২২ বছরের ঘর, স্বামীর কবর—সবই কি ছেড়ে যেতে হবে ৭৮ বছর বয়সী জয়েসকে

২২ বছর পর ব্রেক্সিটের নিয়মে সুইডেন থেকে বহিষ্কার হওয়ার মুখে ৭৮ বছর বয়সী জয়েস থমাসছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

সকালে ঘুম থেকে উঠেই জয়েস থমাসের মনে হয়, আজ কী হবে? রাতে ঘুম আসে না, খাবারেও আর আগের মতো রুচি নেই। ৭৮ বছর বয়সে এসে জীবনের সবচেয়ে কঠিন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন তিনি।

যে সুইডেনে স্বামীর সঙ্গে ২২ বছর আগে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন, এখন সেই দেশই জয়েসকে চলে যেতে বলছে।

অবসরপ্রাপ্ত নার্স জয়েস থমাস একজন ব্রিটিশ নাগরিক। তিন বছর আগে ক্যানসারে স্বামী মারা গেছেন। এরপরও সুইডেনেই থেকে গেছেন জয়েস। এখানে তাঁর ছেলে, নাতি-নাতনি, বন্ধু—সবকিছু। এমনকি স্বামীর কবরটিও।

কিন্তু ব্রেক্সিট-পরবর্তী একটি আবেদনের জটিলতায় এখন বৃদ্ধ জয়েসকে সুইডেন ছাড়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। স্বামীর কবরটিও ছেড়ে যেতে হতে পারে তাঁকে।

সুইডেনের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্য বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) পর দেশটিতে (সুইডেনে) বসবাসের জন্য জয়েস ও তাঁর স্বামীর আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করা উচিত ছিল। সেই আবেদন তাঁরা করেননি।

সুইডেনের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ বলছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্য বেরিয়ে যাওয়ার পর দেশটিতে (সুইডেনে) বসবাসের জন্য জয়েস ও তাঁর স্বামীর আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করা উচিত ছিল। সেই আবেদন তাঁরা করেননি।

সুইডেনে নিজের বাড়ি থেকে বিবিসিকে জয়েস বলেছেন, তাঁরা জানতেনই না যে এমন কোনো আবেদন করতে হবে।

জয়েসের ভাষ্য, ‘এটা একেবারে নরকের মতো। আমি ঘুমাতে পারছি না, খেতে পারছি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারি না, কী হতে যাচ্ছে।’

স্বেচ্ছায় সুইডেন ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য ৮ সেপ্টেম্বর ছিল জয়েসের শেষ সময়।

হঠাৎ অনিশ্চয়তা

২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ থেকে বেরিয়ে যায়। ফলে যুক্তরাজ্যের নাগরিকেরা আর ইইউর নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হননি। তাই আগের মতো বসবাসের অধিকার নিয়ে সুইডেনে থাকা তাঁদের জন্য আর সম্ভব ছিল না।

যুক্তরাজ্য সুইডেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশীদার। আমরা চাই, সুইডেনে বসবাস ও কর্মরত ব্রিটিশ নাগরিকেরা যেন এখানেই থাকতে পারেন।
—ইয়োহান ফোরসেল, সুইডেনের অভিবাসনমন্ত্রী

তবে যুক্তরাজ্য ও ইইউর মধ্যে করা চুক্তির আওতায় একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। সেই সময় ব্রিটিশ নাগরিকেরা সুইডেনে থাকার জন্য বসবাসের মর্যাদার আবেদন করতে পারতেন। এ আবেদনের সময় শেষ হয় ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর। জয়েস ও তাঁর স্বামী সেই আবেদন করেননি।

জয়েস বলেন, তাঁরা জানতেনই না যে আবেদন করা প্রয়োজন। ২০২৩ সালে সুইডেনে ফিরে আসার চেষ্টা করার সময় প্রথমবার বিষয়টি জানতে পারেন তিনি। এরপর শুরু হয় আবেদন আর আপিলের দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

আবেদন, আপিল—তবু সমাধান হয়নি

সুইডেনে বসবাসের অধিকার ধরে রাখতে জয়েস একাধিকবার আবেদন করেছেন। সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলও করেছেন। কিন্তু একের পর এক তাঁর আবেদন ও আপিল প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

গত মাসে সুইডেনের অভিবাসনসংক্রান্ত সরকারি সংস্থা মাইগ্রেশনসভেরকেট জয়েসকে জানিয়েছে, স্বেচ্ছায় তাঁর দেশ ছাড়ার সময়সীমা এ বছরের ৮ সেপ্টেম্বর।

অবসরপ্রাপ্ত নার্স জয়েস থমাস একজন ব্রিটিশ নাগরিক। তিন বছর আগে ক্যানসারে স্বামী মারা গেছেন। এরপরও সুইডেনেই থেকে গেছেন। এখানে তাঁর ছেলে, নাতি-নাতনি, বন্ধু—সবকিছু। এমনকি স্বামীর কবরটিও। কিন্তু ব্রেক্সিট-পরবর্তী একটি আবেদনের জটিলতায় এখন তাঁকে সুইডেন ছাড়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

অর্থাৎ জয়েস ২২ বছর ধরে যে দেশে বসবাস করছেন, সেখান থেকে তাঁকে এখন চলে যেতে হবে। তাঁর আইনজীবীরা বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। এখন সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন জয়েস।

দেশ ছাড়তে হলে শুধু একটি দেশই ছাড়তে হবে না জয়েসকে; ছেড়ে যেতে হবে তাঁর পরিবার, বন্ধু এবং স্বামীর কবর। এ ভাবনাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি পীড়া দিচ্ছে।

