যুক্তরাজ্যে সরকার কেন টেকে না

১০ ডাউনিং স্ট্রিট, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও বাসভবনছবি: রয়টার্স

অ্যান্টনি সেলডন, যুক্তরাজ্যের সর্বশেষ আটজন প্রধানমন্ত্রীর জীবনী লিখেছেন তিনি। নব্বইয়ের দশকে যখন তাঁর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়, তখন কাজটি বেশ গোছানোই ছিল। সে সময় ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের বাসিন্দারা টানা কয়েক বছর ক্ষমতায় থাকতেন। ফলে সেলডন বেশ সময় পেতেন, তাঁদের খুঁটিয়ে দেখার সুযোগ হতো। প্রধানমন্ত্রীদের প্রত্যেকেই তখন নিজ নিজ শাসনামলে নিজেদের ছাপ রেখে যাওয়ার সুযোগ পেতেন।

কিন্তু এখন ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আর পেরে উঠছেন না সেলডন। বিদায়ী রক্ষণশীল সরকারের সময় নেতাদের ঘন ঘন পরিবর্তন দেখা গেছে। মাত্র এক বছরেই দলটি তিনবার নেতা বদলায়। এ অস্থিরতার পর সেলডন আশা করেছিলেন, ২০২৪ সালে কিয়ার স্টারমারের জয় রাজনীতিতে পুরোনো ছন্দ ফিরিয়ে আনবে।

নির্বাচনে স্টারমারের লেবার পার্টি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আগামী এক দশক দেশ পুনর্গঠনে কাজ করবে। কিন্তু ক্ষমতায় বসার দুই বছর না পেরোতেই স্টারমারের এখন বিদায়ঘণ্টা বাজছে।

ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থীদের সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ভোটাররা। এখন স্টারমারের দলীয় সহকর্মীরাই তাঁকে বিদায় দিতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে।

ডাউনিং স্ট্রিটের ১০ নম্বর বাড়িতে স্টারমারের পূর্বসূরি ঋষি সুনাকের জীবনী আগামী আগস্টে প্রকাশ করার কথা রয়েছে সেলডনের। তত দিনে হয়তো নতুন আরেকজন প্রধানমন্ত্রী পেয়ে যাবে যুক্তরাজ্য। আর সেটি হলে তা হবে সাত বছরের মধ্যে ষষ্ঠবার প্রধানমন্ত্রী বদল।

৭২ বছর বয়সী সেলডনের আশঙ্কা, তাঁকে হয়তো চিরকাল এই ঘটনাপ্রবাহের পেছনেই দৌড়াতে হবে। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘শিগগিরই আমাকে হয়তো “১০ ডাউনিং স্ট্রিটে অ্যাঞ্জেলা রেনার” শিরোনামে কাজ শুরু করতে হবে।’ লেবার পার্টির আইনপ্রণেতা অ্যাঞ্জেলা রেনারকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্টারমারের সম্ভাব্য উত্তরসূরি মনে করা হচ্ছে।

১০ ডাউনিং স্ট্রিটের এই ঘন ঘন নেতা পরিবর্তনের দৃশ্য দেশের অনেককে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাজ্য কি তবে শাসন-অযোগ্য হয়ে পড়ছে?

সমস্যা একটি নয়, বেশ কয়েকটি। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দা থেকে দেশটি কখনোই পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এর পর থেকে মানুষের প্রকৃত মজুরি মূলত স্থবির হয়ে আছে। কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামলে মজুরি সম্প্রতি কিছুটা বেড়েছে।

যুক্তরাজ্যের রক্ষণশীল দলের সাবেক চার প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে, বরিস জনসন, লিজ স্ট্রাস ও ঋষি সুনাক
ছবি: কোলাজ

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) কারণে মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৮ শতাংশ কমে গেছে বলে ধারণা করা হয়। উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধিও বেশ শ্লথ। ঋণের বোঝাও ধীরে ধীরে বেড়েছে। এর ফলে গ্রুপ অব সেভেনের (জি-৭) সদস্যদেশগুলোর মধ্যে ব্রিটেনের সরকারি বন্ডের সুদহার এখন সর্বোচ্চ। এই জোটের দেশগুলোর মধ্যে শিল্প খাতে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যয়ও এখন ব্রিটেনে।

