সম্প্রতি খবর বেরিয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ আরও কয়েক বছর চলার আশঙ্কা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এ পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলো যেন কিয়েভকে সহায়তা অব্যাহত রাখে, সে জন্য ইউক্রেনকে কৌশলী হতে পরামর্শ দিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র গোপনে ইউক্রেনের নেতাদের উৎসাহিত করছে, কিয়েভ যেন রাশিয়াকে ইঙ্গিত দেয় যে তারা শান্তি আলোচনায় আগ্রহী। তবে প্রকাশ্যে অন্য কথা বলতে বলছে ওয়াশিংটন। এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে বলেও খবর বেরিয়েছে। 

এমন খবর শুনে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মিকোলা বলেন, ‘প্রতিদিন তাঁদের (মার্কিনদের) শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে না। তাঁরা এমনটা কীভাবে বলতে কিংবা করতে পারে?’ তবে শুধু মিকোলাই নন, ইউক্রেনের আরও অনেকেই রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির সরকারের শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া কিংবা যেকোনো সমঝোতায় আসার বিপক্ষে। তাঁরা যুদ্ধে ইউক্রেনের চূড়ান্ত বিজয় দেখতে চান।  

আমাদের অনেক মানুষকে হত্যা করেছে রুশরা। ইউক্রেনের অনেক কিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। এসবের পরও আমরা কীভাবে আলোচনা কিংবা সমঝোতা করতে পারি?
মিকোলা গাতিউক, ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের বাসিন্দা

গত ১০ অক্টোবর থেকে ইউক্রেনে হামলা জোরদার করেছে মস্কো। একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অক্টোবরের শেষ নাগাদ কিয়েভ ইন্টারন্যাশনাল সোশিওলজি ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক জরিপে ৮৬ শতাংশ ইউক্রেনীয় রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি আলোচনার বিপক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, বিজয় অর্জনের আগে পর্যন্ত ইউক্রেনের বাহিনীর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া উচিত। 

অন্যদিকে জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি ১০ জনের ১ জন ইউক্রেনীয় মনে করছেন, দ্রুত শান্তি আলোচনায় বসা উচিত ইউক্রেন সরকারের। এমনকি অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধে শর্ত মেনে হলেও মস্কোর সঙ্গে সমঝোতা জরুরি। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে সবচেয়ে জোরদার যুদ্ধ হচ্ছে। এরপরও সেখানকার দুই–তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ মস্কোর সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিবর্তে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে।  

তবে হতাহতের সংখ্যা যাতে আর না বাড়ে, তাই অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা জরুরি বলে মনে করেন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব কিয়েভ–মহায়লা একাডেমির রাজনীতির অধ্যাপক ওলেক্সি হারান। তিনি বলেন, ‘রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখন এটাকে বেসামরিক মানুষজনের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধে পরিণত করেছেন। আমাদের এ যুদ্ধ দ্রুত থামাতে হবে। প্রয়োজনে আলোচনায় বসে ইউক্রেনের শহরগুলোয় বোমা হামলা বন্ধ করতে হবে।’  

তবে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছালে ইউক্রেন সরকারকে কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এ বিষয়ে কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষক ইহার ইয়েশেকোভিচ বলেন, ‘ইতিমধ্যে ইউক্রেনের অনেক জায়গা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে রাশিয়া। এই পরিস্থিতিতে যেকোনো সমঝোতার খবর সেসব এলাকার মানুষেরা ভালোভাবে নেবে না।’  

এই ইউক্রেনীয় বিশ্লেষক আরও বলেন, যুদ্ধের শুরুর দিকে ইউক্রেন সরকার মস্কোর সঙ্গে আলোচনায় বসতে, এমনকি শর্তযুক্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে রাজি ছিল। কেননা ওই সময় রুশ বাহিনীর হামলায় হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল ইউক্রেন সরকার। তবে যুদ্ধ যত গড়িয়েছে, পরিস্থিতি বদলেছে। এখন যুদ্ধে নিজেদের অবস্থান অনেকটাই সুসংহত করেছে কিয়েভ। তাই ইউক্রেনবাসী এখন চূড়ান্ত বিজয় দেখতে চান, সমঝোতা নয়।  

