মোনাকোয় কীভাবে ধনকুবেরকে খুনের চেষ্টায় জড়ালেন এই নারী, পরে ইউক্রেনে পাওয়া গেল তাঁরই মরদেহ

ধনকুবের ভাদিম ইয়ারমোলিয়েভছবি: রয়টার্স

বিকট বিস্ফোরণ। হঠাৎ যেন মাথাটা শূন্য হয়ে যায় ভাদিম ইয়ারমোলিয়েভের। একমুহূর্তের জন্য ভেবেছিলেন, হাতে থাকা ইলেকট্রনিক চাবিটি হয়তো বিস্ফোরিত হয়েছে। পরমুহূর্তে দেখেন, তাঁর সঙ্গী সিঁড়িতে আহত অবস্থায় পড়ে আছেন। ১৩ বছর বয়সের ছেলেও আহত হয়েছে। রক্তাক্ত হাত নাড়ছে। চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

ঘটনাটি ঘটে গত ২৯ জুন, ইউরোপের ধনী দেশ মোনাকোর একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে। ভাদিম ইয়ারমোলিয়েভ যেনতেন কেউ নন, তিনি ইউক্রেনের অন্যতম ধনকুবের। নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দরজার সামনে বোমা বিস্ফোরণে ভাদিম নিজেও গুরুতর আহত হন। ঘটনাটি ধনী এ নগররাষ্ট্রে শোরগোল ফেলে দিয়েছে।

শুরুতে বলা হয়েছিল, বিস্ফোরণের এ ঘটনার সন্দেহভাজন কালো বাকেট হ্যাট পরা একজন পুরুষ। ঘটনার পরপর তিনি পালিয়ে যান। তবে দিন তিনেক পর একাধিক দেশের কর্তৃপক্ষ জানায়, সন্দেহভাজন হামলাকারীর নাম আনাস্তাসিয়া বেরেজোভস্কা। তিনি ইউক্রেনের নারী। বয়স ৩৯ বছর। তাঁর হাতে বড় একটি সাপ আঁকা ট্যাটু ছিল।

আগের কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই আনাস্তাসিয়ার। এমনকি ভাদিমের সঙ্গে তাঁর আগে থেকে জানাশোনাও নেই। তাই, তিনি কেন হঠাৎ এই ধনকুবেরের ওপর হামলা চালালেন, তা স্পষ্ট করে জানা যাচ্ছিল না।

তদন্তকারী ব্যক্তিরা যখন এসব কথা প্রকাশ করেন, তার দিন সাতেকের মধ্যে আনাস্তাসিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের পাশে একটি জঙ্গলে সদ্য খোড়া অগভীর এক কবরে পুঁতে রাখা ছিল এই নারীর মরদেহ।

আনাস্তাসিয়ার শেষ দিনগুলোর গতিবিধি খতিয়ে দেখেছে সিএনএন। সংবাদমাধ্যমটি কথা বলেছে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে। তাঁর হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তির সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে। এমনকি ভাদিম নিজেও হাসপাতাল থেকে ফিরে সিএনএনে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। নানা অজানা বিষয় সামনে এসেছে। তবে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নের উত্তর অজানা, সেটা হলো—কে ভাদিমকে হত্যা করতে চেয়েছিল?

হামলার পর একাধিক অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে ভাদিমকে। কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি নিজেও উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন—হামলার পেছনে আসলে কে ছিল? সিএনএনকে দেওয়া মুখোমুখি সাক্ষাৎকারে ভাদিম বলেন, কাউকে সন্দেহ করার মতো কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি।

ভাদিম আরও বলেন, ‘আমার কখনো কোনো শত্রু ছিল না। আমি ঝগড়াঝাঁটি বা সংঘাতে জড়ানোর মানুষ নই। সব সময় বড় বিরোধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছি। কেন আমাকে টার্গেট করা হলো, সেটা বুঝতে পারছি না।’

