জ্ঞানী-গুণীদের প্রায় সময় বলতে শোনা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি অর্জনের জায়গা নয়। এটি দর্শন, ইতিহাস, ধর্মতত্ত্বসহ জ্ঞানবিজ্ঞানের নানান শাখা নিয়ে আলোচনা, গবেষণা ও নতুন জ্ঞান তৈরির বিশেষ পরিসর।
আমাদের মতো অনুন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে মনীষীরা কেন এ কথা বলেন, তা বুঝতে তেমন একটা কষ্ট হয় না। অন্যদিকে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করলে, পণ্ডিতদের এসব কথার মর্ম বোঝা সহজ হয়।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশই শুরুর দিকে মূলত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছিল। ধর্মতত্ত্ব, ভাষা, আইন ও দর্শনের পাশাপাশি সময়ের হাত ধরে সেখানে জ্ঞানের নতুন নতুন বিষয় যোগ হয়। সময় ও সংস্কারের বিবর্তনে এসব প্রতিষ্ঠান খোলনলচে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়।
প্রতিষ্ঠিত ধারণামতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাটি মূলত মধ্যযুগীয় ইউরোপের সঙ্গে সম্পৃক্ত; কিন্তু ‘আলোকিত’ ইউরোপ বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যা বোঝ্য়, অনেকটা সেই আদলের প্রতিষ্ঠান তারও আগে গড়ে উঠেছিল মুসলিম শাসনাধীন বিভিন্ন অঞ্চলে।
বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়, যেগুলো আজও সগৌরবে চালু আছে, তেমন ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন।
মরক্কোর ফেস শহরে অবস্থিত জামিয়াতুল কারাওয়িয়্যিন বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত। আরবি জামিয়া শব্দের অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়। আর কারাওয়িয়্যিন শব্দের অর্থ মহল্লাবাসী। এই হিসেবে জামিয়াতুল কারাওয়িয়্যিন অর্থ দাঁড়ায় মহল্লা বা গ্রামবাসী বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু শুরুতে এটার নাম কী ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। ইউনেসকো ও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুসারে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো সচল বিশ্ববিদ্যালয়।
এক দল বিশেষজ্ঞের মতে, এটি ৮৫৭ বা ৯৫৯ সালে মসজিদ হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। এর প্রতিষ্ঠাতা ফাতিমা আল-ফিহরি। তিনি ছিলেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মুহাম্মেদ আল-ফিহরির কন্যা। পরিবারটি নবম শতকের শুরুর দিকে তিউনিসিয়া থেকে মরক্কোর ফেস শহরে পাড়ি জমিয়েছিল।
মসজিদ হিসেবে চালু হলেও একসময় কারাওয়িয়্যিনে কিছু কিছু পাঠদান শুরু হয়। পরে তা মাদ্রাসায় রূপ নেয়। নানা চড়াই-উতরাইয়ের পর ১৯৬৩ সালে তা মরক্কোর আধুনিক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থার আওতাভুক্ত হয়। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে কারাওয়িয়্যিনে ইমাম মালেকের মতাদর্শ অনুসারে ধর্মতত্ত্ব, আইন, দর্শন ও ভাষা শিক্ষা দেওয়া হতো। এখন সেখান ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ও শিক্ষা দেওয়া হয়। পশ্চিম আফ্রিকার নানা দেশের শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনা করেন।
মিসরের আল-আজহার নিয়ে সারা দুনিয়ার মুসলিমদের মধ্যে একধরনের আত্মশ্লাঘা কাজ করে। মিসরের রাজধানী কায়রোতে ফাতিমীয় খিলাফতের সময় ৯৭০ বা ৯৭২ সালে এটি মসজিদ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। শুরুর দিকে কোরআন, হাদিস, ইসলামি আইন, যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, অলংকার বা চান্দ্রমাস গণনার হিসাবের মতো বিষয়গুলো শিক্ষা দেওয়া হতো।
ইসমাইলি শিয়াদের খিলাফতের পতনের পর আল-আজহার সুন্নি ধর্মতত্ত্ব শিক্ষা দেওয়ার কেন্দ্রে পরিণত হয়। বর্তমানে এটি বিশ্বে আরবি সাহিত্য ও ইসলামি বিষয় শিক্ষা দেওয়ার অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপরিচিত। ১৯৬১ সাল থেকে এখানে চিকিৎসা ও প্রকৌশল শাস্ত্রের মতো বিষয়গুলো শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
ইতালির বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ১০৮৮ সালে। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে এতে ইউরোপের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসতেন। এর দেওয়ানি ও গির্জা-সংক্রান্ত ধর্মীয় আইন খুব বিখ্যাত ছিল। ত্রয়োদশ শতকে এতে চিকিৎসাশাস্ত্র বিভাগ চালু হয়। এতে করে ইউরোপে অনেক দিন ধরে হারিয়ে যাওয়া শল্যচিকিৎসা ও অন্যান্য চিকিৎসাপদ্ধতির পুনর্জাগরণ ঘটে।
সপ্তদশ শতক থেকে এতে নারীদের পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমানে এর ১১টি স্কুলে (ফ্যাকাল্টিতে) প্রায় ৮৫ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা নবম শতকে, ১৩০০ সাল পর্যন্ত এই ধারণা প্রচলিত ছিল। ইতিহাসবিদেরা পরে বের করলেন, নবম শতক নয়, বিশ্ববিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ১০৯৬ সালে। শুরুর দিকে এর নিজস্ব কোনো ভবন ছিল না। ক্লাস চলত ভাড়া করা হল, গির্জাসহ অন্যান্য স্থানে। ত্রয়োদশ শতকে পর্যন্ত এখানে ধর্মতত্ত্ব ছিল প্রধান বিষয়।
সপ্তদশ শতকের শেষের দিক থেকে এখানে বিজ্ঞানচর্চা জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ১৪৭৮ সালে বিশ্ব প্রকাশনা জগতের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস আত্মপ্রকাশ করে। দীর্ঘ ইতিহাসে অক্সফোর্ড থেকে পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট বয়েল, জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যাডমন্ড হ্যালি, লেখক লুইস ক্যারল ও সি এস লুইসের মতো অনেক বরেণ্য ব্যক্তি বের হয়েছেন। ২৬ জন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও ২৭ জন নোবেল বিজয়ী অক্সফোর্ডের সাবেক শিক্ষার্থী।
