হিন্দু গোষ্ঠীর পরিদর্শনের সময় নারী কর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে ধর্মঘট, আইফেল টাওয়ার বন্ধ

ফ্রান্সের প্যারিসের আইফেল টাওয়ার। সোমবার সকালে সেখানে থাকা সাইনবোর্ডে লেখা ছিল—কার্যক্রম পরিচালনাসংক্রান্ত কারণে আইফেল টাওয়ার খুলতে দেরি হচ্ছে। ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ছবি: রয়টার্স

কর্মীদের ধর্মঘটের কারণে গতকাল সোমবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের বিখ্যাত স্থাপনা আইফেল টাওয়ার দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ ছিল।

একটি হিন্দুধর্মীয় গোষ্ঠীর পরিদর্শনকালে আইফেল টাওয়ারের নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে সহকর্মীরা এই ধর্মঘট পালন করেন। কর্মী ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত শনিবার হিন্দুধর্মীয় গোষ্ঠী বোচাসনবাসী অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামীনারায়ণ সংস্থার (বিএপিএস) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১০০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল আইফেল টাওয়ার দেখতে যায়।

একই দিন এই আধ্যাত্মিক সংগঠনের উদ্যোগে সেন নদীতে একটি সাংস্কৃতিক নৌযাত্রার আয়োজন করা হয়েছিল বলে জানায় এএফপি।

গত শনিবার হিন্দুধর্মীয় গোষ্ঠী বোচাসনবাসী অক্ষর পুরুষোত্তম স্বামীনারায়ণ সংস্থার (বিএপিএস) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১০০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল আইফেল টাওয়ার দেখতে যায়।

শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি দিয়েন দাভোয়েন রয়টার্সকে বলেন, প্রতিনিধিদলটি যখন সেখান দিয়ে যাচ্ছিল, তখন নারী কর্মীদের তাঁদের কর্মস্থল ছেড়ে দিতে বলা হয়েছিল, যাতে তাঁদের জায়গায় পুরুষেরা দায়িত্ব নিতে পারেন।

দিয়েন দাভোয়েন আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ে সপ্তাহান্তজুড়ে উত্তেজনা বাড়ে। তাই গতকাল সকালে কর্মীরা বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নেন। এর উদ্দেশ্য প্রথমত, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে যেন এই প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীদের আর কখনো এমন আচরণের শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করা।

এএফপি জানায়, পরে এক বিবৃতিতে আইফেল টাওয়ারের কর্মীরা ওই হিন্দু ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদলের পরিদর্শনকালে শুধু লিঙ্গগত কারণে নারী কর্মীদের সরিয়ে দেওয়া, তাঁদের জায়গায় অন্যদের দায়িত্ব দেওয়া, তাঁদের (নারী কর্মী) আড়ালে রাখার পেশাগত নির্দেশনার নিন্দা জানান।

এটি স্পষ্টতই গ্রহণযোগ্য আচরণ নয়। তিনি আবার স্পষ্ট করে বলছেন, আইফেল টাওয়ার কর্তৃপক্ষ ফ্রান্সের প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নারী-পুরুষের সমতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।
অ্যারিয়েল ওয়েইল, এসইটিইর প্রেসিডেন্ট

বিবৃতিতে বলা হয়, আইফেল টাওয়ারের নারী কর্মীদের এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মীদের এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, ওই প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানানোর সময় তাঁরা যেন আড়ালে চলে যান। কয়েকজনকে তাঁদের কর্মস্থল ছেড়ে অন্য এলাকায় সরে যেতে বলা হয়েছিল। কর্মস্থলের কয়েকটি জায়গায় নারীদের পরিবর্তে পুরুষদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আর প্রতিনিধিদলটি সেখানে অবস্থান করার সময় সব নারী কর্মীকে নির্দিষ্ট কিছু এলাকা দিয়ে যাতায়াত বা সেসব এলাকা অতিক্রম না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হওয়ায় কর্মীরা হতবাক হয়েছেন।

প্যারিসের এই বিখ্যাত স্থাপনাটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এসইটিই পরে বলেছে, হিন্দু প্রতিনিধিদলটি এমনভাবে এই পরিদর্শন আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছিল, যাতে তাদের সঙ্গে নারীদের যোগাযোগ সীমিত রাখা যায়।

