জার্মানির দুই রাজ্য এখন কট্টর ডানপন্থী এএফডির দখলে, তবে বার্লিনের নেতৃত্বে অভিবাসী–কন্যা

কট্টর ডানপন্থী এএফডিকে হারিয়ে বার্লিনে ঐতিহাসিক জয়ের পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন ডি লিঙ্কের প্রার্থী এলিফ এরাল্পছবি: রয়টার্স

জার্মানির রাজ্য নির্বাচন ঘিরে দেশজুড়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তীব্র উদ্বেগ বিরাজ করছিল। এই উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে অভিবাসনবিরোধী ও কট্টর ডানপন্থী দল ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’র (এএফডি) অব্যাহত উত্থান। সর্বশেষ রোববার অনুষ্ঠিত মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্ন রাজ্যের নির্বাচনেও দলটির এই অগ্রযাত্রা থামানো যায়নি।

তবে কট্টর ডানপন্থীদের এই উত্থানের বিপরীত চিত্র দেখা গেছে রাজধানী বার্লিনে। সেখানে প্রথমবারের মতো অভিবাসী পটভূমির একজন নারী গভর্নিং মেয়র হওয়ার পথে রয়েছেন। রাজ্য নির্বাচনে বাম দল (ডি লিঙ্কে) এগিয়ে থাকায় দলটির শীর্ষ প্রার্থী ও তুর্কি বংশোদ্ভূত আইনজীবী এলিফ এরাল্পের সামনে বার্লিনের নগর সরকারপ্রধান হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জার্মান রাজনীতিতে এই দ্বিমুখী প্রবণতা দেশটির গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নে এএফডির ঐতিহাসিক জয়

৬ সেপ্টেম্বর পূর্বাঞ্চলীয় সাক্সন-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে রেকর্ড জয় পায় এএফডি। এর পর থেকেই জার্মান রাজনীতিতে অস্থিরতা ঘনীভূত হয়। সর্বশেষ রোববার মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্ন রাজ্যের নির্বাচনেও বড় সাফল্য পেয়েছে দলটি।

প্রাথমিক চূড়ান্ত ফলে দেখা গেছে, মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্নে এএফডি ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্য-বাম সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এসপিডি) পেয়েছে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে বড় ধাক্কা খেয়েছে চ্যান্সেলরের দল মধ্য-ডানপন্থী ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ); তারা ৫ শতাংশের ন্যূনতম সীমা (থ্রেশহোল্ড) অতিক্রম করতে না পেরে (৪ দশমিক ৯ শতাংশ) রাজ্য সংসদ থেকেই ছিটকে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বার্লিনে নিজের উপস্থিতি জরুরি উল্লেখ করে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যাওয়ার সফর বাতিল করেন। তবে তাঁর দল শেষ পর্যন্ত সংসদে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়।

কট্টর ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে আয়োজিত এক বিক্ষোভে বিক্ষোভকারীরা এএফডির বিরুদ্ধে একটি পতাকা প্রদর্শন করছেন। বার্লিন, জার্মানি। ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: এএফপি

ভোটারদের মনোভাব নিয়ে বিশ্লেষকের মত

এএফডির এই সাফল্যকে কেবল অর্থনৈতিক সংকট দিয়ে বিবেচনা করতে নারাজ বিশ্লেষকেরা। গ্রাইফসভাল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইয়োখেন মুলার জার্মানির ডি সাইট পত্রিকায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে জানান, সাবেক পূর্ব জার্মানির রাজ্যগুলোতে এএফডির উত্থানকে কেবল আঞ্চলিক বঞ্চনা বা গ্রামীণ অবকাঠামোর দুর্বলতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

মুলারের মতে, সরাসরি অভিবাসনের অভিজ্ঞতার চেয়ে অভিবাসন নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া ধারণা ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের আশঙ্কা বেশি ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় ঐতিহ্য হারানোর ভয় ও সাংস্কৃতিক উদ্বেগ উগ্র ডানপন্থীদের বড় পুঁজিতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে সনাতনী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর ভোটারদের দীর্ঘদিনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। ফলে এএফডিকে নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও ভোটাররা তাদের সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছেন না।

বার্লিনের নেতৃত্বে আসার পথে এলিফ এরাল্প

রাজ্যগুলোতে যখন অভিবাসনবিরোধীদের জয়জয়কার, তখন রাজধানী বার্লিনে সম্পূর্ণ ভিন্ন ইতিহাস গড়ার পথে রয়েছেন ৪৩ বছর বয়সী আইনজীবী এলিফ এরাল্প। রাজ্য সংসদে আনুষ্ঠানিক নির্বাচন ও জোট সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তিনিই হতে পারেন আগামী চার বছরের জন্য বার্লিনের নগর সরকারপ্রধান।

১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক নিপীড়নের মুখে এলিফ এরাল্পের পরিবার জার্মানিতে পাড়ি জমায়। ১৯৮১ সালে মিউনিখ শহরে এলিফের জন্ম; তাঁর বাবা পেশায় একজন চিকিৎসক ছিলেন।

হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে ২০০৯ সালে দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় আইন পরীক্ষা পাস করেন এলিফ। শিক্ষা ও আইন পেশার প্রশিক্ষণকালীন সময়ে (রেফারেন্ডারিয়েট) তিনি হামবুর্গের স্থানীয় আদালত, বার্লিনে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ইউএনএইচসিআর) এবং কানাডার অটোয়ায় জার্মান দূতাবাসে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১০ সালে বার্লিনে আসার পর তিনি জার্মান পার্লামেন্টে বাম দল ডি লিঙ্কের সংসদীয় গ্রুপে আইন ও রাজনৈতিক নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে তিনি প্রথমবারের মতো বার্লিনের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সদস্য নির্বাচিত হন। এবার ২০২৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে ডি লিঙ্কের শীর্ষ প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বার্লিনের গভর্নিং মেয়র হওয়ার চূড়ান্ত লড়াইয়ে রয়েছেন তিনি। অর্থাৎ বার্লিনের গভর্নিং মেয়র হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।