ইউক্রেনের পক্ষ থেকে শুরু করা তদন্তের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো সিএনএনকে জানিয়েছে, আনাস্তাসিয়া একজন ‘ভাড়াটে’ হয়ে থাকতে পারেন। অর্থাৎ তিনি শুধু অর্থের বিনিময়ে কাজটি করেছেন। যদিও মূল পরিকল্পনাকারী কে, সেই বিষয়ে তারা কোনো ধারণা দিতে চাননি।

তবে তদন্তে জানা গেছে, আনাস্তাসিয়া খুব সতর্কতার সঙ্গে হামলার পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়েছেন। কর্তৃপক্ষ তাঁকে খুঁজছে, এটা বুঝতে পেরে আনাস্তাসিয়া কয়েকটি দেশের সীমান্ত পেরিয়ে ইউক্রেনে সফলভাবে পালিয়ে আসেন।

মোনাকোয় বিস্ফোরণ ঘটানোর আগে আনাস্তাসিয়া জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের কাছে হফহেইমে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছিলেন। প্রথম স্বামীর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছে। দ্বিতীয় স্বামীর থেকেও আলাদা থাকতেন তিনি। সঙ্গী বলতে ছিল, তাঁর সাত বছর বয়সী একটি ছেলে। ধারণা করা হয়, আনাস্তাসিয়া অর্থকষ্টে ভুগছিলেন।

আদালতের নথিপত্র থেকে জানা যায়, ২০২২ সালে জার্মানিতে পাড়ি জমানোর সময় আনাস্তাসিয়া দ্বিতীয় স্বামীর বিরুদ্ধে ভরণপোষণ না দেওয়ায় মামলা করেছিলেন। ওই ব্যক্তি আনাস্তাসিয়ার চেয়ে ৩০ বছরের বড়। কয়েক বছর আগে ইউক্রেনে মদ্যপ অবস্থায় মারামারিতে জড়িয়েছিলেন আনাস্তাসিয়া। তবে ওই ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। এর বাইরে পুলিশের কাছে তাঁর কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না।

ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিবেদন করেছে, কয়েক সপ্তাহ আগে ছেলেকে ইউক্রেনে পাঠিয়ে দেন আনাস্তাসিয়া। এরপর তিনি জার্মানি থেকে মোনাকোয় চলে যান। সেখানে হামলার সম্ভাব্য জায়গাগুলো ঘুরে দেখেন। ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত ধনকুবের ব্যবসায়ী ভাদিমের ওপর আনাস্তাসিয়া নজর রাখতে শুরু করেন বলে জানিয়েছে মোনাকো কর্তৃপক্ষ।

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কৌঁসুলিরা জানান, গত ২৬ জুন ছিল আনাস্তাসিয়ার ৩৯তম জন্মদিন। ওই দিন থেকে ২৯ জুনের মধ্যে কয়েকবার ভাদিমের বাসার সামনে গিয়েছিলেন এই নারী।

মোনাকোতে বোমা বিস্ফোরণের পর ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত জানালা
ছবি: রয়টার্স

সিসিটিভি ফুটেজে আরও দেখা গেছে, নজরদারির সময় ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন আনাস্তাসিয়া। তিনি কাঁধ পর্যন্ত লম্বা কালো চুল ঢেকে রেখেছিলেন বাকেট হ্যাটে। পরনে ছিল ঢিলেঢালা হুডি ও প্যান্ট। তবে একবারই স্বাভাবিক পোশাকে ছিলেন তিনি। তখন তাঁর মুখ আর হাতে থাকা ট্যাটু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। মোনাকোর তদন্তকারীরা বলছেন, এ ট্যাটু দেখা যাওয়ার কারণে এই নারীকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগেই ২০১৯ সালে ইউক্রেন ছেড়েছিলেন ভাদিম। সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব নেন তিনি। কয়েক বছর ধরে বসবাস করছেন ভূমধ্যসাগরের উপকূলে, ঝলমলে নগররাষ্ট্র মোনাকোয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরের অস্থির সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের দিনিপ্রো শহরে আবাসন ব্যবসা করে বিপুল অর্থের মালিক হন ভাদিম। একসময় ইউক্রেনের অন্যতম ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় তাঁর নাম ছিল।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তখন রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ চরমে। রুশ অধিকৃত ক্রিমিয়ায় ব্যবসা করছিলেন ভাদিম। এ অভিযোগে তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় ইউক্রেন সরকার। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। ভাদিমের বড় ছেলে আর্তুর ইয়ারমোলিয়েভ। ইউক্রেনের অপরাধ জগতে এটা খুবই পরিচিত আর প্রভাবশালী নাম। বড় প্রতারণা চক্রের মূল হোতা হওয়ার অভিযোগে সাইপ্রাসে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ইয়ারমোলিয়েভ। পরে তাঁকে এস্তোনিয়ায় প্রত্যর্পণ করা হয়।

