যুক্তরাজ্যের স্থানীয় নির্বাচনে চাপে লেবার পার্টি, এগিয়ে অভিবাসনবিরোধী নাইজেলের দল
যুক্তরাজ্যের পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস ও নিউহাম কাউন্সিলের অনুষ্ঠিত মেয়র নির্বাচনের ভোট গণনা শুরু হয়েছে। আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় পূর্ব লন্ডনের এক্সেল সেন্টারের ভিন্ন দুটি হলে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোট গণনা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আজ শুধু মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ভোট গণনা করা হচ্ছে। কাউন্সিলর প্রার্থীদের ভোট গণনা হবে আগামীকাল শনিবার।
গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সংযোগ কর্মকর্তা মাহবুব রহমান এবং নিউহাম কাউন্সিলের লেবার–দলীয় কাউন্সিলর হাবিবুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ মেয়র প্রার্থীদের ভোট গণনা চলছে। সন্ধ্যা নাগাদ গণনা শেষ হতে পারে এবং ফলাফল সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে ঘোষণা করা হতে পারে।’
গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহাম, বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহাম, রেডব্রিজসহ যুক্তরাজ্যজুড়ে ১৩৬ স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রার্থী হয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে টাওয়ার হ্যামলেটসে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বর্তমান নির্বাহী মেয়র এসপায়ার পার্টির প্রার্থী লুৎফুর রহমান এবং লেবার পার্টির প্রার্থী সিরাজুল ইসলামের মধ্যে। দুজনই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ায় বরোটির (স্থানীয় কর্তৃপক্ষ) নেতৃত্ব আবারও বাংলাদেশি কমিউনিটির হাতেই থাকার সম্ভাবনা প্রবল। এই কাউন্সিলে আরও দুজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী আবদুল হান্নান, জামি আলীসহ মোট ৯ জন প্রার্থী মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
অন্যদিকে নিউহাম কাউন্সিলের নির্বাচনে বিভিন্ন নির্বাচনী জরিপে লেবার পার্টির মেয়র প্রার্থী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরহাদ হোসেন এগিয়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি জয়ী হলে যুক্তরাজ্যের মূলধারার কোনো বড় রাজনৈতিক দল থেকে মনোনীত প্রথম বাংলাদেশি নির্বাহী মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়বেন। এই কাউন্সিলে গ্রিন পার্টির প্রার্থী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আরিক চৌধুরীসহ মোট ৮ জন প্রার্থী মেয়র পদে লড়াই করেছেন। সন্ধ্যা হলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে, কে পরছেন বিজয়ের মালা।
চাপে লেবার পার্টি ও প্রধানমন্ত্রী স্টারমার
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ শুরু হওয়ার পর থেকেই ক্ষমতাসীন দল লেবার পার্টি ও দলটির নেতা প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের জন্য উদ্বেগ বাড়ছে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেছে, এবারের নির্বাচনে ডানপন্থী নেতা নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করছে। অন্যদিকে লেবার পার্টি তাদের ঐতিহ্যগত শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও ধাক্কা খাচ্ছে।
স্থানীয় সময় আজ শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত ঘোষিত ফলাফলে ৪৬টির বেশি কাউন্সিলের ফল প্রকাশ হয়েছে। তাতে রিফর্ম ইউকে নাটকীয়ভাবে এগিয়ে রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, রিফর্ম ইউকে ইতিমধ্যে প্রায় ৪০০ কাউন্সিল আসনে জয় পেয়েছে। লেবার পার্টি গত নির্বাচনে জয়ী হওয়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন হারিয়েছে।
বিশেষ করে উত্তর ইংল্যান্ড ও মিডল্যান্ডস অঞ্চলে লেবারের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতে রিফর্ম ইউকে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখাচ্ছে। হার্টপুল, হাল্টন, উইগান, চরলে, সাউথএন্ডসহ কয়েকটি কাউন্সিলে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই নির্বাচন এখন কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর কার্যত একধরনের গণভোটে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অভিবাসননীতি, জনসেবার মান এবং সরকারের নীতিগত ইউ-টার্ন (অপ্রত্যাশিত অবস্থান পরিবর্তন) নিয়ে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লেবার বর্তমানে দুই দিক থেকেই চাপের মুখে পড়েছে। একদিকে রিফর্ম ইউকে কর্মজীবী ও অভিবাসনবিরোধী ভোট টানছে। অন্যদিকে শহুরে তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের মধ্যে গ্রিন পার্টির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ফলে লেবার একই সঙ্গে ডান ও বাম—দুই দিক থেকেই ভোট হারাচ্ছে।
দ্য টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে লেবার পার্টির অভ্যন্তরে কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে। ইতিমধ্যে দলটির ভেতরে সম্ভাব্য বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে অ্যাঞ্জেলা রাইনাট, অ্যান্ডি বার্নহাম ও ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের নাম আলোচনায় এসেছে।
অন্যদিকে রিফর্ম নেতা নাইজেল ফারাজ এই ফলাফলকে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ‘ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, ভোটাররা এখন লেবার ও কনজারভেটিভ দুই দলের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছেন।