পশ্চিমা গণমাধ্যমে লন্ডনে ছুরি হামলার শিকার দুই ইহুদি শিরোনামে এলেন, গুরুত্বই পেলেন না আক্রান্ত মুসলিম

লন্ডনের গোল্ডার্স গ্রিনে ছুরিকাঘাতের প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ। ৩০ এপ্রিল ২০২৬ছবি: এএফপি

লন্ডনের রাস্তায় সম্প্রতি একই দিনে একই ব্যক্তির হাতে পৃথক দুটি স্থানে তিনজন ছুরিকাঘাতের শিকার হন। অভিযুক্ত ৪৫ বছর বয়সী এসা সুলেমান প্রথমে দক্ষিণ লন্ডনের সাউথওয়ার্কে ইসমাইল হোসেন নামের এক মুসলিম ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করেন। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি ইহুদি–অধ্যুষিত গোল্ডার্স গ্রিন এলাকায় গিয়ে আরও দুই ইহুদি ব্যক্তিকে (৭৬ বছর বয়সী মোশে শাইন ও ৩৪ বছর বয়সী শ্লোমি র‍্যান্ড) আক্রমণ করেন।

ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি একই হলেও বিবিসি, রয়টার্স, এপি ও স্কাই নিউজের মতো প্রথম সারির গণমাধ্যমগুলো তাদের শিরোনামে কেবল ‘দুই ইহুদি ব্যক্তির ওপর হামলা’র কথা উল্লেখ করেছে। ইসমাইল হোসেনের ওপর হামলার বিষয়টি তারা প্রায় এড়িয়ে গেছে, অথবা খবরের একেবারে শেষে ‘অতিরিক্ত তথ্য’ হিসেবে জুড়ে দিয়েছে।

এসব সংবাদমাধ্যমের নীতিনির্ধারকদের কাছে ইসমাইলের ওপর হামলার বিষয়টি ছিল স্রেফ এক ‘অপ্রয়োজনীয় জটিলতা’। তাঁদের ধারণা ছিল, এই তথ্য যোগ করলে শিরোনামের ধার কমে যাবে এবং খবরের মূল আবেদন নষ্ট হবে। মূলত ইসরায়েলপন্থীদের চাপের ভয় এবং সেই থেকে জন্মানো ‘স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ’ এই তথ্য গোপনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

গণমাধ্যমের এই অভিজাত শ্রেণি মনে করে, গোল্ডার্স গ্রিনে যা ঘটেছে, তা সাউথওয়ার্কের (যেখানে ইসমাইল আক্রান্ত হন) ঘটনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা জানেন, ইসমাইলের ঘটনাটি সামনে আনলে পুরো প্রেক্ষাপট বদলে যাবে। কারণ, এই এসা সুলেমানই ২০০৮ সালে দুই পুলিশ কর্মকর্তা ও একটি কুকুরকে ছুরিকাঘাত করেছিলেন। তবে কি তিনি সম্প্রতি ফিলিস্তিনপন্থী মিছিল দেখে উগ্রবাদী হয়েছেন? এই প্রশ্ন সচেতনভাবেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

গত বুধবার থেকে ইসমাইলের ঘটনাটিকে স্রেফ একটি ‘অতিরিক্ত’ তথ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমগুলো শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একধরনের চাতুর্য দেখাচ্ছে। তারা লিখছে, ‘সুলেমান আরও একজনের ওপর হামলা চালিয়েছেন’ কিংবা ‘তাঁর বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ রয়েছে’।

এখানে ‘আরও’ বা ‘অলসো’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ইসমাইল হোসেনের ক্ষেত্রে। তাঁকে যেন ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের শিরোনাম ছিল, ‘লন্ডনে দুই ইহুদি ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় এক ব্যক্তি আদালতে’। এপি ও বিবিসির শিরোনামও ছিল একই ধাঁচের। তারা সবাই একই কথা বলছে, কেবল দুজন মানুষ, কেবল দুটি হত্যাচেষ্টা। ইসমাইল হোসেন এখানে পুরোপুরি অনুপস্থিত।

গত বৃহস্পতিবার বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে গোল্ডার্স গ্রিনের ভুক্তভোগীদের পরিচয় তুলে ধরে। ৭৬ বছর বয়সী মোশে শাইনকে ‘শান্ত ও সৎ মানুষ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অন্য ভুক্তভোগী ৩৪ বছর বয়সী শ্লোমি র‍্যান্ডের মায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি লিখেছে, ‘মা হিসেবে আমি আতঙ্কিত যে লন্ডনের রাস্তায় এমন ঘটনা ঘটতে পারে।’

শাইন ও র‍্যান্ডকে নিয়ে এমন মানবিক প্রতিবেদন হওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইসমাইল হোসেন কোথায়? তাঁকে নিয়ে এমন কোনো প্রতিবেদন নজরে আসেনি। আসলে রাজনীতি ও গণমাধ্যমের একটি অংশ এ ঘটনাকে শান্তিকামী ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে।

‘কিছু মানুষের জীবনের মূল্য অন্যদের চেয়ে বেশি’—এমন বিশ্বাস থেকেই এ ধরনের পক্ষপাতের জন্ম। যারা মানুষকে সমান চোখে দেখতে জানে না, এই ব্যর্থতা তাদেরই।