রাশিয়ায় প্লেগে গবেষকের মৃত্যু, প্লেগ ছড়ানোর আশঙ্কার মধ্যে এ নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ যুক্তরাষ্ট্রের

১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ সাল পর্যন্ত ইউরোপে তাণ্ডব চালানো প্লেগের জন্য দায়ী ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস ব্যাকটেরিয়ার ওয়েসন স্টেইনছবি: রয়টার্স

সাইবেরিয়ার একটি প্লেগ গবেষণাকেন্দ্রে রাশিয়ার একজন ল্যাব টেকনিশিয়ানের মৃত্যুর পর যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি ‘খুবই গুরুত্বের সঙ্গে’ পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, নিউমোনিক প্লেগ ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন উদ্বেগের মধ্যে ওয়াশিংটন বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

সাইবেরিয়ার ইরকুতস্ক অঞ্চলের গভর্নর ওই ল্যাব টেকনিশিয়ানের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘অজ্ঞাত কারণে সৃষ্ট নিউমোনিয়া’ উল্লেখ করে বলেন, ওই নারীর কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘কোনো অণুজীব’ তাঁর জৈবিক নমুনায় পাওয়া যায়নি।

সাইবেরিয়ার ইরকুতস্ক অঞ্চলের গভর্নর ওই ল্যাব টেকনিশিয়ানের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘অজ্ঞাত কারণে সৃষ্ট নিউমোনিয়া’ উল্লেখ করে বলেন, ওই নারীর কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘কোনো অণুজীব’ তাঁর জৈবিক নমুনায় পাওয়া যায়নি।

তবে কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোগের জীবাণু থাকা একটি টেস্টটিউব ভেঙে যাওয়ার পর অথবা এমন একটি এলাকায় মাঠপর্যায়ে যাওয়ার পর ওই নারী অসুস্থ হয়ে থাকতে পারেন, যেখানে বন্য ইঁদুরের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই প্লেগের সংক্রমণ ঘটে।

রাশিয়া থেকে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে ওয়াশিংটন কী পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, এ বিষয়ে তিনি ক্রেমলিনের সঙ্গে কথা বলেননি।

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তাদের এমন পরিস্থিতিতে পড়তে দেখে আমার হতাশ লাগছে। তবে আমরা তাদের সাহায্য করব। এ ধরনের সমস্যায় যারা পড়ে, আমরা সব সময় তাদের সাহায্য করব।’

রাশিয়ার ইরকুতস্ক অঞ্চলের শেলেখভ শহরে সংক্রামক রোগ হাসপাতাল। ৫ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

ল্যাব টেকনিশিয়ানের মৃত্যুর পর প্লেগ গবেষণাকেন্দ্রটির আর কোনো কর্মী চিকিৎসা নিতে গেছেন—এমন খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ইরকুতস্কের গভর্নর ইগর কোবজেভ। তিনি রাশিয়ার ভোক্তা অধিকার ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক নিয়ন্ত্রক সংস্থা রসপোট্রেবনাদজরের বরাত দিয়ে এ কথা বলেন।

তাদের এমন পরিস্থিতিতে পড়তে দেখে আমার হতাশ লাগছে। তবে আমরা তাদের সাহায্য করব। এ ধরনের সমস্যায় যারা পড়ে, আমরা সব সময় তাদের সাহায্য করব।
ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন প্রেসিডেন্ট

সংস্থাটি জানিয়েছে, একটি জৈবনিরাপত্তা দল ইরকুতস্কে অবস্থিত সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্যবিষয়ক অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউট পরিদর্শন করেছে। সেখানে কোনো জরুরি পরিস্থিতি পাওয়া যায়নি।

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ মানুষকে ‘গুজবে কান না দেওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছেন। এর পরিবর্তে রসপোট্রেবনাদজরের দেওয়া সরকারি বিবৃতির ওপর নির্ভর করতে বলেছেন তিনি।

রুশ গণমাধ্যম গত সপ্তাহে জানিয়েছিল, মৃত ওই নারীর সংস্পর্শে এসেছিলেন—এমন প্রায় ২০০ জনকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