দেশটির নির্বাচনব্যবস্থায়ও ফাটল দেখা দিচ্ছে। ব্রিটেনের নির্বাচনব্যবস্থা মূলত ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পান, তিনিই বিজয়ী হন) পদ্ধতির। রাজনীতিতে দুটি প্রধান দল থাকলেই এই পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো কাজ করে। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে লেবার ও কনজারভেটিভ পার্টিই ছিল সেই প্রধান দুই শক্তি।

২০১০ সালে ডেভিড ক্যামেরনের পর ১৫ বছরে যুক্তরাজ্যে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে তিনজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তিত হয়েছিল।

কিন্তু এই দুই দল আধিপত্য হারানোয় যুক্তরাজ্যের রাজনীতি এখন বহুমাত্রিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ইংল্যান্ডে এটি এখন পাঁচমুখী লড়াই। আর স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে তা রূপ নিয়েছে ছয়মুখী লড়াইয়ে। ঐতিহ্যবাহী দল দুটিকে এখন বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপন্থী লিবারেল ডেমোক্র্যাটস, অতি প্রগতিশীল গ্রিনস এবং কট্টর ডানপন্থী রিফর্ম ইউকে।

পাশাপাশি স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের স্বাধীনতার পক্ষের জাতীয়তাবাদী দলগুলোও মাঠে আছে। এদের উত্থান শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের ভাঙনের কারণ হতে পারে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার
ফাইল ছবি : রয়টার্স

১৭০৭ সাল থেকে স্কটল্যান্ড এবং ১৫৩৬ সাল থেকে ওয়েলস যুক্তরাজ্যের অংশ।

এ রকম পাহাড়সম সমস্যার মুখে ব্রিটেনে অনেকেই এখন হতাশায় ভুগছেন। তাঁরা মনে করেন, দেশে এখন একটি ভালো সরকার গঠন করা প্রায় অসম্ভব। এই স্রোতের বিপরীতে যেকোনো নেতার পক্ষেই টিকে থাকা কঠিন।

কিন্তু সেলডন মনে করেন, এমন হতাশা আসলে স্টারমারের ব্যর্থতাকেই আড়াল করে। শুধু স্টারমার নন, তাঁর আগের অনুজ্জ্বল পূর্বসূরিদেরও দায়মুক্ত করে দেয়।

সিএনএনকে সেলডন বলেন, ‘ব্রিটেন কোনোভাবেই শাসন-অযোগ্য নয়। তবে সাম্প্রতিক কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী দেশটিকে শাসন-অযোগ্য করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।’

স্টারমারের পূর্বসূরি রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রীদের বেশ কিছু ধারাবাহিক ব্যর্থতা ধরা পড়ছে সেলডনের চোখে।

সেলডন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীদের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে তুলনা করেন। বরিস জনসনকে তিনি ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের সঙ্গে তুলনা করছেন। জনসন বড় সরকারব্যবস্থা এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলো নিয়ে ভাবতেন। তবে সেলডনের মতে, জনসন কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষাতেই রুজভেল্টের মতো ছিলেন, কাজে নয়।

ব্রিটেন কোনোভাবেই শাসন-অযোগ্য নয়। তবে সাম্প্রতিক কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী দেশটিকে শাসন-অযোগ্য করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।
অ্যান্টনি সেলডন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীদের জীবনীকার

এ তুলনার ধারাবাহিকতায় সেলডন বলেন, মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রতি তীব্র আদর্শিক ঝোঁকের কারণে লিজ ট্রাস ছিলেন ‘রিগ্যানপন্থী’ (সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের মতো নয়া উদারবাদী নীতিতে বিশ্বাসী)।

জনসনের সময়কার মাত্রাতিরিক্ত বিষয়গুলো বদলাতে চেয়েছিলেন ট্রাস। এ কারণে ২০২২ সালে তিনি একটি তহবিলবিহীন কর কমানোর পরিকল্পনা চালু করেন। এতে ব্রিটেনের আর্থিক বাজার প্রায় ধসের মুখে পড়েছিল।

ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ট্রাসকে উদ্ধার করতে রাজি হয়নি। ফলে মাত্র ৪৯ দিনের মাথায় কনজারভেটিভ পার্টি ট্রাসকে বিদায় করে। তিনি পরিণত হন যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদি প্রধানমন্ত্রীতে।