এস্তোনিয়ার আদালতের নথি অনুযায়ী, নিজের গড়ে তোলা একটি ফোন প্রতারণা চক্র পরিচালনা করতেন বলে ইয়ারমোলিয়েভ গত এপ্রিলে স্বীকার করে নেন। এই চক্রের মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছ থেকে প্রায় ১০ কোটি ইউরো বা প্রায় ১১ কোটি ৪০ লাখ ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়।

ঘটনাটি ঘটে গত ২৯ জুন ইউরোপের ধনী দেশ মোনাকোর একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে। ভাদিম ইয়ারমোলিয়েভ যেনতেন কেউ নন, তিনি ইউক্রেনের অন্যতম ধনকুবের। নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দরজার সামনে বোমা বিস্ফোরণে ভাদিম নিজেও গুরুতর আহত হন। ঘটনাটি ধনী এ নগররাষ্ট্রে শোরগোল ফেলে দেয়।

ইয়ারমোলিয়েভকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। পরে একটি সমঝোতা হয়। সমঝোতার আওতায় মাত্র চার মাস কারাভোগ করেন তিনি। এরপর তাঁকে এস্তোনিয়া থেকে বহিষ্কার করা হয়। ইয়ারমোলিয়েভ ৮৫ লাখ ইউরো জরিমানাও দেন।

ছেলের কৃতকর্ম নিয়ে সিএনএনের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন ভাদিম। তিনি বলেন, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে তাঁর ছেলে এই সমঝোতায় রাজি হয়েছিলেন। তিনি এখনো ছেলেকে নির্দোষ বলে মনে করেন।

নিজের সম্পর্কে সিএনএনকে ভাদিম বলেন, ‘ছেলের গড়ে তোলা ওই প্রতারণা চক্রের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। কম্পিউটার কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সেটাও আমি জানি না। শুধু ফোন ব্যবহার করতে পারি।’

নিজের পরিবারের কেউ তার ওপর হামলার নির্দেশ দিয়েছিল—এমন ধারণা নাকচ করে দিয়েছেন ভাদিম। তিনি বলেন, ‘এমনটা হওয়ার কোনো কারণ নেই।’

হামলা ও পালিয়ে যাওয়া

ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সড়কের পাশে লুকিয়ে রাখা একটি ক্যামেরা দিয়ে হামলার দৃশ্য ধারণ করেছিলেন আনাস্তাসিয়া। পরে সেটা তিনি ডিলিট করে দেন। যদিও তদন্তকারীরা সেই ভিডিও উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন।

এ বিষয়ে ইউক্রেনের প্রসিকিউটর জেনারেল বলেন, আদেশ ‘কার্যকর করার প্রমাণ রাখতে’ আনাস্তাসিয়া ভিডিওটি করেছিলেন।

অন্যদিকে মোনাকোর কৌঁসুলিরা জানান, বিস্ফোরণের আগে ভাদিম পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কাছের একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেতে গিয়েছিলেন। ওই সময় একটি বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করেন আনাস্তাসিয়া।

