যুক্তরাজ্যে জিতলেন অ্যান্ডি বার্নহাম, তাহলে কি সরতেই হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী স্টারমারকে

# উত্তর ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টারি এক আসনে বার্নহাম জয়ী হয়েছেন।

# বার্নহামের বিজয় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ জানানোর পথ সুগম করল।

# নতুন এই এমপি যেকোনো নেতৃত্ব নির্বাচনের লড়াইয়ে জেতার জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় মুখ।

# নেতৃত্বের যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে লড়াই করার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন স্টারমার।

যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির নবনির্বাচিত এমপি অ্যান্ডি বার্নহাম ফল ঘোষণার পর বিজয়ী বক্তব্য দিচ্ছেন। ১৯ জুন ২০২৬, উইগানছবি: রয়টার্স

যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টির মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম উত্তর ইংল্যান্ডের একটি পার্লামেন্টারি আসনে উপনির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পথ তৈরি করেছেন তিনি। ৬০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে প্রভাবশালী স্থানীয় নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

‘কিং অব দ্য নর্থ’ (উত্তরের রাজা) হিসেবে পরিচিতি পাওয়া গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র বার্নহাম উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের মেকারফিল্ড আসনের নির্বাচনে ৫৪ দশমিক ৮০ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে নাইজেল ফারাজের পপুলিস্ট ‘রিফর্ম ইউকে’ পার্টির প্রার্থী ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন।

বার্নহামের এই বিজয়ের অর্থ হচ্ছে, তিনি এখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্টারমারকে পরিবর্তনের লক্ষ্যে দলের ভেতরের নেতৃত্ব নির্বাচনের লড়াই শুরু করতে পারবেন অথবা নিজে তাতে অংশ নিতে পারবেন। স্টারমার বর্তমানে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম সর্বনিম্ন জনপ্রিয়তা নিয়ে লড়াই করছেন। তবে মূল প্রশ্ন হলো, বার্নহাম কখন এবং কীভাবে তাঁকে সরানোর কাজ করবেন।

জয়ের পর বক্তৃতায় বার্নহাম বলেন, এই ফলাফল যুক্তরাজ্যের রাজনীতির জন্য ‘মোড় পরিবর্তনকারী এক মুহূর্ত’ হতে পারে। তিনি তাঁর দলকে উদ্দেশ করে বলেন, এটিই দিক পরিবর্তনের শেষ সুযোগ।

বার্নহাম বলেন, ‘আমাদের এটি শুনতে হবে, এর ওপর কাজ করতে হবে এবং সঠিকভাবে করতে হবে। দ্বিতীয় আর কোনো সুযোগ পাওয়া যাবে না।’

বার্নহাম একজন পেশাদার রাজনীতিবিদ। তিনি অতীতে গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক খাতগুলোকে রাষ্ট্রীয়করণের পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিগত চার দশকের ‘ব্যর্থ নব্য-উদারনৈতিক অর্থনীতি’–এর সমালোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি স্টারমারের জায়গা নিতে এবং রাজনীতিতে পরিবর্তন আনতে চান।

জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ৫৬ বছর বয়সী বার্নহাম লেবার পার্টির সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ, যিনি দলের সদস্যদের ভোটে যেকোনো নেতৃত্ব নির্বাচনে অনায়াসে জয়ী হবেন। অন্যদিকে কিছু লেবার আইনপ্রণেতা (এমপি) আশা করছেন, একটি ক্ষতিকর দ্বন্দ্ব এড়াতে স্টারমারকে হয়তো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি করানো যেতে পারে।

স্টারমারের ওপর বাড়ছে চাপ

জাতীয় নির্বাচনে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হওয়ার মাত্র দুই বছর পর ৬৩ বছর বয়সী স্টারমারের জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে। বিভিন্ন কেলেঙ্কারি, নীতিগত ইউ-টার্ন (সিদ্ধান্ত বদল) এবং সিদ্ধান্তহীনতার অভিযোগ তাঁর সেই ‘পরিবর্তন’ আনার প্রতিশ্রুতিকে ব্যাহত করেছে।

গত মাসে স্থানীয় নির্বাচনে দলের বড় পরাজয়ের পর থেকে স্টারমারের দলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আইনপ্রণেতা তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছেন। এমনকি প্রতিরক্ষা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতো শীর্ষস্থানীয় সহকর্মীরাও তাঁর নেতৃত্বের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে পদত্যাগ করেছেন।

