রেমলিন বলেছে, এই ভোট প্রমাণ করবে ইউক্রেনে পুতিনের আক্রমণের সিদ্ধান্তের পেছনে পুরো দেশের সমর্থন রয়েছে।

রাশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইউক্রেনে দখল করা অঞ্চলগুলোসহ নিজ দেশের ভোটারদের প্রতি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গত বৃহস্পতিবার ভোটের আগে এক ভিডিও ভাষণে প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, ‘আমাদের ঐক্য, দৃঢ় সংকল্প ও একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার ওপর মনোযোগ দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য আপনাদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি আমি।’

ভোটচিত্র

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, রাশিয়ার মস্কো শহরে গতকাল সকালে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ভোট দিতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিলেন কয়েকজন মানুষ। তাঁদের একজন ৭০ বছর বয়সী লুডমিলা। তিনি বলেন, রাশিয়ার ভবিষ্যতের জন্য ভোট দেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ভ্লাদিমির পুতিনকেই সমর্থন করছেন। তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার জয় চান।

ভোট দিতে এসেছিলেন পুতিনের আরেক সমর্থক ৭২ বছর বয়সী নাথান। তিনি বলেন, সরকারের কাছে তাঁর চাওয়া, যেন কর্মসংস্থান বাড়ানো হয়। এ ছাড়া যুদ্ধ বন্ধের নিশ্চয়তা দিতে কাজ করা ও দেশের স্থিতিশীলতা চান তিনি।

রাশিয়ার নির্বাচন কর্তৃপক্ষ পুতিনের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন, এমন কাউকে নির্বাচন করার সুযোগ দেননি। দেশটির রাষ্ট্রীয় জরিপকারী প্রতিষ্ঠান এ সপ্তাহের শুরুতেই আভাস দিয়েছে, ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পাবেন পুতিন।

নিরঙ্কুশ বিজয়

ইউক্রেনের কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া ও রাশিয়ার ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা কয়েকটি অঞ্চলেও ভোট চলছে। পূর্ব দোনেৎস্ক অঞ্চলে সেনারা যুদ্ধসাজে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে অস্থায়ী ভোটকেন্দ্রে ভোট নিচ্ছেন। কিয়েভের চোখে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল ও ক্রিমিয়ায় এই ভোট কেবল ‘প্রহসন’। গতকাল ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান চার্লস মাইকেল ব্যঙ্গাত্মকভাবে পুতিনকে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ী হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়েছেন।