অন্যদিকে ঋষি সুনাক ছিলেন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও ছোট সরকারের ভক্ত। তাঁকে ‘হুভারপন্থী’ (হার্বার্ট হুভারের মতো) বলা যায়। তবে সেলডন মনে করেন, সুনাক যখন দায়িত্ব নেন, তত দিনে দেশের মানুষ রক্ষণশীলদের নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। লিজ ট্রাসের কারণেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। ফলে প্রথম ব্রিটিশ-এশীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে সুনাকের জেতার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না।

তবে স্টারমারকে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পুরোপুরি মেলানো যায় না। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের বদলে স্টারমারের মধ্যে একটি বিশেষ ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন দেখা যায়। সেলডনের চোখে, তাঁর মধ্যে ‘জিমি কার্টারের কিছু ছাপ রয়েছে’।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, স্টারমার সৎ, ভদ্র, বেশ গম্ভীর ও অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। কিন্তু পরিস্থিতি তাঁর কাছে খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা তাঁর আওতার বাইরে চলে গেছে।’
সেলডনের মতে, বর্তমান সময়ের জন্য স্টারমার যথেষ্ট ‘যোগ্য’ নন; বরং তিনি ঘটনাপ্রবাহের কাছে মার খাচ্ছেন এবং স্রোতের বিপরীতে লড়তে পারছেন না।

‘নাইট টাইম ইকোনমি সামিট’-এর একটি প্যানেল আলোচনায় গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। লিভারপুল, ব্রিটেন। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

গত সপ্তাহে স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফলের পর দলের বেশ কয়েকজন লেবার নেতা স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করেন। এর বদলে স্টারমার তাঁর সরকারকে নতুন করে ‘ঢেলে সাজানোর’ কথা বলছেন।

কিন্তু গত সোমবার দেওয়া ভাষণে স্টারমারের এই নতুন পরিকল্পনার রূপরেখা ছিল বেশ অস্পষ্ট। সেখানে মূলত তাঁর বর্তমান এজেন্ডারই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। সেলডন বলেন, ‘একটি ভাষণকে দিকনির্দেশনামূলক হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হলো। অথচ সেখানে নতুন কিছু নেই। এটা ছিল হতবাক করার মতো ব্যাপার।’

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেন আনসেলের মতে, স্টারমার এখন অনেকটা সেই চিকিৎসকের মতো হয়ে গেছেন, যিনি মুমূর্ষু রোগীর পাশে এসে কেবল আফসোস করেন। আর বলেন, ‘হায় ঈশ্বর, অবস্থা তো ভয়াবহ। কারও কিছু একটা করা উচিত।’

আনসেল সিএনএনকে বলেন, গত প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থেকেও স্টারমার বোঝাতে পারেননি, তিনি ব্রিটেনকে সুস্থ করতে কী ‘কঠিন ওষুধ’ প্রয়োগ করবেন।

ডেভিড ক্যামেরন বিদায় নেওয়ার পর আর কোনো প্রধানমন্ত্রীই থিতু হচ্ছেন না
ফাইল ছবি: এএফপি

২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় স্টারমার প্রধান তিনটি খাত থেকে কর বাড়ানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। এর ফলে তাঁর সরকার অর্থনৈতিকভাবে চাপে পড়ে যায়। বাধ্য হয়ে তাদের ছোট ও রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় খাত থেকে রাজস্ব খুঁজতে হচ্ছে।

আনসেল বলেন, ‘সরকার প্রথমে কিছু “খলনায়ক” বেছে নেয়, যেমন বেসরকারি স্কুল, কৃষক ও ব্যাংক। এরপর তাদের ওপর করের বোঝা চাপায়। কিন্তু তাতেও খুব একটা লাভ হয়নি। অন্যের জন্য ভালো কিছু করার মতো যথেষ্ট অর্থ সরকার তুলতে পারেনি। উল্টো তারা বন্ধু বানানোর চেয়ে শত্রুই বেশি বানিয়েছে।’

আনসেল মনে করেন, স্টারমারের যদি একটি জোরালো রাজনৈতিক গল্প থাকত, তবে এসব নীতিগত ভুল হয়তো মাফ করা যেত।

