বিবিসির তথ্যচিত্র: নির্দেশ না মানলে নিজেদের সেনাদেরই গুলি করে হত্যা করছেন রুশ কমান্ডাররা

মারিউপোলে সংঘর্ষে নিহত সেনার পাশে প্রো-রুশ সদস্য, ৩১ মার্চ ২০২২ছবি: রয়টার্স

ইউক্রেন যুদ্ধে সম্মুখসারিতে থাকা রুশ বাহিনীর ভয়াবহতা ও নৃশংসতার বর্ণনা দিয়েছেন চার রুশ সেনাসদস্য। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁদের মধ্যে দুজন বলেছেন, নির্দেশ মানতে অস্বীকার করায় তাঁদের চোখের সামনেই সেনাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপর তথ্যচিত্র নির্মাণকারী দলকে এক রুশ সেনা বলেন, তিনি কমান্ডারের নির্দেশে এক সেনাকে গুলি করে মারার দৃশ্য দেখেছেন। সেই কমান্ডার ২০২৪ সালে রাশিয়ার সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘হিরো অব রাশিয়া’ উপাধি পেয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ওই সেনা বলেন, ‘আমি মাত্র দু-তিন মিটার দূর থেকে এটা দেখেছি...ক্লিক, ক্ল্যাক, ব্যাং (গুলির শব্দ)।’

আরেকটি ইউনিটের এক সেনাসদস্য বলেন, তিনি তাঁর কমান্ডারকে নিজ হাতে চারজনকে গুলি করতে দেখেছেন। নিহত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি তাঁদের চিনতাম। একজনের চিৎকার এখনো আমার কানে বাজে। তিনি বলছিলেন, “গুলি কোরো না, আমি সব করব!”’

ওই রুশ সেনাদের একজন আরও জানান, তিনি একটি গর্তের ভেতরে সহযোদ্ধাদের ২০টি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন। তাঁদের নিজেদের সহকর্মীরাই ‘জিরো’ করেছে। রুশ সামরিক পরিভাষায় নিজের দলের লোককে হত্যা বা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে ‘জিরো’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

‘দ্য জিরো লাইন: রাশিয়া যুদ্ধের অন্দরমহলে’ শীর্ষক তথ্যচিত্রে এসব সেনাসদস্য তাঁদের ওপর চালানো নির্যাতনের অভিজ্ঞতা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁরা জানান, ‘আত্মঘাতী’ ধাঁচের বিভিন্ন মিশনে অংশ নিতে রাজি না হওয়ায় তাঁদের এই পরিণতি ভোগ করতে হয়।

রুশ সেনারা এসব আক্রমণকে ‘মিট স্টর্ম’ (মাংসের ঝড়) বলে ডাকেন। ইউক্রেনীয় বাহিনীকে কাবু করতে একের পর এক রুশ সেনাকে যেভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, তা বোঝাতেই এই শব্দ ব্যবহার করেন তাঁরা।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে সামনের সারিতে থাকা রুশ সেনারা এই প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের কমান্ডারদের নির্দেশে নিজ দলের সদস্যদের হত্যার নির্দেশ দিতে দেখেছেন বলে দাবি করেছেন।

নিহত সেনাদের শনাক্ত ও গণনার দায়িত্বে থাকা এক রুশ সেনাসদস্য বিবিসিকে একটি তালিকা দিয়েছেন। সেখানে দেখা যায়, তাঁর সঙ্গে আসা ৭৯ সেনার মধ্যে তিনিই একমাত্র জীবিত আছেন।

ওই সেনা আরও জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে রাজি না হওয়ায় তাঁর ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং গায়ে প্রস্রাব করা হয়েছে। তাঁর ইউনিটের অন্য যাঁরা যুদ্ধে যেতে রাজি হননি, তাঁদের ওপর বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছে এবং না খাইয়ে রাখা হয়েছে। পরে অস্ত্র ছাড়াই তাঁদের ‘মিট স্টর্ম’-এ নামিয়ে দেওয়া হয়।

এই চার সেনা বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তারা রাশিয়ার বাইরের একটি গোপন স্থানে বসে বিবিসিকে এসব ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান।

রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এই অভিযানের বিরুদ্ধে জনসমক্ষে সব ধরনের বিরোধিতা প্রায় দমন করা হয়েছে। মস্কো আনুষ্ঠানিকভাবে হতাহতের কোনো সংখ্যা প্রকাশ করে না।

তবে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর এ পর্যন্ত ১২ লাখের বেশি রুশ সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন।

অবশ্য রুশ সরকারের দাবি, তাদের সশস্ত্র বাহিনী ‘তীব্র সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও যতটা সম্ভব সর্বোচ্চ সংযমের সঙ্গে কাজ করছে এবং নিজেদের সেনাদের সর্বোচ্চ যত্ন নিচ্ছে।’

রুশ সরকারের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘যেকোনো ধরনের অভিযোগ বা অপরাধের ঘটনা যথাযথভাবে তদন্ত করা হয়।’

বিবিসির দেওয়া তথ্যের বিষয়ে মস্কো বলেছে, ‘আপনারা যেসব তথ্য দিয়েছেন, সেগুলোর সত্যতা বা নির্ভুলতা আমাদের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়।’

প্রত্যক্ষদর্শী এই চার সেনার দেওয়া বিস্তারিত বর্ণনা যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজক চিত্রই ফুটিয়ে তুলছে।