শিক্ষার্থী বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, ২০০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ

বিক্ষোভ করছেন ফ্রান্সের উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ৬ অক্টোবর ২০২৬, নঁত, ফ্রান্সছবি: রয়টার্স

ফ্রান্সে আজ দিনভর উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে অবরোধ ও বিক্ষোভ চলছে। শিক্ষার্থী ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো অর্থসংকটে থাকা সরকারের কাছে বিদ্যালয়ের সমস্যা সমাধানের দাবি জানাচ্ছেন। এসব বিদ্যালয়ে কর্মীর ঘাটতি আছে, অবকাঠামোও জরাজীর্ণ।

আজ মঙ্গলবারের দেশব্যাপী এ বিক্ষোভের আগে দুই সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ চলেছে। প্যারিসের সুবিধাবঞ্চিত শহরতলিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কখনো কখনো বিক্ষোভ সহিংস হয়ে উঠেছে।

বিবিসির খবরে বলা হয়, আজ প্যারিসসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকালে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়েছে। শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, প্রায় ৯০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্লাস স্থগিত করেছে। তবে ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন দাবি করেছে, দেশজুড়ে প্রায় দুই হাজার মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।

সরকার বিক্ষোভ মোকাবিলায় দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করছে। এতে ব্যাপক ধরপাকড় হয়েছে। সংঘর্ষে বিক্ষোভকারী, পুলিশ সদস্য ও বিদ্যালয়ের কর্মীরা আহত হয়েছেন।

ফ্রান্সের বিভিন্ন জায়গায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বিক্ষোভ হলেও লিয়োঁসহ কোনো কোনো জায়গায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। পুলিশের ব্যারিকেডে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আজ মঙ্গলবার ফ্রান্সজুড়ে ৮৬ হাজার প্রতিবাদকারী রাস্তায় নেমেছে। তবে এর মধ্যে প্যারিসের বিক্ষোভকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। প্যারিসের বিক্ষোভে ২০ থেকে ৪০ হাজার বিক্ষোভকারী অংশ নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্যারিসে বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা। ৬ অক্টোবর ২০২৬, প্যারিস, ফ্রান্স
ছবি: রয়টার্স

বিক্ষোভ ঘিরে এ অস্থিরতা সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। সরকার এখন ক্রমবর্ধমান বাজেটঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছে। ছয় মাস পরই প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর উত্তরসূরি বেছে নিতে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। গত কয়েক দিনে ফ্রান্সের ঋণের খরচ হু হু করে বেড়েছে। এটি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা চলতি শতকের শুরুর দিকের পর আর দেখা যায়নি।

ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মেরিন লঁ পেন সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। এর মধ্য দিয়ে আর্থিক বিষয়ে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন তিনি।

শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দো জেফ্রে উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের একটি অনলাইন মতামত গ্রহণ কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সেখানে তাদের অভাব-অভিযোগ ও দাবি জানাতে বলেছেন তিনি। এই কার্যক্রম ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।

পুলিশ সদস্যদের সামনে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভকারীরা। ৬ অক্টোবর ২০২৬, নঁত, ফ্রান্স
ছবি: রয়টার্স

এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেফ্রে লেখেন, ‘উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা, এবার তোমাদের বলার পালা। তোমাদের প্রতিটি বিদ্যালয়ের সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা আমাদের জানাও।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘তোমাদের মতামত দিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি হবে। এতে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য আর বাস্তবায়নের বিস্তারিত সময়সূচি থাকবে; আর আমরা তোমাদের কাছে জবাবদিহি করব।’

বাড়তি অর্থ বরাদ্দের দাবিতে ফ্রান্সে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের এত বড় পরিসরের সর্বশেষ দেশব্যাপী আন্দোলন হয়েছিল ১৯৯০-এর দশকে। পল ভালেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লেমেন্স কার্দোঁ-কাঁ শিক্ষা খাতের অর্থায়ন নিয়ে গবেষণা করেন।

