উড়োজাহাজের জানালা ভেঙে বাইরে ছিটকে যাওয়া স্বামীকে পা ধরে কীভাবে বাঁচিয়ে আনলেন স্ত্রী

রায়ান এয়ারের একটি উড়োজাহাজফাইল ছবি: রয়টার্স

মাঝ আকাশে উড়োজাহাজের জানালা ভেঙে প্রায় বাইরে ছিটকে পড়ে যাচ্ছিলেন এক যাত্রী। তবে শেষ মুহূর্তে স্বামীর পা শক্ত করে চেপে ধরে এবং অন্য যাত্রীদের সহায়তায় তাঁকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন স্ত্রী। গত শুক্রবার গ্রিস থেকে জার্মানিগামী রায়ানএয়ারের একটি ফ্লাইটে সম্প্রতি এ ঘটনা ঘটেছে।

এ সময় কেবিনের ভেতরের বায়ুচাপ হঠাৎ কমে যাওয়ায় উড়োজাহাজটি প্রায় ৯ হাজার ফুট নিচে নেমে যায় এবং যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

স্বেতলানা গ্রকোভিচ নামের একজন নারী তাঁর স্বামী লিউবিসা কারোভিচের সঙ্গে গ্রিসের থেসালোনিকি থেকে জার্মানির মেমিংগেনে যাচ্ছিলেন। গ্রিসের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইআরটিকে তিনি বলেন, তাঁর স্বামী প্রায় দুই মিনিট বুকপর্যন্ত উড়োজাহাজের বাইরে ঝুলে ছিলেন।

‘আমার কাছে তাঁর বেঁচে থাকাটাই বড় কথা। তাঁর হাত মারাত্মকভাবে জখম হয়েছে এবং শরীরে পোড়ার ক্ষত তৈরি হয়েছে। তিনি এখন কথা বলতে পারছেন না, পুরো ঘটনাটিও তাঁর মনে নেই।’
স্বেতলানা গ্রকোভিচ (ভুক্তভোগী)

সার্বিয়ার সংবাদমাধ্যমকে গ্রকোভিচ বলেন, ‘আমি তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর পা চেপে ধরি। তখন ভাবছিলাম, মরলে আমরা একসঙ্গেই মরব।’ তিনি বলেন, তাঁর স্বামী তিনবার জ্ঞান হারিয়েছিলেন। তবে অন্য দুই যাত্রীর সহায়তায় তিনি স্বামীকে টেনে উড়োজাহাজের ভেতরে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।

গ্রকোভিচ আরও বলেন, ‘তাঁর পাশের আসনে বসা মেয়েটি তাঁর হাত ধরে রেখেছিল। আমরা তিনজন মিলে তাঁকে ভেতরের দিকে টানছিলাম। সে সময় উড়োজাহাজের অক্সিজেন মাস্কগুলো নিচে নেমে আসে এবং চারদিকে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।’

গ্রকোভিচ আরও বলেন, উড়োজাহাজটির ইঞ্জিনের একটি অংশ ভেঙে তাঁর স্বামীর পাশের জানালায় আঘাত করেছিল বলে মনে হয়েছে। এতে জানালাটি ভেঙে যায় এবং কেবিনের ভেতরের বাতাসের চাপ হঠাৎ কমে যায়। অন্য যাত্রীরাও এ সময় বিস্ফোরণের মতো বিকট শব্দ শোনার কথা বলেছেন।

ঘটনার তদন্তে ভুক্তভোগী পরিবারের নিয়োগ করা একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, উড়োজাহাজের ডান দিকের ইঞ্জিন বিকল হয়ে এই ঘটনার সূত্রপাত। ইঞ্জিন থেকে ছিটকে আসা ধ্বংসাবশেষ কেবিনের জানালায় আঘাত করে সেটি ভেঙে ফেলে এবং দ্রুত কেবিনের বায়ুচাপ কমে যায়। তবে তদন্তকারীরা এখনো এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেননি।

এর আগে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে যাত্রীরা জানান, কারোভিচের সিটবেল্ট বাঁধা ছিল। ফলে তাঁর মাথা ও কাঁধ উড়োজাহাজের বাইরে চলে গেলেও অন্য যাত্রীরা তাঁকে সহজে ধরে রাখতে পেরেছিলেন। স্বেতলানা গ্রকোভিচ জানান, তাঁর ৬১ বছর বয়সী স্বামী গুরুতর আহত হয়েছেন এবং প্রচণ্ড মানসিক ট্রমার মধ্যে আছেন।

স্বেতলানা গ্রকোভিচ বলেন, ‘আমার কাছে তাঁর বেঁচে থাকাটাই বড় কথা। তাঁর হাত মারাত্মকভাবে জখম হয়েছে এবং শরীরে পোড়ার ক্ষত তৈরি হয়েছে। তিনি এখন কথা বলতে পারছেন না। পুরো ঘটনাটিও তাঁর মনে নেই।’

গ্রকোভিচ আরও বলেন, ‘উড়োজাহাজের কথা শুনলেই ও এখন কাঁপতে শুরু করে। আমার মানসিক অবস্থাও খুব খারাপ। আমরা বেঁচে ফিরব ভাবিনি। আমার মনে হয়েছিল, উড়োজাহাজটি বোধ হয় ভেঙে পড়বে।’

ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, রায়ানএয়ারের উড়োজাহাজটি আকাশে ওড়ার প্রায় ১০ মিনিটের মাথায় হঠাৎ ৯ হাজার ফুট (২ হাজার ৭০০ মিটার) নিচে নেমে যায়। এক বিবৃতিতে রায়ানএয়ার জানিয়েছে, গত শুক্রবার সকালে থেসালোনিকি থেকে মেমিংগেনগামী একটি ফ্লাইটের জানালা মাঝ আকাশে ভেঙে যায়। এরপর উড়োজাহাজটি গন্তব্যে না গিয়ে ফিরে আসে।

আয়ারল্যান্ডের এয়ারলাইনস জানায়, উড়োজাহাজটি স্বাভাবিকভাবেই অবতরণ করেছে এবং যাত্রীদের টার্মিনালে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। থেসালোনিকিতে অবতরণের পর এক যাত্রী নিজের চিকিৎসার অনুরোধ করেছিলেন। তাঁকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

ক্রিস্টিনা নামের এক যাত্রী রেডিও থেসালোনিকিকে বলেন, ‘আমরা সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারি, উড়োজাহাজের ভেতরের বায়ুচাপ কমে গেছে। চারদিকে মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। একমুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল, কেউ হয়তো ভুল করে জরুরি বহির্গমন দরজা খুলে ফেলেছে।’

সোফিয়া নামের আরেক যাত্রী রেডিও থেসালোনিকিকে বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম উড়োজাহাজটি ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। কেবিনের বায়ুচাপ প্রচণ্ড কমে গিয়েছিল। আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আহত ব্যক্তির শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল। অক্সিজেনের অভাব ও প্রচণ্ড আতঙ্কে তিনি কয়েকবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন।’

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি ১৮ বছরের পুরোনো। ৬১ বছর বয়সী লিউবিসা কারোভিচে এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। উড়োজাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের। ঘটনাটি ঘটেছে উত্তর মেসিডোনিয়ার আকাশসীমায়। এ কারণে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তদন্তকারীরা এই তদন্তে সহায়তা করছেন।