ইউক্রেনের প্রসিকিউটর জেনারেলের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, কালো বাকেট হ্যাট, ঢিলেঢালা গাঢ় রঙের পোশাক ও বড় ব্যাগ নিয়ে একজন রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। এরপর তিনি ভাদিমের বাসার দরজার সামনে ব্যাগ রেখে চলে যান।

কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই ব্যক্তিই আনাস্তাসিয়া। হাঁটতে হাঁটতে তিনি পকেট থেকে নিজের মুঠোফোন বের করেন। ওই সময় ভাদিম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা মাত্র কয়েক গজ পেছনে সড়কের বাঁক ঘুরে ফিরছিলেন।

ব্যাগটি রেখে আসার মাত্র ২০ সেকেন্ড পর সন্দেহভাজন ওই ব্যক্তি পেছনে ফিরে তাকান। এর পরপরই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। তখন সন্দেহভাজন হামলাকারী সড়কের অপর পাশে লুকিয়ে রাখা ক্যামেরাটি তুলে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান।

মোনাকোয় ভাদিমের ওই বাড়ির সামনে পাহারা দিচ্ছে পুলিশ
ছবি: রয়টার্স

মোনাকোর পুলিশ কমিশনার এরিক আরেলা সিএনএনকে বলেন, বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ২৫০ পুলিশ সদস্যকে মোতায়েন করা হয়। একই সময়ে ৭০ জন তদন্তকারী সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে সন্দেহভাজন হামলাকারীকে খুঁজতে শুরু করেন। ততক্ষণে আনাস্তাসিয়া মোনাকো ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।

জানা গেছে, বিস্ফোরণের পর মোনাকো ছেড়ে শুরুতে ফ্রান্সে ঢুকেন আনাস্তাসিয়া। এর পর ভাড়া করা গাড়িতে চেপে ইতালি আর ইউরোপের কয়েকটি দেশ পেরিয়ে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে যান তিনি। সেখানে ওই গাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে জার্মান পুলিশ।

এরপর পোল্যান্ড হয়ে বাসে করে ইউক্রেনে চলে যান আনাস্তাসিয়া। ইউক্রেনের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই আনাস্তাসিয়া ইউক্রেনে ঢোকেন। যদিও তখনো তাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়নি।

এর এক দিন পর মোনাকো কর্তৃপক্ষ আনাস্তাসিয়াকে সন্দেহভাজন হামলাকারী হিসেবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। মোনাকোর প্রধান কৌঁসুলি স্তেফান থিবোর জানান, ওই দিনই আনাস্তাসিয়ার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ইন্টারপোলকেও বিষয়টি জানানো হয়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আনাস্তাসিয়ার নাম ও ছবি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

মা–ছেলের কাছে

ইউক্রেনে প্রবেশের পর আনাস্তাসিয়া সোজা হোরোদিশচে গ্রামে নিজের বাড়িতে যান। ইউক্রেনীয় কৌঁসুলিরা জানান, ১৯৮৭ সালে মধ্য ইউক্রেনের জিতোমির শহরের কাছে এ গ্রামেই তাঁর জন্ম। তাঁর মা এখনো সেখানে থাকেন। মোনাকোয় যাওয়ার আগে ছেলেকে তিনি সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

কাঁচা রাস্তা দিয়ে যেতে হয় গ্রামটিতে। সেখানে সারি সারি কয়েক ডজন বাড়ি। সড়কের পাশে একটি ছোট দোকান। স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে বসে তাস খেলেন। গ্রামের এক প্রান্তে বিস্তীর্ণ মাঠের পাশে আনাস্তাসিয়ার বাড়ি।

সম্প্রতি এক শনিবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে ধোয়া কাপড় শুকাচ্ছে। বাগানে দোলনার পাশে পড়ে আছে বাচ্চাদের একটা সাইকেল। আনাস্তাসিয়ার মা ও ছেলে এখনো সেখানে আছেন। ডাকাডাকির পরও কেউ দরজা খোলেননি। প্রতিবেশীরা সিএনএনকে বলেন, হামলা আর তাতে আনাস্তাসিয়ার জড়িত থাকার খবর শুনে তাঁরা হতবাক হয়ে গেছেন।