কাদোঁ বলেন, তখন সরকার ব্যাকালরিয়া পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছিল; কিন্তু বিদ্যালয়গুলোকে যথেষ্ট বাড়তি সম্পদ দেয়নি। এর পরই ওই আন্দোলন শুরু হয়। ব্যাকালরিয়া হলো বিদ্যালয়জীবন শেষের পরীক্ষা। সাধারণত এ পরীক্ষার মাধ্যমেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পথ খোলে। ওই আন্দোলনের ফলে বরাদ্দ বেড়েছিল; কিন্তু বিদ্যালয়ের ওপর চাহিদা বাড়তে থাকলেও পরে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় আর বাড়েনি।

সাঁ-দেনিতে আগুনে ময়লার ঝুড়ি ছুড়ে ফেলছেন মুখোশ পরা এক বিক্ষোভকারী। প্যারিস, ফ্রান্স। ১ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতলে লঁ পেনের রাজস্ব কৌশল কেমন হবে, সে বিষয়ে কয়েকটি কথা বলেছেন তিনি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজেট আলোচনায় ফ্রান্সের নিট চাঁদা কমানোর দাবি তুলবেন। তিনি চান, এ চাঁদা ৫০০ কোটি ইউরোতে (৫৬১ কোটি মার্কিন ডলার) নামুক। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ফ্রান্সে যে অনুপাতে বিক্রি করে, সেই ভিত্তিতে তাদের ওপর কর বসাবেন তিনি। করপোরেট কর এড়ানোর কৌশল ঠেকাতেই এ পদক্ষেপ।

লঁ পেন মনে করেন, ফ্রান্স ক্রমেই ফুলেফেঁপে ওঠা এক ঋণসংকটের দ্বারপ্রান্তে। তিনি বলেন, ২০২৭ সালের নির্বাচনে ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ নিলে দেশটি ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তিনি চান, প্রতিবছরের বাজেট ধাপে ধাপে ঋণ কমাক। এভাবে একসময় ঋণ জিডিপির ৬০ শতাংশে নামবে। সরকারে গেলে তাঁর লক্ষ্য হবে, আর্থিক বাজারকে বোঝানো যে ফ্রান্স আবার ‘আস্থাভাজন’ হয়ে উঠেছে।

সড়কে বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুন পানি দিয়ে নেভাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। ৬ অক্টোবর ২০২৬, লিওঁ, ফ্রান্স
ছবি: রয়টার্স

২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি ঘাটতি ৩ শতাংশে নামিয়ে আনতে চান লঁ পেন। প্রেসিডেন্টের পাঁচ বছরের মেয়াদে বাজেটে মোট ১৪ হাজার কোটি ইউরো সাশ্রয় করতে চান তিনি। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রাষ্ট্রীয় পেনশনব্যবস্থা নিয়ে প্রস্তাব দেবেন তিনি।

দেশজুড়ে চলা এ বিক্ষোভ ও অবরোধ এখন রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সরকারের জন্য সময়টা বেশ স্পর্শকাতর। গত সপ্তাহে সরকার ২০২৭ সালের বাজেটে ব্যয় কমানোর একগুচ্ছ পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। এসব পদক্ষেপ জনগণের কাছে চরম অজনপ্রিয়।

জ্বলতে থাকা আগুনের পাশ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন এক ব্যক্তি। ৬ অক্টোবর ২০২৬, লিওঁ, ফ্রান্স
ছবি: রয়টার্স

শিক্ষা খাতে বাজেট ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ৫৫৩ কোটি ইউরো হতে যাচ্ছে। তবে এ বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। এ হিসাবে শিক্ষকদের পেনশন ধরা হয়নি।

শিক্ষা খাতে ব্যয়ের দিক থেকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সদস্যদেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের অবস্থান মাঝামাঝি। তবে গত এক দশকে দেশটিতে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীপ্রতি গড় ব্যয় খুব একটা বদলায়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে এ ব্যয় ছিল ১১ হাজার ৯১০ ইউরো। ২০২৪ সালে তা দাঁড়ায় ১১ হাজার ৬৬০ ইউরোতে।