ইসরায়েলকে সমর্থনের কারণেই কি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভোটে হারল জার্মানি

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচনের আগে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ভাদেফুল। নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র। ৩ জুন ২০২৬ছবি: রয়টার্স

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) অস্থায়ী সদস্যপদে গত বুধবার জয়ী হতে ব্যর্থ হয়েছে জার্মানি। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ভাদেফুল এর পেছনে একটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়াই জার্মানির এই গুরুত্বপূর্ণ ভোটে হারার কারণ হতে পারে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মোট সদস্যরাষ্ট্র হচ্ছে ১৫। এর মধ্যে ৫টি স্থায়ী ও ১০টি অস্থায়ী সদস্যপদ। অস্থায়ী সদস্যরা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। ‘পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য’ গ্রুপের জন্য বরাদ্দ দুটি পদে লড়েছিল জার্মানি। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল। শেষ পর্যন্ত আসন দুটি ওই দুই দেশই জিতে নিয়েছে। সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটিতে জার্মানি ১০৪টি ভোট পেয়েছে। নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে যা ২৩ ভোট কম।

কয়েক দশক ধরে প্রতি আট বছর পরপর পশ্চিম ইউরোপের জন্য বরাদ্দ পদগুলোর একটিতে সফলভাবে জিতে আসছিল জার্মানি। এবারই প্রথম নিরাপত্তা পরিষদের এই অস্থায়ী আসনটি পেতে ব্যর্থ হলো দেশটি।

জার্মানিতে প্রতিক্রিয়া কী

গত সপ্তাহে নিউইয়র্ক সফর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভাদেফুল। নিরাপত্তা পরিষদে জার্মানির পক্ষে সমর্থন জোটাতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে তদবির চালান। জানা যায়, জাতিসংঘে তিনি প্রায় ৮০ জন মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এমনকি গত সোমবার সন্ধ্যায় তিনি একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করেন।

কিন্তু ভোটের ফল আসার পর এই পরাজয় নিজ দেশে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ইউরোপ ও বিশ্বমঞ্চে জার্মানির প্রভাব পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন তিনি।

উগ্র ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) কো-লিডার অ্যালিস উইডেল এই ফলকে ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির পার্লামেন্টারি দলের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক মুখপাত্র আদিস আহমেতোভিচ এ নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, এই ভোট প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জার্মানিকে এখন কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

ইউক্রেন ও ইসরায়েল ইস্যুতে জার্মানির অবস্থানকেই এই হারের কারণ হিসেবে দেখছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সাংবাদিকদের ভাদেফুল বলেন, ‘কিছু নির্দিষ্ট ইস্যুতে জার্মানি সব সময়ই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট রেখেছে। তবে সব সদস্যরাষ্ট্র আমাদের এসব অবস্থানের সঙ্গে একমত নয়।’ তিনি আরও বলেন, জার্মানির প্রার্থিতার বিরুদ্ধে অবস্থান তৈরি করতে রাশিয়া যে কাজ করেছে, তা কারও কাছেই গোপন নয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান দেওয়ার সময় এক বিক্ষোভকারীকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। বার্লিন, জার্মানি। ১২ অক্টোবর ২০২৩
ছবি: এএফপি

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ইউক্রেনের প্রতি আমাদের দৃঢ় সমর্থন রয়েছে। আর রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদে এমন কোনো কণ্ঠস্বর চায় না।’

তবে ভাদেফুল এ কথাও স্বীকার করেছেন, ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টিও তাঁদের জেতার সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে ইসরায়েলের প্রতি জার্মানিকে সব সময় একটি বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে হয়। এর ফলেও কিছু ভোট হাতছাড়া হতে পারে।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের হলোকাস্টের (গণহত্যা) কারণে একধরনের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থেকে ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে থাকে জার্মানি। ভাদেফুল মূলত সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন।

কেন নিরাপত্তা পরিষদে জিততে ব্যর্থ হলো জার্মানি

এই হারের পেছনে ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার যুক্তিটি উড়িয়ে দিয়েছেন বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক। তাঁদের মতে, এই ভোটে ইউক্রেন ইস্যু খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। বরং ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ায় বার্লিন বিশ্বজুড়ে যে বিরোধিতার মুখে পড়েছে, সেটিই সম্ভবত এই হারের মূল কারণ।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রিটা পার্সি বলেন, ‘বিষয়টা পরিষ্কার করা যাক। ইউক্রেনকে জার্মানির সমর্থন দেওয়ার সঙ্গে এই হারের কোনো সম্পর্ক নেই। যেসব দেশ জার্মানিকে হারিয়েছে, সেই পর্তুগাল ও অস্ট্রিয়াও কিন্তু ইউক্রেনকে কম সমর্থন দেয় না।’

পার্সি আরও বলেন, ‘এর সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত নিধনের প্রতি জার্মানির সমর্থনের পুরোপুরি সম্পর্ক রয়েছে। ইসরায়েলকে বাঁচাতে জার্মান সরকার যেভাবে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদকে অবজ্ঞা করতে পিছপা হয়নি, এই হার সেটিরই ফল। ইসরায়েলি অপরাধের প্রতি জার্মানির এই অন্ধ সমর্থনই নিরাপত্তা পরিষদে তাদের আসন কেড়ে নিয়েছে। আর এমনটাই হওয়া উচিত ছিল।’