স্পেনের সালামাঙ্কা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে ১০৯৪ সালে। শুরুর দিকে তা ছিল ক্যাথলিক স্কুল। ১১৬৪ সালে রাজা নবম আলফনসো এটিকে রাজকীয় স্বীকৃতি দেন। মানবিক, বিজ্ঞান; বিশেষ করে ভাষাশিক্ষায় সারা বিশ্বে এর খ্যাতি রয়েছে।
ক্রিস্টোফার কলম্বাস (১৪৫১-১৫০৬) পশ্চিম দিক দিয়ে ভারতবর্ষে পৌঁছার নতুন সমুদ্রপথ অনুসন্ধানের জন্য যখন স্পেনের রাজা ও রানির কাছে আবেদন করছিলেন, তখন তিনি সালামাঙ্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলবিদদের এক পরিষদের সামনে নিজের যুক্তি তুলে ধরেছিলেন।
ওই ভূগোলবিদেরা কলম্বাসের যাত্রাপথ ও হিসাব-নিকাশ নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁরা মনে করতেন, এ পথে অন্য কোনো নতুন ভূখণ্ডের সন্ধান পাওয়া সম্ভব। সেই ধারণা থেকে তাঁরা কলম্বাসের অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১১৬০ সালে। ফ্রান্সের রাজধানী হিসেবে প্যারিসের নাম সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। ত্রয়োদশ শতকে ফরাসি সম্রাটেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নানা সুবিধা দিতেন। প্রথম যুগে ধর্মতত্ত্বই ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল বিষয়। পরে মানবিক ও সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞানেরও নানা শাখা যুক্ত হয়।
মধ্যযুগ শেষের দিকে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় ইউরোপের সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। অসাধারণ সব শিক্ষার্থী ও বিপুলসংখ্যক গ্রন্থসমৃদ্ধ বিশাল গ্রন্থাগার ছিল প্রধান আকর্ষণ।
প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো সচল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি ধরা যাবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কারণ, ১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক ছাত্র-শ্রমিক আন্দোলনের পর ১৯৭০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর এটি আর একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে থাকেনি, ভেঙে গড়ে ওঠে ১৩টি স্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়।
কেমব্রিজ বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠা হয় ১২০৯ সালে। স্থানীয় জনগণের সঙ্গে বিরোধের পর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পালিয়ে আসা একদল পণ্ডিত এটির ভিত্তিপ্রস্তর করেছিলেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান ব্যবস্থা অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
শিক্ষাগত দিক থেকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় বিশ্বের শীর্ষ ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নিজ স্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। এ পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৮২ জন নোবেল লাভ করেছেন।
ইউরোপের রেনেসাঁকালের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ইতালির পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। গ্যালিলিও গ্যালিলি বিশ্ববিদ্যালয়টির উজ্জ্বল শিক্ষার্থীদের একজন। ১২২২ সালে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করে। এসব শিক্ষার্থীর অনেকে বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এখানে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন।
প্রাথমিকভাবে পাদুয়া ‘শিক্ষার্থী-নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয়’ ছিল, যেখানে শিক্ষার্থীরা অধ্যাপক নির্বাচন করত এবং তাঁদের বেতন নির্ধারণ করত। এটি এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিলেন প্রায় ৬৫ হাজার।
হলি রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক ১২২৪ সালে ইতালির নেপলস বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের নেপলসে বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব কমাতেই এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক তাঁর শাসনাধীন অঞ্চলের সব শিক্ষার্থীকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে বাধ্য করেছিলেন।
কখনো কখনো বিশ্ববিদ্যালয়টি বেশ খারাপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। তবে বর্তমানে এটি ইতালির অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকাশিত গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতির (সাইটেশন) ভিত্তিতে ২০১৫ সালে এটি বিশ্বের শীর্ষ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্থান করে নিয়েছিল।
ইতালির টাসকানি অঞ্চলের সিয়েনা শহরে অবস্থিত সিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি, যা এখনো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এটি ইতালির জনগণের অর্থায়নে পরিচালিত প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। ১২৪০ সালে স্টুডিয়ুম সেনেসে নামে মূল প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে।
পরবর্তী সময়ে নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি বর্তমানে আইন ও চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। ২০০৬ সালে এর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ হাজার।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড অ্যাটলাস অবলম্বনে