মুরজা এখন রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কারাগারে। গত এপ্রিল থেকে স্ত্রীকেও তাঁর সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। তবে আটক কেন্দ্র-৫ থেকে তিনি নিয়মিত চিঠি লিখে যাচ্ছেন। লিখেছেন, এ নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপে নেই। কারণ, তিনি মনে করেন ‘চুপ থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না’।

মুরজার আইনজীবী বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ ও প্রেসিডেন্ট পুতিনের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাঁর বিরুদ্ধে যতগুলো অভিযোগ আনা হয়েছে, তাতে তাঁর ২৪ বছর কারাদণ্ড হতে পারে।

কারাগার থেকে বিবিসির উদ্দেশ্যে পাঠানো একটি চিঠিতে মুরজা লিখেছেন, ‘রাশিয়ায় সরকারবিরোধী কার্যকলাপের ঝুঁকি কতটা, তা আমরা সবাই বুঝতে পারি। কিন্তু যা ঘটছে, তা দেখে আমি চুপ থাকতে পারি না। কারণ,এ ক্ষেত্রে নীরবতা হলো দুষ্কর্মকে সমর্থন করা।’ তাঁর মনে হয়েছে, তিনি বিদেশেও বসে থাকতে পারবেন না। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে, আমি নিরাপদে কোথাও বসে অন্যদের প্রতিবাদ জানানোর ডাক দেওয়ার অধিকার আমার নেই।’

তাঁকে ভালোবাসি, ঘৃণাও করি

ইভজেনিয়া তাঁর স্বামীর গ্রেপ্তারের খবর প্রথম জানতে পারেন আইনজীবীর কাছ থেকে। এই আইনজীবী মুরজার মক্কেল ও বন্ধু। তিনি মস্কোতে থাকলে তাঁর ফোন সব সময় ট্র্যাক করেন তাঁর আইনজীবী। সর্বশেষ ১১ এপ্রিল মস্কোর একটি পুলিশ স্টেশনে বন্ধ হয়ে যায় তাঁর ফোন।

ইভজেনিয়া নিরাপত্তার খাতিরে সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। কারাগার থেকে স্ত্রীকে ফোন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল মুরজাকে। তবে তাঁকে যে সময় দেওয়া হয়, সেখানে শুধু ‘চিন্তা কোরো না’ কথা বলতেই সময় শেষ হয়ে যেত।

সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর রাশিয়ার গণতান্ত্রিক জাগরণের সময় এই দম্পতির বেড়ে ওঠা। মুরজা ক্যামব্রিজে ইতিহাসে পড়াশোনা করেন। পাশাপাশি তরুণ রাজনৈতিক ও সংস্কারক বরিস নেমতসভের উপদেষ্টা হিসেবে রাশিয়ার রাজনীতিতে কর্মজীবন শুরু করেন।

মুরজা বিদেশে ছিলেন। দেশে ফিরলে বিপদে পড়তে পারেন জেনেও বিবেকের তাড়নায় দেশে ফিরেছেন। চলতি বছরের শুরুর দিকে তিনি যখন মস্কো ফেরার ঘোষণা দিলেন, তাঁর স্ত্রী ইভজেনিয়া তাতে বাধা দেননি।

২০০৪ সালে ভালোবাসা দিবসে মুরজা ও ইভজেনিয়ার বিয়ে হয়। এরপর তাঁরা কখনো এত দীর্ঘ সময় আলাদা থাকেননি। মুরজা বলেন, পরিবারকে দেখতে না পারা তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ তাঁদের কথা ভাবি। কিন্তু তাঁরা কিসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন, তা আমি কল্পনাও করতে পারি না।’

সম্প্রতি লন্ডনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ইভজেনিয়ার। তিনি বলেন, ‘আমি এই মানুষটিকে তাঁর অবিশ্বাস্য সততার জন্য ভালোবাসি, আবার ঘৃণাও করি।’

যুদ্ধবিরোধী রুশদের আটকের কথা উল্লেখ করে ইভজেনিয়া বলেন, ‘যারা রাস্তায় বেরিয়েছিল এবং গ্রেপ্তার হয়েছিল, তাদের সঙ্গে তিনি (মুরজা) ছিলেন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, অশুভ কিছুকে ভয় পাওয়া উচিত নয়। এ জন্য আমি তাঁকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা ও প্রশংসা করি।’

