যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম প্রধানমন্ত্রী হয়ে কি ইতিহাস গড়তে পারবেন শাবানা মাহমুদ

ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রে এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি ফাঁসের জেরে যুক্তরাজ্যে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারে এখন প্রধানমন্ত্রীর উত্তরসূরি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার যখন নিজের নেতৃত্বের কঠিনতম চ্যালেঞ্জের মুখে, ঠিক তখন লেবার পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতারা তাঁর স্থলাভিষিক্ত কে হতে পারেন, তা নিয়ে নীরবে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছেন। আর এই আলোচনায় একটি নাম দ্রুত সামনে আসছে—শাবানা মাহমুদ।

স্টারমারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদকে এখন লেবার পার্টির শীর্ষ পর্যায়ের একজন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি কোনো কারণে দলের নেতৃত্বের লড়াই শুরু হয়, তবে তিনি হতে পারেন পরবর্তী কান্ডারি। আর এটি বাস্তবে রূপ নিলে এক অনন্য ইতিহাস গড়বেন তিনি; হবেন যুক্তরাজ্যের প্রথম মুসলিম প্রধানমন্ত্রী।

আরও পড়ুন

আলোচনার কেন্দ্রে নতুন সংকট

শাবানা মাহমুদকে ঘিরে এই নতুন আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে গত এক সপ্তাহের যুক্তরাজ্যের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘিরে। ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনকে নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে সরকারের ভেতরে অস্থিরতা শুরু হয়। নিউইয়র্কের কারাগারে ২০১৯ সালে মারা যাওয়া কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে ম্যান্ডেলসনের পুরোনো সম্পর্কের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসায় লেবার পার্টির ভেতরেই তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

শাবানা মাহমুদ সম্পর্কে ৫টি জরুরি তথ্য

লেবার পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: শাবানা মাহমুদ লেবার সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ২০২৫ সাল থেকে তিনি যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত তিনি।

পেশায় আইনজীবী নেশায় রাজনীতিবিদ: বার্মিংহামে জন্ম নেওয়া শাবানা অক্সফোর্ডের লিঙ্কন কলেজ থেকে ২০০২ সালে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ব্যারিস্টার হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। এই আইনি পটভূমি তাঁকে একজন নিয়মানুবর্তী ও দক্ষ সংগঠক হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে শাবানা মাহমুদ
ছবি: এএফপি

প্রথম দিককার মুসলিম নারী সংসদ সদস্যদের একজন: ২০১০ সালে শাবানা মাহমুদ যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন। রুশনারা আলী এবং ইয়াসমিন কোরেশির সঙ্গে তিনিও ছিলেন যুক্তরাজ্যের প্রথম তিন মুসলিম নারী এমপির একজন—যা সে দেশের রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক।

অভিবাসন নিয়ে কঠোর অবস্থান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শাবানা মাহমুদ কঠোর অভিবাসন নীতি গ্রহণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। স্থায়ী বসবাসের আবেদনের সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস কোনো ‘অধিকার নয়, বরং একটি বিশেষ সুযোগ’। তাঁর এই অবস্থান লেবার পার্টির ভেতরেও বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ইতিহাস গড়ার হাতছানি: এপস্টিন-সংক্রান্ত কেলেঙ্কারির জেরে স্টারমারের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকায় লেবার পার্টির পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় শাবানার নাম জোরালোভাবে উঠে আসছে। দলের নেতৃত্ব পেলে তিনি হবেন যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম প্রধানমন্ত্রী।

সম্প্রতি ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনের নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকটে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে। স্টারমারের চিফ অব স্টাফ মরগান ম্যাকসুইনি এই নিয়োগের দায়ভার কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ করেছেন।

মূলত প্রধানমন্ত্রীকে সুরক্ষা দিতেই ম্যাকসুইনির এই পদক্ষেপ। কিন্তু এটি উল্টো সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়িয়ে দিয়েছে। লেবার পার্টির জনসমর্থন যখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তখন দলের অনেক নীতিনির্ধারক একান্ত আলোচনায় বলছেন, স্টারমারের টিকে থাকার সম্ভাবনা এখন ‘ফিফটি-ফিফটি’।

এমন এক টালমাটাল পরিস্থিতিতে সবার নজর এখন সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের দিকে। আর এ ক্ষেত্রে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শাবানা মাহমুদ।

কে এই শাবানা মাহমুদ

আইনজীবী থেকে পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া শাবানা মাহমুদ লেবার পার্টির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। তাঁর বয়স ৪৫ বছর। বার্মিংহামে জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিবিদের বাবা মাহমুদ আহমেদ, মা জুবায়দা। তাঁর পারিবারিক শিকড় মূলত পাকিস্তান ও পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের মিরপুরে।

অক্সফোর্ডের লিঙ্কন কলেজ থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের এক বছর পর শাবানা ‘বার ভোকেশনাল কোর্স’ সম্পন্ন করেন এবং রাজনীতিতে আসার আগে পুরোদস্তুর ব্যারিস্টার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০১০ সালে তিনি প্রথমবার যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। রুশনারা আলী ও ইয়াসমিন কোরেশির পাশাপাশি তিনিও ছিলেন যুক্তরাজ্যের প্রথম দিককার নারী মুসলিম এমপিদের একজন।