পার্সি আরও বলেন, জার্মানির সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। অথচ জাতিসংঘের কূটনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে এবং সংস্থাটিতে তাদের আর্থিক অবদানও অনেক।

পার্সি বলেন, ‘জাতিসংঘের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থদাতা দেশ জার্মানি। এ ছাড়া “প্যাক্ট অব দ্য ফিউচার” চুক্তির আলোচনায় তারা নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছে। এরপরও নিরাপত্তা পরিষদের এই আসন হারানোয় আমি মোটেও অবাক হইনি। আশা করি, এই হার বার্লিনকে তাদের নীতি নিয়ে নতুন করে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করবে।’

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) নিউইয়র্ক কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক ক্রেইগ মোখাইবারও এই হারের সঙ্গে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে জার্মানির অবস্থানকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

মোখাইবার বলেন, ‘আজ সাধারণ পরিষদে ন্যায়বিচারের এক বিরল দৃষ্টান্ত দেখা গেল। আর তা হলো জার্মানির নিরাপত্তা পরিষদের আসন পাওয়া থেকে ছিটকে পড়া।’

জাতিসংঘের সাবেক এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ফিলিস্তিনে গণহত্যা ও ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে জার্মানির লজ্জাজনক সমর্থন ছিল। পাশাপাশি নিজ দেশের ভেতরেও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে তারা। সাধারণ পরিষদ যখন জার্মানিকে এই নজিরবিহীন পরাজয় উপহার দিল, তখন এই বিষয়গুলোই সবার সামনে উঠে এসেছে।’

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়। এর পর থেকেই ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়েছে জার্মানি। এমনকি বেশ কয়েকজন অধিকারকর্মীকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ারও নির্দেশ দেয় তারা। এসব কর্মকাণ্ডে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার মুখে পড়ে দেশটি।

ইসরায়েলের সঙ্গে কি কোনো ‘বিশেষ সম্পর্ক’ রয়েছে

নিউইয়র্কে সাধারণ পরিষদে জার্মান কূটনীতিকেরা সাধারণত ইসরায়েলের বিষয়ে বেশ সতর্ক অবস্থান নিয়ে চলেন। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন–সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাবে ভোট দেওয়া থেকে তাঁরা প্রায়ই নিজেদের বিরত রাখেন। তবে একই সঙ্গে তাঁরা দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিও সমর্থন জানান।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে সাধারণ পরিষদে গাজা ও বৃহত্তর ফিলিস্তিন ইস্যুতে অন্তত সাতটি প্রস্তাবে ভোটাভুটি হয়েছে। এর মধ্যে চারটিতেই ভোটদানে বিরত থেকেছে জার্মানি। এর মধ্যে ২০২৩ সালে মানবিক বিরতি বা যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো দুটি প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়ার প্রস্তাবের ভোটাভুটিতেও বিরত ছিল বার্লিন। এ ছাড়া অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের বেআইনি উপস্থিতি বন্ধের দাবি জানানো একটি প্রস্তাবেও তারা ভোট দেয়নি। তবে পরবর্তী সময়ে তারা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। এর মধ্যে ২০২৪ সালের একটি এবং ২০২৫ সালের আরেকটি প্রস্তাব রয়েছে।

তবে জার্মানি যখন যুদ্ধবিরতির পক্ষে ভোট দেয়, তত দিনে গাজায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, গাজায় ইসরায়েলের এই গণহত্যার কারণে উপত্যকাটিতে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ইতিমধ্যে ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে তাঁরা মারা গেছেন বলেই ধারণা করা হয়।

গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির পর জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ইসরায়েল সফর করেন। সেখানে তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকও করেন। অথচ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২০২৪ সালেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন।

একই বছর আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) গাজায় গণহত্যা থেকে বিরত থাকতে ইসরায়েলকে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকার আনা গণহত্যার অভিযোগের তদন্তও করছেন তাঁরা। এরপর আরও বেশ কয়েকটি দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার এই আইনি লড়াইয়ে যোগ দিয়েছে। এসবের পরও জার্মান চ্যান্সেলর ইসরায়েল সফর করেন।

গত ডিসেম্বরে ইসরায়েল সফরের সময় মের্ৎস বলেছিলেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে’ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা জার্মানির নেই।

গাজায় ব্যবহার করা হতে পারে—এমন অস্ত্র রপ্তানির ওপর তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা ছিল জার্মানির। ওই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ইসরায়েল সফর করেন চ্যান্সেলর মের্ৎস। আল-জাজিরার সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার ওই সময়েও জার্মানি থেকে ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত ছিল।

নিজ দেশের ভেতরে ফিলিস্তিনপন্থী অধিকারকর্মীদের প্রতি সরকারের আচরণের কারণেও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছে জার্মানি। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের আটক করতে জার্মান পুলিশ অত্যন্ত কঠোর ও সহিংস পদক্ষেপ নিচ্ছে।