রাশিয়ায় প্লেগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে সর্বশেষ তথ্য জানতে চাইলে মার্কো রুবিও বলেন, ‘মনে হচ্ছে, ওই গবেষণাগারের একজন কর্মী সংক্রমিত হয়েছিলেন। এ কারণে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে সংক্রমণ অন্তত গবেষণাগারের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে থাকতে পারে। আপনারা দেখেছেন, তারা এ নিয়ে কোয়ারেন্টিনসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে।’

প্লেগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়ার নাম ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস। বুরিয়াতিয়া অঞ্চলে মারমটের মতো তৃণভোজী ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর দেহে এ ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়। ১৪ শতকে এ ব্যাকটেরিয়ায় সৃষ্ট প্লেগ ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে পরিচিত ছিল এবং তাতে ইউরোপের প্রায় অর্ধেক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

তবে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে জানিয়ে রুবিও আরও বলেন, ‘এ ধরনের কিছু বাইরে সংক্রমিত হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আমরা বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি করছি। আমার মনে হয় না, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ আছে। তবে বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়ার ও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার কারণ আছে। আমরা সেটাই করছি।’

রুশ গণমাধ্যমে মারা যাওয়া ওই নারীর নামের প্রথম অংশ দারিয়া বলে জানানো হয়েছে। তাঁর বয়স ২০-এর কোটার শেষ দিকে। সম্প্রতি মঙ্গোলিয়া সীমান্তবর্তী বুরিয়াতিয়া অঞ্চলে যান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর গড়ে সাতজনের প্লেগে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানা যায়
ফাইল ছবি: রয়টার্স

প্লেগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়ার নাম ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস। বুরিয়াতিয়া অঞ্চলে মারমটের মতো তৃণভোজী ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর দেহে এ ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়। ১৪ শতকে এই ব্যাকটেরিয়ায় সৃষ্ট প্লেগ ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে পরিচিত ছিল এবং তাতে ইউরোপের প্রায় অর্ধেক মানুষের মৃত্যু হয়।

১৯২০-এর দশকে প্লেগের প্রাদুর্ভাবের পরিপ্রেক্ষিতে এখন থেকে ১০০ বছরের কিছু বেশি সময় আগে সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্যবিষয়ক অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন

রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সেলুলার মাইক্রোবায়োলজির সহযোগী অধ্যাপক সাইমন ক্লার্ক বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘পিএম’ অনুষ্ঠানে বলেন, ইয়ারসিনিয়া পেস্টিসের নিউমোনিক ধরন চিকিৎসা না করা হলে প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী হয়। তবে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে এর চিকিৎসা করা সম্ভব।

সাইমন ক্লার্ক আরও বলেন, ‘নিউমোনিক প্লেগ একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর এ কারণেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।’

কোনো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব হলেই মানুষ লকডাউন আর কোভিডের কথা ভাবতে শুরু করে। কিন্তু এখানে তেমন কিছুই ঘটবে না বলে আশা প্রকাশ করেছেন এই অধ্যাপক। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘লোকজন মনে করে, “ওহ, প্লেগ তো নির্মূল হয়ে গেছে, শত শত বছর আগেই চলে গেছে।” কিন্তু আসলে তা নয়। এটি এখনো আছে এবং বিশ্বের কিছু অঞ্চলে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে রয়েছে। এ কারণেই এটি নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন।’

লোকজন মনে করে, ‘ওহ, প্লেগ তো নির্মূল হয়ে গেছে, শত শত বছর আগেই চলে গেছে’। আসলে তা নয়। এটি এখনো আছে এবং বিশ্বের কিছু অঞ্চলে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে রয়েছে। এ কারণেই এটি নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন।
সাইমন ক্লার্ক, সহযোগী অধ্যাপক

জীবাণুটিকে সম্ভাব্য জৈব অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য গবেষণা করা হয়ে থাকতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ওই বিজ্ঞানী বলেন, তা হতে পারে।

ক্লার্ক বলেন, ‘রাশিয়া বলেই মানুষের মনে এমন সন্দেহ আসছে। তবে আমি আগে যে ব্যাখ্যা দিয়েছি, সেটিই সম্ভবত বেশি যুক্তিসংগত।’

আরও পড়ুন