লেবার পার্টির ভেতরে শাবানা মাহমুদ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও বাগ্মী রাজনীতিবিদ হিসেবে সুপরিচিত। দলের ভেতরে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের একজন বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই নেত্রী মূলত লেবার পার্টির কট্টর ডানপন্থী অংশের প্রতিনিধি হিসেবেই বেশি পরিচিত।

অভিবাসন নিয়ে কঠোর অবস্থান

২০২৫ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শাবানা মাহমুদ সীমান্ত নিরাপত্তা, পুলিশ প্রশাসন এবং অভিবাসন খাত তদারক করছেন। আর এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট ও কঠোর হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে অভিবাসন ইস্যুতে শাবানা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। অধিকাংশ অভিবাসীর স্থায়ীভাবে বসবাসের আবেদনের ন্যূনতম সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। স্থায়ী আবাসনকে ‘অধিকার নয়, বরং একটি বিশেষ সুযোগ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

শাবানার মতে, জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই পদক্ষেপ জরুরি। তবে তাঁর এই অবস্থান লেবার পার্টির অনেক এমপি ও অভিবাসীর অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে।

অনেকে মনে করেন, একদিকে গাজা যুদ্ধ নিয়ে লেবার পার্টির অবস্থানের কারণে যেসব মুসলিম ও ফিলিস্তিনপন্থী ভোটার দলবিমুখ হয়েছেন, শাবানা মাহমুদ তাঁদের আবার দলের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবেন। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাঁর কঠোর অবস্থান দেখে অনেকেই মনে করেন, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন মূলত মধ্যপন্থী বা রক্ষণশীল ঘরানার। এই দ্বৈত অবস্থান শাবানার ব্যক্তিত্বে এক জটিল আবেদন তৈরি করেছে।

শাবানা মাহমুদ কেন আলোচনায়

কিয়ার স্টারমারের অবস্থান যত দুর্বল হচ্ছে, লেবার পার্টির এমপিরা ততই চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন—কে পারবেন দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে, জনমত জরিপে ধস ঠেকাতে এবং সাধারণ ভোটারদের কাছে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে। মন্ত্রিসভায় জ্যেষ্ঠ পদ, আইনি পটভূমি ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করায় শাবানা মাহমুদ এখন সেই তালিকায় সবার ওপরের দিকে আছেন।

দলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী অন্তত ৮১ জন লেবার এমপির সমর্থন প্রয়োজন হবে। স্টারমারের অবস্থান আরও শোচনীয় হয়ে পড়লে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে। এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা আসেনি।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শাবানা মাহমুদ
ছবি: এএফপি

আলোচনায় আরও যাঁরা

প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ওপর চাপ বাড়তে থাকায় উত্তরসূরি হিসেবে কেবল শাবানা মাহমুদ নন, লেবার পার্টির আরও বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নামও আলোচনায় আসছে।

ওয়েস স্ট্রিটিং

৪৩ বছর বয়সী স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংকে একজন দক্ষ বক্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গাজা যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর তিনি। তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন রয়েছে।

গত বছর সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছিল, স্টারমারের মিত্ররা স্ট্রিটিংয়ের পক্ষ থেকে আসা সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০১৫ সালে পার্লামেন্টে আসা স্ট্রিটিং অবশ্য বরাবরই এসব গুঞ্জনকে ‘বাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে তাঁর সরব উপস্থিতি তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রেই রাখছে।

আরও পড়ুন

অ্যাঞ্জেলা রেনার

সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ৪৫ বছর বয়সী অ্যাঞ্জেলা রেনার লেবার পার্টির প্রথাগত রাজনীতিকদের চেয়ে কিছুটা আলাদা। মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্কুল ছাড়েন তিনি। বড় হয়েছেন সরকারি আবাসন প্রকল্পে। অল্প বয়সেই তিনি মা হন। ট্রেড ইউনিয়ন থেকে উঠে আসা রেনার ২০১৫ সালে এমপি নির্বাচিত হন।

তৃণমূলে ব্যাপক জনপ্রিয় রেনার ২০২০ সালে দলের উপনেতা হন। তবে গত বছর বাড়ি কেনা নিয়ে কর বিতর্কে জড়িয়ে সরকার থেকে পদত্যাগ করলে নেতৃত্বের দৌড়ে কিছুটা পিছিয়ে যান তিনি। ওই ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। সম্প্রতি এপস্টিন–কেলেঙ্কারির পর তিনি দলের বিদ্রোহী এমপিদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

আরও পড়ুন

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম

গ্রেটার ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় মেয়র ৫৬ বছর বয়সী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দীর্ঘদিন ধরেই স্টারমারের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত। তিনি অতীতে লেবার সরকারের সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

তবে বার্নহ্যামের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে বড় বাধা হলো সাংবিধানিক প্রথা—যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই একজন বর্তমান এমপি হতে হয়। চলতি বছরের শুরুতে একটি উপনির্বাচনে লেবার পার্টি তাঁকে প্রার্থী হতে বাধা দিলে তাঁর সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়ে।

এড মিলিব্যান্ড

৫৬ বছর বয়সী জ্বালানিমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। তিনি এর আগে লেবার পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তবে ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে দলের পরাজয়ের পর মিলিব্যান্ড নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি প্রকাশ্যে আবারও নেতৃত্বে ফেরার আকাঙ্ক্ষা অস্বীকার করলেও দলে তাঁর অবস্থান ও নীতিনির্ধারণী দক্ষতার কারণে অস্থির সময়ে বারবার তাঁর নাম উঠে আসছে।

আরও পড়ুন