এপস্টিনের নথিপত্রের ছবিতে স্টিফেন হকিংয়ের সঙ্গে দুই নারী কারা

২০০৬ সালে ২১ বিজ্ঞানীর সঙ্গে এপস্টিনের মালিকানাধীন লিটল সেন্ট জেমস আইল্যান্ডে স্টিফেন হকিংছবি: মার্কিন বিচার বিভাগ

যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিনের নথিপত্রে বিখ্যাত পদার্থবিদ অধ্যাপক স্টিফেন হকিংকে বিকিনি পরা দুই নারীর মাঝখানে বসে হাসতে দেখা গেছে। যুক্তরাজ্যের দ্য টেলিগ্রাফ অনুসন্ধান চালিয়ে জানতে পেরেছে, জেফরি এপস্টিনের নথিতে পাওয়া এই ছবিতে হকিংয়ের পাশে থাকা ওই দুই নারী ছিলেন তাঁর দীর্ঘকালের সেবাদাতা দুই নারী (কেয়ারার)।

মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশ করা ছবিতে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যের প্রয়াত এই বিজ্ঞানী রোদ পোহানোর চেয়ারে (সান লাউঞ্জার) পোশাক পরা অবস্থায় বসে আছেন। তাঁর দুই পাশে কালো বিকিনি পরা দুজন নারী জুসভর্তি গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।

ছবিটি ২০০৬ সালে ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের সেন্ট টমাস এলাকার ‘রিৎজ কার্লটন’ হোটেলে একটি বিজ্ঞান সেমিনার চলাকালে তোলা হয়েছিল। সেখানে হকিং কোয়ান্টাম কসমোলজির ওপর বক্তৃতা দিয়েছিলেন।

পদার্থবিদ স্টিফেন হকিংয়ের সম্পত্তির দেখাশোনাকারী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ছবিতে যাঁদের মুখ ঝাপসা করে বা ঢেকে দেওয়া হয়েছে, তাঁরা হকিংয়ের নিয়মিত ও দীর্ঘকালীন দুই সেবাদাতা নারী। তাঁরা যুক্তরাজ্য থেকেই তাঁর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন।

যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিন মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে মার্কিন বিচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত লাখ লাখ নথির মধ্যে এই ছবিটি পাওয়া গেছে।

মটর নিউরন রোগে (এমএনডি) ৫০ বছরের বেশি সময় আক্রান্ত থাকার পর ২০১৮ সালে ৭৬ বছর বয়সে হকিং মারা যান। প্রকাশিত নথিপত্রে হকিংয়ের নাম ২৫০ বার এসেছে।

এর আগেও হকিংকে এপস্টিনের দ্বীপে অন্যান্য ছবিতে দেখা গিয়েছিল, যার মধ্যে ২০০৬ সালের মার্চে একটি বারবিকিউ পার্টি এবং একজন অজ্ঞাত নারীর সঙ্গে নৌকা ও সাবমেরিন–ভ্রমণের ছবি ছিল।

বলা হয়ে থাকে, এপস্টিন প্রয়াত এই অধ্যাপকের জন্য নকশা পরিবর্তন করে বিশেষভাবে একটি সাবমেরিন তৈরি করেছিলেন। কারণ, হকিং এর আগে কখনো পানির নিচে যাননি।

যৌনকাজে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচারের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার ৫ মাস আগে ২১ জন বিজ্ঞানীর একটি দল এপস্টিনের মালিকানাধীন ‘লিটল সেন্ট জেমস’ দ্বীপে গিয়েছিল। সে দলে হকিংও ছিলেন।

নথিপত্রে এপস্টিনের ২০১৫ সালের একটি ই–মেইলও পাওয়া গেছে। সেখানে ভার্জিনিয়া জিউফ্রে নামের এক নারীর তোলা অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণের উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। জিউফ্রে অভিযোগ করেছিলেন, হকিং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে আয়োজিত এক যৌন উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন।

ভার্জিনিয়া জিউফ্রে গত বছরের এপ্রিলে ৪১ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন, এপস্টিন তাঁকে পাচার করেছিলেন। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর তাঁর ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়েছিলেন। অ্যান্ড্রু অবশ্য সব সময় এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

সেই ই–মেইলে লেখা ছিল, ‘ভার্জিনিয়ার যেকোনো বন্ধু বা আত্মীয় যদি তাঁর অভিযোগগুলো মিথ্যা প্রমাণ করতে এগিয়ে আসে, তবে তাদের পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিতে পারো। সবচেয়ে বড় মিথ্যা হলো, ক্লিনটনের নৈশভোজ এবং ভার্জিন আইল্যান্ডসের সেই নতুন দাবি—স্টিফেন হকিং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন।’

এপস্টিনের সাবেক বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল জবাবে লিখেছিলেন, এটি একটি ‘ভীষণ খারাপ বুদ্ধি’। এ ছাড়া এফবিআইয়ের এক তথ্যও ফাইলে রয়েছে, যাতে বলা হয়েছে, হকিং ও এপস্টিন ২০১১ সালে একটি ‘সমকামী ক্লাব’-এ গিয়েছিলেন। অবশ্য এর পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি।

এপস্টিনের সাবেক প্রেমিকা গিলেন ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে পাচারের দায়ে কারাভোগ করছেন।

স্টিফেন হকিং ভার্জিন আইল্যান্ডসের সেন্ট টমাসে গিয়েছিলেন ‘এনার্জি অব এম্পটি স্পেস দ্যাট ইজ নট জিরো’ শীর্ষক একটি সম্মেলনে যোগ দিতে। ওই দ্বীপের পাঁচ তারকা হোটেল রিৎজ-কার্লটনে ওই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

বিজ্ঞানীদের সেই দল হোটেলের প্রতিটি কক্ষের জন্য প্রতিরাতে ১ হাজার ৬০০ ডলার খরচ করেছিল। তবে ধারণা করা হয়, এপস্টিন বিজ্ঞানীদের ওই দলকে পাশের দ্বীপে আতিথেয়তা দিয়েছিলেন।

হকিংয়ের জন্য বিশেষভাবে সাবমেরিনকে পরিবর্তন করেছিলেন এপস্টিন
ছবি: মার্কিন বিচার বিভাগ

এপস্টিনের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার ইচ্ছার কথা অনেকেই জানেন। ফাইলের নথিতে অনেক নামকরা শিক্ষাবিদের নাম রয়েছে, যদিও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

হকিং পরিবারের এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘অধ্যাপক হকিং বিশ শতকের পদার্থবিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠ অবদান রেখেছেন। একই সঙ্গে তিনি মটর নিউরন রোগে দীর্ঘতম সময় বেঁচে থাকা ব্যক্তি ছিলেন। এই শারীরিক অবস্থার কারণে তিনি ভেন্টিলেটর, ভয়েস সিন্থেসাইজার, হুইলচেয়ার এবং ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। তাঁর নামে যেকোনো অশালীন আচরণের ইঙ্গিত দেওয়া ভুল ও অত্যন্ত অবাস্তব।’