ব্রিটেনে একটি ভালো গল্প অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে, এমনকি তা দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিলেও। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন যখন দেশের রুগ্ণ অবস্থার দায়িত্ব নেন, তখন তাঁর রোগনির্ণয় ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেছিলেন, আগের লেবার সরকার মাত্রাতিরিক্ত খরচ করেছে। তাই ব্রিটেনের আর্থিক স্বাস্থ্য ফেরাতে বেশ কিছুদিন কঠোর ব্যয় সংকোচনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক
ফাইল ছবি: এএফপি

কিন্তু রক্ষণশীলেরা ব্যয় সংকোচন করে প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটতে পারেনি। ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্য ছিল ব্রিটেনের ঋণ কমানো এবং পুনরুদ্ধারকে ত্বরান্বিত করা। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই তা ব্যর্থ হয়। ঋণ বহুগুণ বেড়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

তবু আনসেলের মতে, ক্যামেরন তাঁর প্রথম মেয়াদে বারবার একই বার্তা দিয়ে গেছেন। তিনি জনগণকে বুঝিয়েছেন, খরচ কমানো প্রয়োজন। নির্বাচনের আগের বছর কিছুটা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে এই বার্তার জোরেই তিনি ২০১৫ সালে পুনরায় নির্বাচিত হন।

এর বিপরীতে, জনগণকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মতো স্টারমারের কোনো সুনির্দিষ্ট বার্তা ছিল না। তিনি ‘পরিবর্তনের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই পরিবর্তন কী বা কীভাবে আসবে, তা নির্দিষ্ট করে বলেননি। সেলডনের ভাষায়, ‘প্রধানমন্ত্রী হলেন জাতির প্রধান গল্পকার। আর স্টারমারের কাছে বলার মতো কোনো গল্পই কখনো ছিল না।’

একজন ভালো বিক্রেতা?

এরপরও স্টারমারের সরকার খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে পারে। তিনি পণ করেছেন যে পদত্যাগ করবেন না। রক্ষণশীলদের আমলে যে ‘বিশৃঙ্খলা’ তৈরি হয়েছিল, ব্রিটেনকে তিনি আবার সেই দিকে ঠেলে দেবেন না। কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন, ইংলিশ ফুটবল ক্লাবগুলো যেমন ঘন ঘন ম্যানেজার বদলাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে, ব্রিটেনও তেমনি প্রধানমন্ত্রী বদলানোর ‘নেশায়’ পড়েছে।

অন্যদিকে স্টারমারের মিত্ররা তুলে ধরছেন, যুক্তরাজ্য কীভাবে আগের চেয়ে ভালো করছে। এই সপ্তাহে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) চিকিৎসাসেবা নেওয়ার অপেক্ষমাণ রোগীর তালিকা রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। রক্ষণশীলদের আমলে এ তালিকা অনেক দীর্ঘ হয়েছিল।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং চলতি সপ্তাহে পদত্যাগ করেছেন। নেতৃত্ব নির্ধারণের যেকোনো লড়াইয়ে স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ করার ঘোষণা দেওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন। স্ট্রিটিং জানিয়েছেন, এনএইচএস তার ইতিহাসে ‘সবচেয়ে দ্রুত সময়ে অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা কমানোর’ পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে কম সময়ের প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস
ফাইল ছবি: রয়টার্স

অনেকেই আবার বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাজ্যের হারানো গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার কৃতিত্ব স্টারমারকে দিচ্ছেন। ব্রেক্সিট নিয়ে ইউরোপের সঙ্গে বছরের পর বছর চলা বৈরী সম্পর্কের পর তিনি এই ইতিবাচক ভাবমূর্তি ফিরিয়ে এনেছেন।

স্টারমারের মিত্রদের অভিযোগ, দেশের পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষ তা জানে না বা তাদের এ নিয়ে আগ্রহ নেই। এর বদলে তারা রিফর্ম বা গ্রিন পার্টির মতো দলগুলোর বোলচালে ভুলছে। স্টারমারের মতে, এসব দল যুক্তরাজ্যকে একটি ‘ভয়ংকর অন্ধকার পথে’ নিয়ে যেতে পারে।