তবে নিজের অবস্থানে অনড় থেকে স্টারমার চলতি সপ্তাহে বলেছেন, যেকোনো নেতৃত্ব নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। একই সঙ্গে তিনি একটি তিক্ত ও বিভাজনমূলক নেতৃত্ব নির্বাচনের সম্ভাব্য ‘বিশৃঙ্খলা’ সম্পর্কে তাঁর দলকে সতর্ক করেছেন।

তবে আজ শুক্রবার ভোরের দিকে নির্বাচনের ফলাফল জানার জন্য জেগে থাকা লেবার পার্টির এক এমপি বলেন, বার্নহামের এই বিশাল বিজয়ের অর্থ হলো স্টারমারের বিদায় এখন অনিবার্য। একমাত্র সন্দেহ কেবল সময় এবং তিনি কীভাবে ক্ষমতা ছাড়বেন—তা নিয়ে।

‘সব শেষ’—ওই আইনপ্রণেতা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন।

বার্নহামের অন্যতম প্রধান সহযোগী ও সংস্কৃতিমন্ত্রী লিসা নন্দী সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি আশা করছেন বার্নহাম ও স্টারমার শিগগিরই কথা বলবেন। নন্দী নিজে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার সম্ভাবনা নাকচ করে দিলেও বলেন, তিনি অন্য মন্ত্রীদের পক্ষে কথা বলতে পারবেন না।

এসব বিষয় নিয়ে স্টারমারের কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্টারমারের আরেক প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং চলতি সপ্তাহে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে থেকে পদত্যাগের সময় ঘোষণা না করলে তিনি শিগগিরই নেতৃত্ব নির্বাচনের লড়াইয়ের ডাক দিতে বাধ্য করবেন।

বার্নহাম ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, যেকোনো নেতৃত্ব নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

লেবার পার্টির নিয়ম অনুযায়ী, দলীয় নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে পার্লামেন্টারি পার্টির ২০ শতাংশ বা ৮১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন লাগে।

স্টারমার অপসারিত হলে বা চলে গেলে যুক্তরাজ্যের জনগণ প্রায় এক দশকের মধ্যে সপ্তম প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে পাবেন। গত দুই শতাব্দীর মধ্যে এটিই হচ্ছে সবচেয়ে দ্রুততম সরকার পরিবর্তন। জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, জনসেবার মান বৃদ্ধি ও অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়া নেতাদের এভাবেই শাস্তি দিচ্ছেন যুক্তরাজ্যের ভোটাররা।

লেবার পার্টির একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে, ১১ মে ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

‘অপেক্ষমাণ প্রধানমন্ত্রীর’ মতো নির্বাচনী প্রচার

মাসব্যাপী নির্বাচনী প্রচারের সময় বার্নহাম এমন আচরণ করেছেন, যেন তিনি একজন ‘অপেক্ষমাণ প্রধানমন্ত্রী’, যিনি প্রায়শই সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সরকারের নীতি ব্যাখ্যা করছিলেন।

বার্নহাম বারবার আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন, তিনি সরকারের আর্থিক নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলবেন, যাতে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত না হন।

অথচ গত বছর বার্নহাম বলেছিলেন, যুক্তরাজ্য বন্ড মার্কেটের কাছে ‘বন্ধক’ রয়েছে। তাঁর এই মন্তব্যে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, তিনি সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দেবেন। অবশ্য পরে তিনি বলেছিলেন, তাঁর সেই বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

বার্নহামের এই বিজয়ে পাউন্ডের মূল্যে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। কারণ, বিনিয়োগকারীরা আগেই এই ফলাফলের পূর্বাভাস পেয়েছিলেন।

রাজনৈতিক ইতিহাসবিদরা বলছেন, ১৯৬৩ সালের পর মেকারফিল্ডের এই নির্বাচন যুক্তরাজ্যের কোনো একক পার্লামেন্টারি আসনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোট হতে পারে। ১৯৬৩ সালে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী আলেক ডগলাস-হোম নিজের অবস্থান সুসংহত করতে কমন্সসভার নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন। তিনি বংশানুক্রমিকভাবে আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

বিজয়ী বক্তৃতায় বার্নহাম ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি মেরুকরণ ও জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির উত্থান ঠেকাতে চান।

বার্নহাম বলেন, তাঁর এই বিজয় যুক্তরাজ্যের জন্য এক বড় সুযোগ, যাতে তাঁদের দেশ ‘যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি বিভক্ত ও অন্ধকার রাজনীতির পথ থেকে দূরে সরে আসতে পারে।’