ফ্রান্সে লাখো মানুষের বিক্ষোভ, শহরে শহরে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ, গ্রেপ্তার ১৩৫
ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে নিষেধাজ্ঞা সত্বেও পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী শনিবার বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থী, তরুণসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। লিঁও, নিস ও তুলুজসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে পুলিশ। বিক্ষোভ ঘিরে গতকাল স্থানীয় সময় দুপুর পর্যন্ত অন্তত ১৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে রাজধানী প্যারিসে দুপুর পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত ছিল।
শিক্ষকসংকট ও স্কুলের জরাজীর্ণ অবকাঠামো নিয়ে গত মাসে বিক্ষোভ শুরু করে শিক্ষার্থীরা। ধীরে ধীরে শ্রমিকসংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি নানা পরিষেবার সংকটের অসন্তোষ থেকে আন্দোলনে যুক্ত হয়। ১৭ অক্টোবর তাদের বিক্ষোভ ব্যাপক সহিংতায় রূপ নেয়। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ভাঙচুর আগুন ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কারফিউ জারি করে কর্তৃপক্ষ।
এরপর পরিস্থিতি শান্ত হলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় ছাত্র সংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো। গত কয়েকদিনে ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সরকার বৈঠক করলেও সমাধান আসেনি। এরপর শনিবার আবার বিক্ষোভে নামে আন্দোলনকারীরা।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্নীতির প্রতিবাদসহ নানা দাবিতে ফ্রান্স ছাড়াও গত প্রায় এক সপ্তাহের ইউরোপের অন্তত ১০টি দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। গতকাল স্পেন ও আলবেনিয়াতেও বিক্ষোভ হয়েছে। ইতালিতে নতুন কর্মসূচি ঘিরে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। তুরস্কে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও সংবাদমাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন।
লিঁওসহ কয়েক শহরে কাঁদানে গ্যাস
ফ্রান্সে পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে গতকাল বিভিন্ন শহরে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। স্থানীয় সময় দুপুরে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ প্রাথমিক হিসাব দিয়ে জানান, গতকাল ১৩৬টি বিক্ষোভ কর্মসূচিতে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ যোগ দেয়। দুপুর পর্যন্ত ১৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তখন পর্যন্ত বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানান তিনি।
তবে আল–জাজিরা ও এএফপি জানায়, প্যারিস, লিঁও, তুলুজ ও নিসসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করেছে পুলিশ।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, অনেক স্কুলের ভবন জরাজীর্ণ, শিক্ষকেরা কম বেতনে অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, শ্রেণিকক্ষে ধারণা ক্ষমতার চেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। তাঁরা এসব সমস্যার সমাধান চান। পাশাপাশি স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনলাইন ব্যবস্থা ‘পারকুরসুপ’ বাতিলেরও দাবি জানাচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের সমর্থনে গতকাল প্যারিসের সিজিটি, সিএফডিটিসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন বিক্ষোভ ডাকে। এতে শিক্ষার্থী ও তরুণদের পাশাপাশি চাকরিজীবী, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেকে যোগ দেন।
শ্রমিক সংগঠন সলিদেয়ারের প্রতিনিধি মুরিয়েল গিলবার্ট বলেন, ‘এই দেশে মানুষের মধ্যে বিপুল ক্ষোভ রয়েছে। মজুরি যে পর্যায়ে বাড়ানো উচিত ছিল, এখনো তা বাড়ানো হয়নি।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে স্থানীয় সময় গত শুক্রবার সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীদের ২০ জন প্রতিনিধির সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর ভাষ্য, প্রেসিডেন্ট ভর্তিব্যবস্থা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে তাতে তাঁরা সন্তুষ্ট নন। তাই তাঁরা শনিবার বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
কড়া নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিরোধ
ফ্রান্সে ১৭ অক্টোবর বিক্ষোভে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি ঠেকাতে এবার আগের চেয়ে ১০ হাজার বেশি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। প্রস্তুত রাখা হয় সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার ও জলকামান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ বলেছেন, বিক্ষোভ শুরুর আগে তল্লাশি চালানো হয়। এতে আতশবাজি, ধাতব বল, গুলতিসহ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন জিনিস পাওয়া গেছে। কিছু অতি–বামপন্থী গোষ্ঠী বিক্ষোভকে সহিংস করতে চাইছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। মাখোঁও আগের সপ্তাহের সহিংসতার জন্য অতি–বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছেন।
প্যারিসের মিছিলের পথ নিয়েও বিরোধ হয়। শেষ মুহূর্তে পুলিশ কেন্দ্রের বাস্তিল এলাকা থেকে সরিয়ে দক্ষিণ–পূর্ব প্রান্তের পোর্ত দিতালিতে মিছিল শুরুর নির্দেশ দেয়। পুলিশের যুক্তি, আগের পথে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হামলার শিকার হতে পারে।
শ্রমিক সংগঠনগুলো অনিচ্ছা সত্ত্বেও নতুন পথ মেনে নেয়। গতকাল শ্রমিক সংগঠনগুলো ছাড়া অন্য কোনো সংগঠন বা প্ল্যাটফর্মকে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। এটাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন শ্রমিক সংগঠন সলিদেয়ারের প্রতিনিধি গিলবার্ট। বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ, এতে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার খর্ব হচ্ছে।