জয়েস বলেন, ‘আমি ক্লান্ত, সত্যিই আমি ক্লান্ত। আর আমি তো এখন তরুণ নই। সহানুভূতি কোথায়? আমি এখানে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাস করছি। এখানে আমার বন্ধু আছে, পরিবার আছে।’

একা নন জয়েস

জয়েসের বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ব্রেক্সিটের পর সুইডেনে বসবাসকারী আরও কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিক একই ধরনের জটিলতার মুখে পড়েছেন।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুইডেন থেকে যুক্তরাজ্যের ২ হাজার ৪৯০ জন নাগরিককে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যদেশে ওই সময়ে দেশ ছাড়ার নির্দেশ পাওয়া ৭ হাজার ৫০০-এর বেশি ব্রিটিশ নাগরিকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই সুইডেনপ্রবাসী।

এটা একেবারে নরকের মতো। আমি ঘুমাতে পারছি না, খেতে পারছি না। সকালে ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারি না, কী হতে যাচ্ছে।
—জয়েস থমাস, সুইডেনে বহিষ্কারের মুখোমুখি হওয়া ব্রিটিশ নাগরিক

সুইডেনের মাইগ্রেশনসভেরকেট জয়েসের ঘটনা প্রসঙ্গে তাঁর সম্মতি ছাড়া মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ব্রিটিশ নাগরিকদের কতজন বর্তমানে বহিষ্কারের ঝুঁকিতে রয়েছেন, সে প্রশ্নেরও উত্তর দেয়নি সংস্থাটি।

তবে গত সপ্তাহে দ্য গার্ডিয়ানকে সংস্থাটি জানিয়েছে, ব্রেক্সিটের পর থেকে ৪৫৮ জন ব্রিটিশ নাগরিককে সুইডেন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে অথবা জোর করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দুই দশক পরও দেশ ছাড়ার হুমকি

গত মাসে একটি পরিবার বিবিসিকে জানিয়েছিল, তাদের বাবাকেও সুইডেন থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ওই ব্যক্তি ডিমেনশিয়া ও ভাসকুলার পারকিনসনিজমে আক্রান্ত। সুইডেনে একটি পরিচর্যাকেন্দ্রে পূর্ণকালীন চিকিৎসা ও সেবা নিচ্ছেন তিনি। দেশটিতে বসবাস করছেন দুই দশকের বেশি সময় ধরে।

সুইডেনের অভিবাসনমন্ত্রী ইয়োহান ফোরসেল অবশ্য বলেছেন, বর্তমান নিয়মের কাঠামোটি আগের সরকার চালু করেছিল। বর্তমান সরকার পরিস্থিতিটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে।

অভিবাসনমন্ত্রী বিবিসিকে বলেন, ‘যাঁরা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের জন্য প্রক্রিয়াটি সহজ করতে আমরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারি কি না, তা সরকার খতিয়ে দেখবে।’

জয়েস থমাসের ঘটনা নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি মন্ত্রী। তবে তিনি বলেছেন, ‘সরকার মনে করে, নিয়মগুলো উদারভাবে প্রয়োগ করা উচিত।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘যুক্তরাজ্য সুইডেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশীদার। আমরা চাই, সুইডেনে বসবাস ও কর্মরত ব্রিটিশ নাগরিকেরা যেন এখানে থাকতে পারেন।’ এ ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, তা বুঝতে সংশ্লিষ্ট সুইডিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকার আলোচনা করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

জয়েসের পাশে বিরোধীদলীয় এমপি

জয়েস থমাসের নির্বাচনী এলাকার বিরোধী দল ভ্যানস্টেরপারিয়েটের (দ্য লেফট পার্টি) আইনপ্রণেতা (এমপি) হোকান সভেনেলিং সরকারের অভিবাসননীতির সমালোচনা করেছেন। তিনি এটিকে সরকারের ‘অমানবিক অভিবাসননীতি’ বলে আখ্যা দেন।

হোকান সভেনেলিং বিবিসিকে বলেন, ‘এ কারণেই আমি আশা করি, রোববারের সুইডিশ নির্বাচন একটি মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত হবে। বিরোধীরা সরকার গঠন করতে পারবে এবং অভিবাসননীতি পরিবর্তন করবে, যেন জয়েস এবং সুইডেনের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক থাকা অন্য ব্রিটিশ নাগরিকেরা এখানে থাকতে পারেন।’

এদিকে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়নবিষয়ক দপ্তরও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘সুইডিশ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যালোচনা করবে, তাদের এমন বক্তব্যকে আমরা স্বাগত জানাই। এ বিষয়ে তাদের সহযোগিতা করতে আমরা প্রস্তুত।’

কিন্তু জয়েসের জন্য আর সময় নেই। যে দেশে ২২ বছর আগে স্বামীর হাত ধরে এসেছিলেন, সেই সুইডেনে তাঁর জীবনের কত গল্প জমে আছে। এখানেই গড়ে উঠেছে তাঁর সংসার। হারিয়েছেন জীবনসঙ্গীও। এখানেই ছেলে, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। এখানেই মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছেন তাঁর স্বামী। তাই সুইডেন ছেড়ে যাওয়া জয়েসের কাছে শুধু একটি দেশ ছেড়ে যাওয়া নয়; যেন নিজের জীবনেরই এক বড় অংশ পেছনে ফেলে যাওয়া।