আনাস্তাসিয়ার চেয়ে মাত্র তিন বছরের বড় ভিতালি। একই গ্রামে বড় হয়েছেন দুজন। একই স্কুলে পড়েছেন। নিজের পদবি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, আনাস্তাসিয়ার সম্পর্কে খারাপ কিছু বলার নেই তাঁর। বলেন, ‘মানুষ তাঁর সম্পর্কে ভালো কথাই বলত। মোনাকোয় কী ঘটেছে, তা শুধু তিনি আর ঈশ্বর জানেন। আমি জানি না, কী বলব। আমার মনে হয়, তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে।’

বিস্ফোরণস্থলের আশপাশে পুলিশি পাহারা জোরদার করা হয়
ছবি: রয়টার্স

সাত হাজার ইউরো

আনাস্তাসিয়া ৩ জুলাই পর্যন্ত নিজের গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, ওই দিন সকালে আনাস্তাসিয়া তাঁর মাকে গ্রামের কাছের একটি গ্যাসস্টেশনে তাঁকে নিয়ে যেতে বলেন। সেখানকার কর্মীদের একটি ট্যাক্সি ডেকে দিতে বলেন। এরপর ট্যাক্সির চালককে কিয়েভের দিকে মহাসড়কের একটি জিপিএস অবস্থান দেখান। কৌঁসুলিদের দাবি, এই অবস্থান তাঁকে তাঁর সহযোগীরা দিয়েছিলেন।

ওই ট্যাক্সিচালক তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, আধঘণ্টার যাত্রায় আনাস্তাসিয়া কোনো কথা বলেননি। গন্তব্যে পৌঁছে ৪৫ ডলার ভাড়া দিয়ে তিনি ট্যাক্সি থেকে নেমে যান।

কৌঁসুলিদের ভাষ্য, এরপর একটি কালো বিএমডব্লিউ গাড়ি আনাস্তিসিয়াকে তুলে নেয়। গাড়িতে ছিলেন তাঁর দুজন ‘কথিত’ সহযোগী ভ্লাদিস্লাভ রেউত ও ভিতালি ঝিকোভিচ।

ইউক্রেনীয় কৌঁসুলিরা বলেন, হামলার কয়েক মাস আগে থেকে রেউত ও ঝিকোভিচের সঙ্গে আনাস্তাসিয়ার যোগাযোগ ছিল। তাঁরা তাঁকে কয়েক দফায় ক্রিপ্টোকারেন্সি আর ব্যাংক স্থানান্তরের মাধ্যমে অর্থ দেন।

ঝিকোভিচের আইনজীবীর দাবি, সব মিলিয়ে এ অর্থের পরিমাণ ছিল ছয় থেকে সাত হাজার ইউরো। আইনজীবী আনাতোলি ইভানোভ সিএনএনকে বলেন, তাঁর মক্কেল ভেবেছিলেন, তিনি ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থার গোপন মিশনে কাজ করছেন। তবে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা এই দাবি অস্বীকার করেছেন।

মোনাকোয় বিস্ফোরণ ঘটানোর আগে আনাস্তাসিয়া জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের কাছে হফহেইমে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছিলেন। প্রথম স্বামীর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছে। দ্বিতীয় স্বামীর থেকেও আলাদা থাকতেন তিনি। সঙ্গী বলতে ছিল, তাঁর সাত বছর বয়সী একটি ছেলে। ধারণা করা হয়, আনাস্তাসিয়া অর্থকষ্টে ভুগছিলেন।

এ ঘটনায় নতুন মোড় এনে দেয় রেউতের পরিচয়। মোনাকোয় যখন বোমা হামলা চালানো হয়, তখন রেউত ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিইউআরে কর্মরত ছিলেন। আনাস্তাসিয়াকে খুনের কথাও তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে আদালতে বলেছেন, গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অজান্তে তিনি এতে জড়িয়েছিলেন। জিইউআর কোনো সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে।