যুদ্ধের শুরুর দিকে নিরপেক্ষ অবস্থান ঘোষণা, পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগদানের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার মতো নানা সমঝোতামূলক পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিল ইউক্রেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত মার্চের শেষ ভাগে এমন ঘোষণাও দিয়েছিলেন। তখন জেলেনস্কি বলেছিলেন, যদি দেশজুড়ে গণভোট আয়োজন করতে দেওয়া হয় ও তৃতীয় কোনো পক্ষ ইউক্রেনের নিরাপত্তার বিষয়ে নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে মস্কোর শর্তযুক্ত সমঝোতা প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি ইউক্রেন। 

কিন্তু জেলেনস্কির এ ঘোষণায় কাজ হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ এগিয়েছে। দোনেৎস্ক, লুহানস্কসহ ইউক্রেনের কয়েকটি অঞ্চল দখল করে নিয়েছে রাশিয়া। দক্ষিণাঞ্চলের খেরসন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় মস্কো। যদিও সম্প্রতি খেরসন থেকে সেনা সরানোর ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া। 

গত মার্চেই রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ বন্ধে ইউক্রেনের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি সই করার সম্ভাবনা রয়েছে।’ তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা অস্ত্র–অর্থসহায়তা পাওয়ায় অনেক জায়গায় ইউক্রেনের বাহিনী যুদ্ধে সাফল্য পেতে শুরু করায় সমঝোতার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ব্যর্থ হয় রাশিয়া–ইউক্রেনের মধ্যে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে পরিচালিত শান্তি আলোচনার প্রথম ধাপ।   

ইহার ইয়েশেকোভিচের মতে, মাঝখানের সময়টায় যুদ্ধে রাশিয়া কিছুটা দূর্বল হয়ে পড়েছিল। তখন ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে মস্কো আর সমঝোতার শর্ত নিয়ে দেনদরবার করবে না। তাই তাঁরা আলোচনা নয়, বরং যুদ্ধের কৌশলে মনোযোগ দিয়েছিলেন। 

যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো একদিকে মস্কোর বিরুদ্ধে লড়তে ইউক্রেনকে অস্ত্র–অর্থসহায়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা আলোচনায় বসতে পরামর্শ দিচ্ছে। পশ্চিমাদের এমন পরামর্শ অযৌক্তিক ও হাস্যকর।
মাইখাইলো পোদোলিয়াক, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা 

এখন বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, রাশিয়া যদি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা বন্ধ না করে এবং কিয়েভের ওপর পশ্চিমারা যদি আলোচনায় বসার চাপ তৈরি না করতে পারে, তাহলে নিকট ভবিষ্যতে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে শান্তি আলোচনায় বসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। 

এত দিন জেলেনস্কির মনোভাবও ছিল অনেকটা একই রকম। তবে সম্প্রতি তিনি সুর বদলেছেন। গত সোমবার তিনি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসতে রাজি আছে ইউক্রেন। তবে এ জন্য মস্কোকে পাঁচটি শর্ত মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি। 

শর্তগুলো হলো ইউক্রেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতা পুনরুদ্ধার, জাতিসংঘের সনদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট সব ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া, প্রত্যেক যুদ্ধাপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা ও এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা দেওয়া। 

মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তাঁর প্রশাসনের চাপে মস্কোর সঙ্গে আলোচনায় বসা নিয়ে সুর বদলাতে বাধ্য হয়েছেন জেলেনস্কি, এমনটাই উল্লেখ করা হয়েছে মার্কিন সাময়িকী পলিটিকোর একটি বিশ্লেষণে। যদিও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের পরামর্শক মাইখাইলো পোদোলিয়াক মঙ্গলবার বলেছেন, ‘পশ্চিমা দেশগুলো একদিকে মস্কোর বিরুদ্ধে লড়তে ইউক্রেনকে অস্ত্র–অর্থসহায়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা আলোচনায় বসতে পরামর্শ দিচ্ছে। পশ্চিমাদের এমন পরামর্শ অযৌক্তিক ও হাস্যকর।’

মাইখাইলো পোদোলিয়াক আরও বলেন, রুশ সেনারা যদি ইউক্রেন ছেড়ে যান, তবেই কেবল মস্কোর সঙ্গে আলোচনায় বসবে কিয়েভ। একই সঙ্গে ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়াও ছাড়তে হবে রুশ সেনাদের।

আল–জাজিরা, বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে লিখেছেন অনিন্দ্য সাইমুম ইমন