এক পুলিশ কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য করার অভিযোগে মুরজাকে আটক করা হয়েছিল। পরে তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ আসতে থাকে। প্রথমে তাঁর বিরুদ্ধে রাশিয়ার সেনাবাহিনী এবং ‘উচ্চ নেতৃত্ব’ সম্পর্কে ‘মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর’ অভিযোগ আনা হয়।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তথাকথিত ভুয়া খবর আইনের অধীনে ১০০টির বেশি মামলা হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠন ওভিডি-ইনফো রেকর্ড করে। এই আইনে একটি মামলায় স্থানীয় কাউন্সিলর আলেক্সি গোরিনভকে গত জুলাইয়ে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর বুচায় বেসামরিক মানুষকে হত্যার অভিযোগ আনার ঘটনায় আরেক মানবাধিকারকর্মী ইলিয়া ইয়াশিনকে শিগগিরই বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় এক বক্তৃতায় মুরজা বলেছিলেন, রাশিয়া ইউক্রেনের আবাসিক এলাকায় ক্লাস্টার বোমা এবং ‘প্রসূতি হাসপাতাল ও স্কুলে বোমা হামলা’ চালিয়ে যুদ্ধাপরাধ করছে। সেই বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়।

গত মাসে মুরজার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর সর্বশেষ চিঠিতে লিখেছেন, ‘ক্রেমলিন পুতিনের বিরোধীদের বিশ্বাসঘাতক হিসেবে দেখে…প্রকৃত বিশ্বাসঘাতক তারাই, যারা তাদের ব্যক্তিগত ক্ষমতার স্বার্থে আমাদের দেশের মঙ্গল, সুনাম এবং ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে।’

রাজনৈতিক নিপীড়ন

বিদেশে দেওয়া তিনটি বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে মুরজার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়। একটিতে তিনি বলেছিলেন, রাশিয়ায় রাজনৈতিক বিরোধীদের নিপীড়ন করা হয়।

তদন্তকারীরা মনে করেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফ্রি রাশিয়া ফাউন্ডেশনের পক্ষে কথা বলছিলেন, যা রাশিয়ায় নিষিদ্ধ। কোনো বিদেশি সংস্থাকে যেকোনো ‘পরামর্শ’ বা ‘সহায়তা’ দেওয়াকে নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে মনে করা হয়, যা রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য হতে পারে। কোনো গোপন কথা প্রকাশ করা যাবে না।

মুরজার আইনজীবী ভাদিম প্রখোরোভ মস্কো থেকে ফোনে বিবিসির এই প্রতিবেদককে বলেন, প্রকাশ্যে বক্তব্যের জন্য রাষ্ট্রদ্রোহ? এটি হাস্যকর। এটি বাক্‌স্বাধীনতার ওপর খড়্গ। তিনি বলেন, ওই সময় ফাউন্ডেশনের সঙ্গে মুরজার কোনো সম্পর্কই ছিল না। এটি একটি রাজনৈতিক মামলা। তারা একেবারে স্বাভাবিক বিরোধিতাকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছে।

যা ঘটছে, তা দেখে আমি চুপ থাকতে পারি না। কারণ,এ ক্ষেত্রে নীরবতা হলো দুষ্কর্মকে সমর্থন করা।
ভ্লাদিমির কারা-মুরজা

মুরজা চিঠিতে বলেন, ‘সর্বশেষ নোবেলজয়ী আলেকজান্দার সোলঝেনিৎসিন ১৯৭৪ সালে রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। এখন আমি এ তালিকায় পড়ে গর্বিত।’

স্বামীর এমন অবস্থায় শান্ত থাকা ইভিজেনিয়ার জন্য খুব কঠিন। কারণ, এর আগেও দুবার মুরজাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। সব লক্ষণ ছিল বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার। ২০১৫ সালে মস্কোতে প্রথমবার তিনি কোমায় চলে গিয়েছিলেন। তখন তাঁর বাঁচার আশা ছিল ৫ শতাংশ। দিনরাত সেবা শুশ্রূষা করে ইভজেনিয়া সুস্থ করে তুলেছেন তাঁকে। তিনি বলেন, তখন তিনি একটি চামচও ধরতে পারতেন না। কিন্তু বিছানায় বসে বারবার ল্যাপটপে কাজ করতে চাইতেন। যখনই তিনি হাঁটার শক্তি ফিরে পেলেন, সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ গুছিয়ে রাশিয়ায় চলে যান।

ইভজিনিয়া ফোনটিকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমাতে যান। তাঁর ভয়, হয়তো মুরজার কাছ থেকে শেষ ফোন আসতে পারে বা অন্য কেউ ফোন করে বলতে পারে, তিনি আর নেই।