প্যারিসে মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানিয়েছে, মার্সেইয়ের প্রধান সড়কে মিছিলের জন্য হাজারো মানুষ সকাল থেকে জড়ো হন। লিওঁতে পুলিশের সারির পাশ দিয়ে স্লোগান ও গান গেয়ে এগোন বিক্ষোভকারীরা।
লিওঁর নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এলাকায় সড়ক অবরোধের চেষ্টাকারী প্রায় ১৫০ জনকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। বোর্দোয়ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মানুষ জড়ো হন। সেখানকার শ্রমিক ইউনিয়ননেত্রী ব্রিজিত কুদের্ক বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তাঁরা শিক্ষার্থীদের পাশে থাকবেন।’ নিসে শহরে কয়েক শ মানুষকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।
ভাঙচুরের আশঙ্কায় বিভিন্ন শহরে বহু দোকানের জানালা কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। বন্ধ রাখা হয় ল্যুভর, অরসে ও পিকাসো জাদুঘরসহ বড় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। গতকাল প্যারিসের ২০টির বেশি মেট্রো স্টেশনও বন্ধ ছিল।
ভয় নিয়েও মিছিল, নতুন কর্মসূচি
সাম্প্রতিক সংঘর্ষে কিশোর–কিশোরীদের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তুলুজের ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী এলা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘এখন বিক্ষোভে গেলে আমার কী হতে পারে, তা নিয়ে ভয় হয়। কিন্তু আমরা হাল ছাড়তে পারি না।’
প্যারিসে বিক্ষোভে আসা ২৬ বছর বয়সী নার্স ক্লেয়ার বলেন, ‘সবাই ভাঙচুর করতে আসেনি। আমরা কেউ কেউ শুধু বলতে এসেছি, আমরা আরও ভালো ভবিষ্যৎ চাই।’
ব্যবসায়ী ও কর্মীদের উদ্বেগও রয়েছে। গাড়িভাড়া প্রতিষ্ঠানের কর্মী দমিনিক বলেন, তাঁর অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে, যাঁরা ভাঙচুর ও চুরি করতে আসেন। এটা উদ্বেগজনক।
অরলিয়ঁ শহরে গতকাল বিরোধী দলীয় নেত্রী মারি লো পেনের কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালির সম্মেলন বিরোধী মিছিল হয়েছে। ছয় মাস পরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে সম্মেলনটি হয়েছে। পুলিশের হিসাবে, সেখানে বিক্ষোভে প্রায় ১১ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে আয়োজকদের দাবি অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ২৬ হাজার। বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট মাখোঁর পদত্যাগের দাবি জানান।
ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলনকারীরা আগামী শনিবার পার্লামেন্ট ও নগরভবনগুলোর সামনে সমাবেশ ও অবস্থানের ডাক দিয়েছে।
প্যারিসের বিক্ষোভে যোগ দিয়ে বামপন্থী নেতা জ্যঁ–লুক মেলঁশোঁ বলেছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহেই বিক্ষোভ চলবে।
ইতালিতে নিরাপত্তা ও সহায়তা
ইতালিতে শনিবার শিক্ষায় বরাদ্দ কমানো, বাসাভাড়া ও জ্বালানির খরচ নিয়ে শিক্ষার্থী, ট্রাকচালক ও কৃষকেরা আন্দোলন করছেন। গত সপ্তাহের সহিংসতার পর মিলানে ৫০০ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গতকালও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ভাঙচুরের ভয়ে কিছু দোকান বন্ধ রাখা হয়।
এএফপি জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সরকার অপ্রাপ্তবয়স্কদের আটকের নিয়ম সহজ করা এবং তাঁদের ভাঙচুরের জন্য অভিভাবকদের জরিমানার বিধান অনুমোদন করেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সামলাতে ট্রাকচালক ও জেলেদের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে ট্রাকচালকেরা অবরোধ করছিলেন। এতে জ্বালানি ও খাবারের সংকট তৈরি হয়েছিল, তা গতকাল তুলে নেওয়া হয়েছে।
স্পেনে পেনশন–আবাসন নিয়ে ক্ষোভ
স্পেনের মাদ্রিদেও গতকাল সরকারি অবসরভাতা বা পেনশন সুরক্ষার দাবিতে হাজারো মানুষ মিছিল করেছেন। বাড়িভাড়া ও আবাসনের খরচ নিয়েও আন্দোলন চলছে। মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সোল চত্বরে প্রায় এক মাস ধরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন কিছু আন্দোলনকারী।
আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় দুর্নীতি ও নিম্নমানের জীবনযাত্রার প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে গতকালও বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে কয়েক দিনের সংঘর্ষে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। আটক হয়েছেন কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী। সরকারি ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্দোলনকর্মী সিদোরেলা ভাতনিকাই এএফপিকে বলেন, এটি মানুষের অধিকার ও আইনের শাসনেরও প্রশ্ন।
তুরস্কে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার দাবি
ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারায় শনিবার হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন। এতে সাংবাদিকদের সঙ্গে মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিরাও অংশ নেনে। পুলিশের হিসাবে, তুর্কি সাংবাদিক ইউনিয়নের হিসাবে, দুই মাসে ১১ সাংবাদিককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
চলতি মাসে হাল্ক টিভিতে অভিযান চালিয়ে সম্প্রচার বন্ধ ও সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। বন্ধ করা হয়েছে টিটোয়েন্টিফোরের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টও। সাংবাদিক জাফের আরাপকিরলি বলেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষের খবর পাওয়ার অধিকার রক্ষারও প্রতিবাদও চলবে।