প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে সরানোর প্রতিবাদে ইউক্রেনে বড় বিক্ষোভ, সেনাপ্রধানের অপসারণ দাবি
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে অপসারণ করছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এ ঘটনার প্রতিবাদে আজ বৃহস্পতিবার দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। একই সঙ্গে ফেদোরভ ও সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কির বিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে। এমন এক সময়ে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, যখন দেশটির পার্লামেন্টে নতুন সরকার গঠনের প্রস্তাব নিয়ে ভোট চলছে। এ ছাড়া মস্কোর সঙ্গে যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায় পার করছে ইউক্রেন।
গত রোববার মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদল করেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। চলতি বছর এ নিয়ে দুইবার মন্ত্রিসভা ঢেলে সাজালেন তিনি। নতুন মন্ত্রিসভায় ৩৫ বছর বয়সী প্রযুক্তিবিদ ফেদোরভের জায়গা হয়নি। সংখ্যায় পিছিয়ে থাকা ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে আরও কার্যকর যুদ্ধক্ষম বাহিনীতে রূপান্তরের উদ্যোগের জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। তাঁকে অপসারণের মধ্য দিয়ে তাঁর সঙ্গে সেনাপ্রধান সিরস্কির মতবিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে।
ফেদোরভকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে রাজধানী কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে আজ শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। যুদ্ধ চলাকালে দেশটিতে এমন বিক্ষোভ খুব বিরল। বিক্ষোভকারীরা ফেদোরভকে সরানোর কারণ ব্যাখ্যার দাবি জানান। একই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর উপকমান্ডার ও ড্রোনযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা পাভলো ইয়েলিজারভ পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
সংসদ সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি খাতের নির্বাহী সেরহি কোরেৎস্কির নেতৃত্বে নতুন সরকারে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইহর ক্লিমেনকো প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন। এ সিদ্ধান্ত জেলেনস্কির যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের প্রতি অনেকের আস্থায় ধাক্কা দিয়েছে।
বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ফেদোরভ নিশ্চিত করেন, তাঁর দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। আজ ফেদোরভ সাংবাদিকদের বলেন, জেলেনস্কি তাঁকে উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। জেলেনস্কি অবশ্য এ বিষয়ে এখনো প্রকাশ্যে কিছু বলেননি।
ড্রোনযুদ্ধের শীর্ষ কর্মকর্তা পদত্যাগ
ইউক্রেন ২০২২ সালের শেষ দিকের পর থেকে বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে দেশটি রাশিয়ার তেল খাত ও সামরিক রসদ সরবরাহব্যবস্থায় হামলা চালাচ্ছে।
তবে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে রুশ বাহিনী। একই সঙ্গে স্থলবাহিনীতে সেনাসংকট এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতিও ইউক্রেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যম এনভির সম্পাদক ভিতালি সিচ লিখেছেন, ‘কঠিন সময়ে জেলেনস্কি বীরের মতো আচরণ করেন। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, অনেক সময় তাঁর বোকামিপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণেই এমন কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।’
প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ
রাজধানী কিয়েভে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের সামনে আজ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। তাঁরা ‘লজ্জা’, ‘লজ্জা’ বলে স্লোগান দেন। তাঁদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে ‘কেন?’ ও ‘রুশ উদ্যাপন করছে’ ইত্যাদি লেখা ছিল।
ইউক্রেনের বর্তমান পরিস্থিতি গত জুলাইয়ের বড় বিক্ষোভের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে সময় দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা খর্বের একটি সিদ্ধান্ত জনরোষের মুখে জেলেনস্কিকে প্রত্যাহার করতে হয়েছিল।
‘আলি’ নামে পরিচয় দেওয়া এক বিক্ষোভকারী বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা অবনতি নয়, উন্নতি চাই।’ তিনি বলেন, ফেদোরভের কাজের ‘ফলাফল আমরা দেখতে পাচ্ছি। স্বাধীনতার লড়াইয়ে স্পষ্ট অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি।’
বিক্ষোভকারীদের অনেকে সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কিকে অপসারণের দাবিও জানান।
সরকার ‘ঢেলে সাজানো’ প্রয়োজন: জেলেনস্কি
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার আগে ইউক্রেনের প্রথম ডিজিটাল রূপান্তরবিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন ফেদোরভ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, ড্রোনযুদ্ধের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তথ্যনির্ভর কৌশল গ্রহণের জন্য তিনি প্রশংসিত হন। তবে প্রতিরক্ষা খাতের ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা ক্ষমতাকাঠামোর একটি অংশকে অসন্তুষ্ট করেছিল বলে তাঁর সমর্থকদের দাবি। সেনা নিয়োগব্যবস্থা সংস্কারে ধীরগতির জন্যও তিনি সমালোচিত হন।
রোববার নতুন মন্ত্রিসভার ঘোষণা দিয়ে জেলেনস্কি বলেন, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো ‘ঢেলে সাজানো’ প্রয়োজন। বুধবার তিনি বলেছিলেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে আরও বেশি সমন্বয় থাকা উচিত।
আজ সাংবাদিকদের কাছে ফেদোরভ অভিযোগ করেন, সেনাপ্রধান সিরস্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগে বাধা দিয়েছেন এবং নানা সমস্যা নিয়ে সরাসরি আলোচনা এড়িয়ে গেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘রাশিয়াকে কীভাবে পরাজিত করা যায়, তা নিয়ে কাজ করার বদলে তিনি দেশকে কীভাবে বিভক্ত করা যায়, সেটি বের করেছেন।’
আজ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ইউক্রেনের মন্ত্রিসভার রদবদল ক্রেমলিন পর্যবেক্ষণ করছে। তবে কিয়েভ শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত’ নিতে প্রস্তুত না হলে নতুন প্রধানমন্ত্রী বা প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না।
ইউক্রেনে নতুন প্রধানমন্ত্রী
আজ পার্লামেন্টের ভোটে ৪৮ বছর বয়সী সেরহি কোরেৎস্কি ইউক্রেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন পেয়েছেন। রোববার জেলেনস্কি তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন। পেশায় প্রকৌশলী ও অর্থনীতিবিদ কোরেৎস্কি এর আগে কখনো সরকারি দায়িত্ব পালন করেননি।
জ্বালানি খাতে দুই দশকের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে কোরেৎস্কির। ২০২৫ সালের মে মাস থেকে তিনি রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস কোম্পানি নাফতোগাজের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
এক্সে কোরেৎস্কি বলেছেন, তাঁর সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হবে সেনাবাহিনীকে প্রয়োজনীয় ড্রোন সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আগামী শীতের জন্য জ্বালানি অবকাঠামো প্রস্তুত রাখা।