অনেক আগে থেকে স্বামীকে মস্কোতে যেতে বারণ করা ছেড়ে দিয়েছিলেন ইভজেনিয়া। তাঁর একমাত্র প্রতিবাদ ছিল, ব্যাগ গোছাতে সাহায্য না করা। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর মুরজার সর্বশেষ সফরের আগে ইভজেনিয়া তাঁর সঙ্গে ফ্রান্স পর্যন্ত এসেছিলেন। তিনি স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘এই ভ্রমণকে আমি সুন্দর করতে চেয়েছিলাম। প্যারিসের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বারবার চোখ ভিজে উঠছিল। কিন্তু অশ্রু গড়াতে দিইনি। ভেতরে-ভেতরে আমি জানতাম কী হতে যাচ্ছে।’

মুরজাকে গ্রেপ্তারের পর থেকে ইভজেনিয়া স্বামীর সব কাজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন। ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার রাজনৈতিক দমনপীড়ন এবং তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে করা মামলা নিয়ে কথা বলা শুরু করেছেন। ইভজিনিয়া বলেন, ‘আমার যা করা দরকার, আমি তা করছি, যাতে তাঁকে সন্তানদের কাছে ফিরিয়ে আনতে পারি। একই সঙ্গে এই জঘন্য যুদ্ধ যাতে বন্ধ হয় এবং এই খুনি শাসনকে বিচারের আওতায় আনা যায়, তা–ও করছি।’

গত সোমবার লন্ডনে হাইগেটের কাছে বরিস নেমতসভ সড়কের নামকরণ উদ্বোধন করেন ইভজেনিয়া। বরিস নেমতসভ ছিলেন মুরজার মেন্টর ও বন্ধু। মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ঊর্ধ্বতন রুশ কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য মুরজাসহ বরিস নেমতসভ বেশ কয়েক বছর পশ্চিমা সরকারগুলোর সঙ্গে লবিং করেছে। ২০১৫ সালে ক্রেমলিনের পাশে সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ও পুতিনবিরোধী বিশিষ্ট এই রাজনীতিককে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁকে হত্যার কোনো বিচার হয়নি।

প্রকাশ্যে বক্তব্যের জন্য রাষ্ট্রদ্রোহ? এটি হাস্যকর। এটি বাক্‌স্বাধীনতার ওপর খড়্গ।
ভাদিম প্রখোরোভ, মুরজার আইনজীবী

বর্তমানে কারাগারে থাকা মুরজা চুপ করে বসে নেই। হাতে লেখা কারাগারের দীর্ঘ চিঠিগুলোতে তাঁর দৃঢ় প্রত্যয় ফুটে ওঠে। সেখানে তিনি বলেছেন, স্বৈরাচারের কাছে রাশিয়া ভেঙে পড়বে না এবং এখানকার মানুষ পুতিনের হাতের পুতুলও নয়।

কারাগারে থেকেও মুরজা সমর্থকদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক চিঠি পেয়েছেন, যাঁরা প্রকাশ্যে ইউক্রেনে হামলা ও ক্রেমলিনের সমালোচনা করেছেন। ঝুঁকি সত্ত্বেও তাঁরা এখনো বিক্ষোভ করছেন। রুশ সমাজের সেই অংশটিকে যাতে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া না হয়, পশ্চিমাদের প্রতি সেই আহ্বান জানিয়েছেন মুরজা। তিনি বলেন, এই সমাজটি ‘আমাদের দেশের জন্য একটি অন্য রকম ভবিষ্যৎ চায়’।

মুরজা চিঠিতে সতর্ক করে বলেন, পুতিন যত দিন ক্ষমতায় থাকবেন, তত দিন এই যুদ্ধ শেষ হবে না। তাঁর ভাষ্য, ‘পুতিনের জন্য আপস দুর্বলতার প্রতীক এবং আগ্রাসনের আমন্ত্রণ।’ মুখ রক্ষার জন্য হলেও তাঁকে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেওয়া হলেও এক বা দুই বছরের মধ্যে আবার যুদ্ধ হবে।

মুরজা বলেছেন, তিনি ব্যায়াম, প্রার্থনা, বই পড়া এবং চিঠি লেখার মধ্য দিয়ে কারাগারের দিনগুলো কাটাচ্ছেন। একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে, সোভিয়েত আমলের ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। কারাগারের এই দিনগুলোতে তিনি তাঁদের সম্পর্কে বই পড়ে আরও বেশি জানার চেষ্টা করছেন।