টোরি ও লেবার পার্টি আধিপত্য হারানোয় যুক্তরাজ্যের রাজনীতি এখন বহুমাত্রিক লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ইংল্যান্ডে এটি এখন পাঁচমুখী লড়াই। আর স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসে তা রূপ নিয়েছে ছয়মুখী লড়াইয়ে।

তবে একজন প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই তাঁর অর্জনগুলো জনগণকে অনুভব করাতে হয়। আনসেলের মতে, ‘আপনি যদি একজন খারাপ বিক্রেতা হন, তবে আপনার পণ্য যত ভালো বা নিরাপদই হোক না কেন, তা বিক্রি করতে গেলে পরিস্থিতি খারাপই হবে।’

স্টারমারের এই সংগ্রাম নিয়ে ব্রিটেন হয়তো একটু বেশি বেশিই করছে। তবে আনসেলের মতে এখানে রহস্যের কিছু নেই। তিনি বলেন, ‘তেমন কোনো ক্যারিশমা না থাকা একজন মানুষ, যিনি নিজের কাজ মানুষের কাছে ঠিকমতো তুলে ধরতে পারেন না, তিনি স্বভাবতই জনসমর্থন টানতে ব্যর্থ হবেন। ফলে জনগণের কাছে ব্যাপকভাবে অপছন্দের পাত্রে পরিণত হবেন। এটা কি যৌক্তিক? আমি জানি না। তবে জনগণ এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী হলেন জাতির প্রধান গল্পকার। আর স্টারমারের কাছে বলার মতো কোনো গল্পই কখনো ছিল না।
অ্যান্টনি সেলডন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীদের জীবনীকার

নির্বাচনের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে লেবার পার্টির অনেক আইনপ্রণেতা এখন আরও ভালো কোনো নেতার কিংবা বলা চলে ভালো বিক্রেতার খোঁজ করছেন। তাঁদের চোখ এখন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের লেবার পার্টির মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামের দিকে। বেশির ভাগ জরিপে তাঁকেই ব্রিটেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিক হিসেবে দেখা যায়।

স্টারমারের বিরুদ্ধে যেখানে দূরদর্শিতার অভাবের অভিযোগ রয়েছে, সেখানে বার্নহ্যাম ‘ম্যানচেস্টারিজম’ বা ম্যানচেস্টারবাদের প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত। এটি মূলত ব্যবসাবান্ধব সমাজতন্ত্রের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী রূপ, যা জরুরি সেবাগুলোকে পুনরায় সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনার কথা বলে। তাঁর নীতির কারণেই ম্যানচেস্টার আজ দেশের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল শহরে পরিণত হয়েছে।

তবে ডাউনিং স্ট্রিটে যাওয়ার জন্য বার্নহ্যামের পথ যথেষ্ট কঠিন ও অনিশ্চিত। লেবার পার্টির নেতৃত্বে স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে প্রথমে তাঁকে পার্লামেন্টের একটি আসনে জয়ী হতে হবে।

আরও পড়ুন
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এখন রয়েছেন প্রবল চাপে
ছবি: রয়টার্স

বার্নহ্যামের জন্য পথ প্রশস্ত করার আশায় গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেকারফিল্ড এলাকার একজন লেবার এমপি চলতি সপ্তাহে পদত্যাগ করেছেন। এর ফলে সেখানে একটি উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এই উপনির্বাচনে রিফর্ম পার্টির প্রার্থীর মুখোমুখি হবেন বার্নহ্যাম।

এই নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক বেশি। স্টারমারের ওপর থেকে ভরসা হারিয়ে ফেলা লেবার পার্টির জন্য ম্যানচেস্টারের বার্নহ্যাম এখন শেষ ভরসা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

এই উপনির্বাচনে বার্নহ্যাম যদি রিফর্ম পার্টির কাছে হেরে যান, তবে আগামী কয়েক বছরের জন্য লেবার পার্টির নির্বাচনী সম্ভাবনার কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হয়ে যেতে পারে। আর তা ব্রিটেনকে স্টারমারের সতর্ক করা সেই ‘অন্ধকার পথে’ আরও ঠেলে দেবে। তখন সত্যিই হয়তো ব্রিটেন শাসন-অযোগ্য হয়ে পড়বে।