অন্যদিকে ঝিকোভিচ আগে ইউক্রেনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে কাজ করেছেন। ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থার স্বেচ্ছাসেবী কর্মকর্তা হিসেবেও তাঁর কাজ করার কথা জানা গেছে। তদন্তকারীরা তাঁর বাড়ির বেজমেন্টে একটি কক্ষের সন্ধান পেয়েছেন। তাঁদের দাবি, এটি ‘নির্যাতন কক্ষের’ মতো। কৌঁসুলিদের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, সেখানে মেঝেতে বড় একটি প্লাস্টিকের চাদর, কয়েকটি কুঠার দেখা গেছে।

ঝিকোভিচের আইনজীবী বলেন, এটি নির্যাতনকক্ষ ছিল—এমন ধারণা ‘সম্পূর্ণ অর্থহীন’। তাঁর দাবি, হামলার সময় আশ্রয় নেওয়ার জন্য বেজমেন্টটি ব্যবহার করা হতো।

হামলার ভুক্তভোগী ভাদিম সিএনএনকে বলেন, ইউক্রেন রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল, এমনটা তিনি বিশ্বাস করেন না। তাঁর ধারণা, রেউত অর্থের জন্য নিজের মতো করে কাজ করেছেন। গোপন অভিযান ও হামলার দক্ষতার কারণে কেউ ব্যক্তিগতভাবে রেউত ও ঝিকোভিচকে নিয়োগ করেছিল।

ভাদিম বলেন, ‘কে এই হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।’

স্বীকারোক্তি, তবে উত্তর মেলেনি

কিয়েভ অভিমুখী মহাসড়কের পাশে আনাস্তাসিয়া, রেউত ও ঝিকোভিচের দেখা হওয়ার পর ঠিক কী ঘটেছিল—তা এখনো স্পষ্ট নয়। দুই অভিযুক্ত ব্যক্তি ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা দিয়েছেন। তবে সেদিন যে সেখানে আনাস্তাসিয়া নিহত হয়েছেন, সেটা নিশ্চিত।

কিয়েভে আদালতের প্রাক্-বিচার শুনানিতে রেউত বলেন, সেদিন সকালে ঝিকোভিচ তাঁকে ফোন করেছিলেন। কিয়েভের কাছে থেকে তাঁকে তুলে নিতে বলেছিলেন। রেউতের ভাষ্য, ঝিকোভিচ প্রথমে তাঁকে বলেছিলেন, ‘আনাস্তাসিয়া তৃতীয় পক্ষের শারীরিক হামলার ঝুঁকিতে আছেন। তাই, তাঁকে লুকিয়ে রাখা দরকার।

তবে গাড়িতে ওঠার পর ঝিকোভিচ ব্যাগ থেকে একটি বন্দুক বের করেন বলে আদালতকে জানান রেউত। তিনি বলেন, ঝিকোভিচ তাঁকে বলেছিলেন, আনাস্তাসিয়া ‘আতঙ্কিত হয়ে পড়লে’ বা তাঁকে ‘সামলানো না গেলে’, তবেই বন্দুকটি ব্যবহার করা হবে।

রেউত আদালতকে আরও বলেন, গাড়িতে ওঠার সময় আনাস্তাসিয়া খুবই ভীত ছিলেন। তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত দেখাচ্ছিল। তাঁর ভাষ্য, ঝিকোভিচ তাঁকে ইউরিভ গ্রামের কাছে একটি জঙ্গলের দিকে গাড়ি চালাতে বলেন। সেখানে গাড়ি থেকে নেমে আনাস্তাসিয়ার মাথায় একাধিক গুলি করা হয়।

ইউক্রেনের কৌঁসুলিরা জানান, গ্রেপ্তারের পর রেউত প্রথমে স্বীকার করে নেন, ঝিকোভিচের নির্দেশেই তিনি আনাস্তাসিয়াকে গুলি করেছিলেন। তবে পরে আদালতে রেউত বলেন, গুলি করেছিলেন ঝিকোভিচ নিজেই।

সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েন ছদ্মবেশি আনাস্তাসিয়া। ডান দিকের ছবিতে তিনি তাঁর স্বাভাবিক পোশাকে
ছবি: ইন্টারপোলের সৌজন্যে

ঝিকোভিচের আইনজীবী আনাতোলি ইভানোভ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি সিএনএনকে সরাসরি বলেন, রেউত ছিলেন মূল পরিকল্পনাকারী ও হত্যাকারী। নিজের দায় এড়াতে তিনি ঝিকোভিচের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন।

আনাতোলি ইভানোভ বলেন, তাঁর মক্কেল মনে করেছিলেন, তিনি রেউতকে ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থার একটি গোপন মিশনে সহায়তা করছেন। তবে ইউক্রেনের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এমন কোনো মিশনের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন।

ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিইউআর এক বিবৃতিতে বলেছে, সন্দেহভাজন দুজনকে আটক করতে তারা দেশটির অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে সহায়তা করেছে। তদন্তে সহযোগিতা করছে।

রেউত আদালতকে জানিয়েছেন, তিনি আর ঝিকোভিচ তাঁর গাড়িতে থাকা কোদাল দিয়ে গর্ত খুঁড়েছিলেন। এর পর সেখানে আনাস্তাসিয়ার মরদেহ পুঁতে ফেলেন তাঁরা। পরে বন্দুক ও আনাস্তাসিয়ার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কাছের একটি হ্রদে ফেলে দেওয়া হয়। সেসবের মধ্যে ছিল দুটি মুঠোফোন, একটি লাইটার ও একটি ঘড়ি। সঙ্গে থাকা অর্থ ও নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলা হয়।

তিন দিন পর আনাস্তাসিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে ইউক্রেনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্তকারীরা রেউতকে শনাক্ত করার পর তাঁর কাছ থেকেই আনাস্তাসিয়ার মরদেহের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারেন।

নতুন একটি কবর

হোরোদিশচে গ্রামের সমাধিক্ষেত্রে নতুন একটি সমাধি। ওপরে রাখা ফুলের বড় একটি তোড়া। ক্রুশের সঙ্গে ঝুলছে ইউক্রেনের ঐতিহ্যবাহী নকশার কাপড়। তার ঠিক নিচে ওই কবরের বাসিন্দার একটি ছবি। তাতে লেখা—আনাস্তাসিয়া বেরেজোভস্কা।

ছবিতে দেখা যায়, আনাস্তাসিয়া হাসছেন। তাঁর নীল চোখ সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকানো। কালো চুলে ঘেরা মুখ। ইন্টারপোলের গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় থাকা ছবির সঙ্গে এ ছবিটির মিল নেই বললেই চলে।

হামলার ভুক্তভোগী ধনকুবের ভাদিম সিএনএনকে বলেন, ‘এই নারীর (আনাস্তাসিয়া) কথা ভাবলে, মনের মধ্যে শূন্যতা তৈরি হয়। তিনি আমাকে প্রায় খুন করে ফেলেছিলেন। আমার সঙ্গীকে গুরুতর আহত করেছেন। তবে এই গল্পের মূল খেলোয়াড় ওই নারী নন। আমার মনে হয়, তিনি একজন বোকাসোকা মানুষ ছিলেন। কোনোভাবে তাঁকে বোঝানো হয়েছিল, তিনি গুরুত্বপূর্ণ আর বড় কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।’

ভাদিম আরও বলেন, তাঁর ধারণা, অন্যদের বিরুদ্ধে যাতে সাক্ষ্য দিতে না পারেন—সে জন্য আনাস্তাসিয়াকে খুন করা হয়েছে।

‘আনাস্তাসিয়া দীর্ঘদিন একা আমার ওপর নজর রেখেছেন এবং পুরো ঘটনাটি একাই পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করেছেন, তা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়’, বলেন ধনকুবের ভাদিম।