প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে, তাদের এ ধরনের শর্ত মেনে নেওয়া উচিত হয়নি।

প্যারিসের এই বিখ্যাত স্থাপনাটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এসইটিই পরে বলেছে, হিন্দু প্রতিনিধিদলটি এমনভাবে এই পরিদর্শন আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছিল, যাতে তাদের সঙ্গে নারীদের যোগাযোগ সীমিত রাখা যায়। প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে, তাদের এ ধরনের শর্ত মেনে নেওয়া উচিত হয়নি।

প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, এই শর্তগুলো এসইটিইর মূল্যবোধসহ নারী-পুরুষের সমতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এ ঘটনার ‘পরিণতি’ মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এসইটিইর প্রেসিডেন্ট অ্যারিয়েল ওয়েইল এএফপিকে বলেন, এটি স্পষ্টতই গ্রহণযোগ্য আচরণ নয়। তিনি আবার স্পষ্ট করে বলছেন, আইফেল টাওয়ার কর্তৃপক্ষ ফ্রান্সের প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নারী-পুরুষের সমতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।

এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার বলেন, এ ঘটনায় যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত শুরু করা হবে। কর্মীদের ক্ষোভের বিষয়ে তিনি অবগত আছেন। তাঁদের অসন্তোষকে তিনি যৌক্তিক বলে মনে করেন।

গ্রেগোয়ার আরও লেখেন, এই প্রতিবাদের পেছনের ঘটনাগুলো সম্পর্কে দ্রুত পুরো সত্য উদ্‌ঘাটন করা জরুরি।

কার্যক্রম পরিচালনাসংক্রান্ত কারণে আইফেল টাওয়ার খুলতে দেরি হওয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়। ফ্রান্সের প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

প্যারিসের উপকণ্ঠে একটি হিন্দু মন্দিরের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবে অংশ নিতে বিএপিএসের প্রতিনিধিরা ফ্রান্সে ছিলেন। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, তাদের প্রতিনিধিদলে সদস্যসংখ্যা বেশি ছিল। এ কারণে অন্য দর্শনার্থীদের অসুবিধা এড়াতে আইফেল টাওয়ার খোলার সময়ের শুরুতেই এই পরিদর্শনের আয়োজন করা হয়েছিল। তাদের জানামতে, কোনো পর্যায়েই কাউকে আইফেল টাওয়ারে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়নি। তবু কারও মনে কষ্ট বা কোনো ধরনের অসুবিধা হয়ে থাকলে তারা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।

ফ্রান্সের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট ইয়ায়েল ব্রাউন-পিভে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ‘অন্যদের স্বাগত জানানো মানে কখনোই আমাদের মূল্যবোধ বিসর্জন দেওয়া নয়। ফ্রান্সে নারীরা জনজীবনে পুরোপুরি সক্রিয়। কেউ তাঁদের অদৃশ্য হয়ে যেতে বলতে পারে না।’

ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ দর্শনার্থী আইফেল টাওয়ার দেখতে আসেন। গতকাল সারা দিনই আইফেল টাওয়ার বন্ধ ছিল। তবে এক কর্মী প্রতিনিধির ভাষ্য অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার এটি স্বাভাবিক নিয়মে খুলবে।

আইফেল টাওয়ারের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ দর্শনার্থী স্থাপনাটি দেখতে আসেন।

অন্যদের স্বাগত জানানো মানে কখনোই আমাদের মূল্যবোধ বিসর্জন দেওয়া নয়। ফ্রান্সে নারীরা জনজীবনে পুরোপুরি সক্রিয়। কেউ তাঁদের অদৃশ্য হয়ে যেতে বলতে পারে না।
ইয়ায়েল ব্রাউন-পিভে, ফ্রান্সের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট

গতকাল সারা দিনই আইফেল টাওয়ার বন্ধ ছিল। তবে এক কর্মী প্রতিনিধির ভাষ্য অনুযায়ী, আজ এটি স্বাভাবিক নিয়মে খুলবে।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএপিএস ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির ঘনিষ্ঠ সংগঠন। প্যারিসের কাছে সংগঠনটি একটি বড় মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছে। গত রোববার সেটির উদ্বোধন ছিল।

আরও পড়ুন