বিবিসির মাস্টারশেফ সেমিফাইনালে রাজশাহীর ছেলে ইসমাইল
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে রেস্তোরাঁয় ‘কিচেন পোর্টার’ হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন ইসমাইল হোসেন। রেস্তোরাঁর ব্যস্ত রান্নাঘরে তিনি দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে কাজ করেন। এখন এই বাংলাদেশি বিবিসির জনপ্রিয় ‘মাস্টারশেফ: দ্য প্রফেশনালস’ শীর্ষক পেশাদার রান্নার প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালের মঞ্চে।
ইসমাইল রাজশাহীর ছেলে। বিবিসির এই প্রতিযোগিতার আসরে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ ও বৈচিত্র্য তুলে ধরে তিনি বিচারকদের নজর কেড়েছেন। তাঁর হালিম ও বিফ ভুনায় বিচারকেরা মুগ্ধ। এ নিয়ে এখন চলছে আলোচনা।
প্রতিযোগিতার প্রাথমিক ধাপগুলো পেরিয়ে ইসমাইলের এই আন্তর্জাতিক মঞ্চের সেমিফাইনালে পৌঁছানোকে বাংলাদেশি শেফদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৩৩ বছর বয়সী ইসমাইল বর্তমানে লন্ডনের পশ্চিমাঞ্চল শেফার্ড’স বুশ এলাকায় স্ত্রী–সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি পেশায় একজন ‘শেফ’।
ইসমাইলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিনি লন্ডনের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় ১৭ বছর ধরে কাজ করে আসছেন। এই সময়কালে তিনি লন্ডনের অন্তত ১২টি রেস্তোরাঁয় কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি লন্ডনের আর্চওয়ের সেন্ট জন’স ট্যাভার্ন রেস্তোরাঁয় ‘হেড শেফ’ হিসেবে কর্মরত।
ইসমাইল ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি মধ্য লন্ডনের একটি স্প্যানিশ রেস্তোরাঁয় খণ্ডকালীন চাকরি শুরু করেন। একেবারে নিচের ধাপ ‘কিচেন পোর্টার’ হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। এখানে কাজ করতে গিয়ে তিনি রান্নাঘরের শৃঙ্খলা, দ্রুততা, উপকরণ সংমিশ্রণসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। বিভিন্ন রেস্তোরাঁর নানা বিভাগে কাজ করে তিনি অভিজ্ঞতা অর্জনের পর হেড শেফ হন।
শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাজ্যে এসে যে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা প্রথম আলোর কাছে তুলে ধরেন ইসমাইল। তিনি জানান, শুরুতে তাঁর আয় ছিল সীমিত। এই আয়ে তাঁকে নিজের পড়াশোনার খরচ বহন করতে হয়। আবার বাংলাদেশে থাকা পরিবারকেও সহায়তা করতে হয়। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি রান্না বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাননি।
বই কিনে, লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়ে নিজ উদ্যোগে রান্না বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন বলে উল্লেখ করেন ইসমাইল। তিনি বলেন, এমনকি একসময় রান্নার কাজ শেখার জন্য সহকর্মীদের সঙ্গে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেছেন। পরে একটি প্রতিষ্ঠান তাঁকে স্পনসর করে ‘লেভেল–২ অ্যাডভান্সড শেফিং’ কোর্স করার সুযোগ দেয়। এরপর তিনি ‘লেভেল–৩ ফুড সেফটি অ্যান্ড হাইজিন’ কোর্স সম্পন্ন করেন। এই কোর্স তাঁকে সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করার যোগ্যতা এনে দেয়।
দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে মেজ ইসমাইল। তিনি রাজশাহীতেই বেড়ে উঠেছেন। পড়াশোনা করেছেন রাজশাহী সিটি কলেজে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেউ যখন কিছু অর্জন করে, সবাই শুধু সেই অর্জনটিই দেখে। কিন্তু এর পেছনের কঠোর পরিশ্রমটা দেখে না। আজ আমি বিবিসির মাস্টারশেফের সেমিফাইনালিস্ট হয়েছি। এই জায়গায় আসতে আমাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। যুক্তরাজ্যের কঠোর অভিবাসননীতি মোকাবিলা করে টিকে থাকা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমার সঙ্গে যারা এসেছিল, তাদের অনেকেই ইউরোপের অন্য দেশে চলে গেছে। কিন্তু আমি লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হইনি।’
‘মাস্টারশেফ: দ্য প্রফেশনালস’ বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় রান্নার প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান। এবার হচ্ছে এই প্রতিযোগিতার ১৮তম সিরিজ। রেস্তোরাঁয় কাজ শুরুর পর থেকে একদিন মাস্টারশেফ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার স্বপ্ন ছিল বলে জানালেন ইসমাইল।
ইসমাইল বলেন, ‘এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য আমার স্ত্রী আমাকে আবেদন করতে উৎসাহ ও সহায়তা করেছে। যুক্তরাজ্যের ৩২ জন অভিজ্ঞ শেফের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আমি সেমিফাইনালে এসেছি। আন্তর্জাতিক এই মঞ্চে সুযোগ পেয়ে আমি আমার দেশের খাবার তুলে ধরতে চেয়েছি। তাই হালিম ও বিফ ভুনা রান্না করেছি।’