জেনোসাইড অস্বীকারের বৈশ্বিক রাজনীতি–২
তুরস্ক: আর্মেনীয় জেনোসাইডের সত্য গোপনের আখ্যান
‘জেনোসাইড’ (গোষ্ঠীনিধন বা গণহত্যা) অস্বীকার কেবল কোনো ঐতিহাসিক অপরাধের সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া বা নিছক ভুলে যাওয়ার বিষয় নয়। অস্বীকারকে মূলত সেই অপরাধেরই একটি চূড়ান্ত, সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘস্থায়ী পর্যায় হিসেবেই ভাবা হয়। যখন কোনো পরাক্রমশালী রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে পদ্ধতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন করার পর সেই অপরাধের দায়ভার অস্বীকার করে, তখন সেটি ভুক্তভোগীদের স্মৃতি ও অস্তিত্বকে দ্বিতীয়বার হত্যার শামিল হয়ে ওঠে। এই অস্বীকৃতির মূল লক্ষ্য হলো অপরাধীদের পরিচয় আড়াল করে তাদের কাঠামোগত ও আইনি দায়মুক্তি দেওয়া। অটোমান শাসনামলে আর্মিনীয় হত্যাযজ্ঞকে জেনোসাইড বলে মেনে নেয়নি তুরস্ক। ‘গণহত্যা অস্বীকারের বৈশ্বিক রাজনীতি’ শীর্ষক এই সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব এই বিষয় নিয়ে।
‘আজ আর্মেনীয়দের নিশ্চিহ্ন হওয়ার কথা কে আর মনে রেখেছে?’ ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে নাৎসি জার্মানির একনায়ক অ্যাডলফ হিটলার এই নিষ্ঠুর উক্তি করেছিলেন। পোল্যান্ড আক্রমণের প্রাক্কালে সাধারণ মানুষকে হত্যার নির্দেশ দিতে গিয়ে তিনি ১৯১৫ সালের আর্মেনীয় জেনোসাইডের উদাহরণ টানেন। জেনোসাইড বা গণহত্যা নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁরা বলেন যে যেকোনো গণহত্যার সর্বশেষ ও সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ধাপটি হলো একে ‘অস্বীকার’ করা। যখন কোনো জেনোসাইডকে অস্বীকার করা হয় এবং অপরাধীরা বিচারহীনতার সুযোগ পায়, তখন তা কীভাবে পরবর্তী যুগে নতুন স্বৈরশাসকদের উৎসাহিত করে, হিটলারের এই উক্তি তারই একটি ঐতিহাসিক প্রমাণমাত্র।
আর্মেনীয় জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছিল ১৯১৫ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনামলে, বিশেষ করে ‘ইয়াং টার্কস’ (তরুণ তুর্কি) বা কট্টর জাতীয়তাবাদী সরকারের অধীনে। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই জেনোসাইড চালানো হয়। এই ৮ বছরের মধ্যে অটোমান সাম্রাজ্যের মানচিত্র থেকে ৩০ লক্ষের বেশি খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা হয় বা সিরীয় মরুভূমিতে নির্বাসিত করা হয়।
আর্মেনীয় জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছিল ১৯১৫ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনামলে, বিশেষ করে ‘ইয়াং টার্কস’ (তরুণ তুর্কি) বা কট্টর জাতীয়তাবাদী সরকারের অধীনে। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই জেনোসাইড চালানো হয়। এই আট বছরের মধ্যে অটোমান সাম্রাজ্যের মানচিত্র থেকে ৩০ লক্ষের বেশি খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা হয় বা সিরীয় মরুভূমিতে নির্বাসিত করা হয়।
এদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল আর্মেনীয়রা এবং তাদের পাশাপাশি আসিরীয় ও গ্রিক সম্প্রদায়ের মানুষও এই ভয়াবহ নৃশংসতার শিকার হয়। এই জেনোসাইড হঠাৎ করে ঘটা কোনো দাঙ্গা ছিল না, বরং এর পেছনে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা কাজ করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে শুরু হওয়া প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে অটোমান রাষ্ট্র ভালোভাবেই জনসংখ্যার তথ্য সংগ্রহ করেছিল, যা পরে সংখ্যালঘু নিধনে কাজে আসে।
আর্মেনীয় জেনোসাইড নিয়ে লেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বইয়ের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেনরি মরগেনথাউয়ের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ ‘অ্যাম্বাসেডর মরগেনথাউস স্টোরি’, যেখানে অটোমান সরকারের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সরাসরি প্রমাণ রয়েছে। ঐতিহাসিক দলিলের পাশাপাশি তুর্কি ইতিহাসবিদ তানের আকচামের লেখা ‘আ শেইমফুল অ্যাক্ট’ বইটি অত্যন্ত সাহসী একটি কাজ। কারণ, তিনি প্রথম তুর্কি গবেষক হিসেবে অটোমান আর্কাইভ ঘেঁটে এই গণহত্যার রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা প্রমাণ করেন।
অন্যদিকে এই গণহত্যার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রতিক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মীদের ভূমিকা নিয়ে পিটার বালাকিয়ান লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত গবেষণাধর্মী বই ‘দ্য বার্নিং টাইগ্রিস’। এ ছাড়া ঐতিহাসিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে লেখা ফ্রাঞ্জ ভেরফেলের সাড়াজাগানো উপন্যাস ‘দ্য ফোরটি ডেজ অব মুসা দাগ’ বিশ্ববাসীর কাছে মুসা দাগ পাহাড়ে আর্মেনীয়দের ৪০ দিনব্যাপী বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের মর্মান্তিক চিত্র গভীরভাবে তুলে ধরেছে।
সাম্প্রতিককালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত উমিত কুর্তের লেখা ‘দ্য আর্মেনিয়ানস অব আইনতাব: দ্য ইকোনমিকস অব জেনোসাইড ইন অ্যান অটোমান প্রভিন্স’ বইটিতে অটোমান সাম্রাজ্যের আইনতাব অঞ্চলে ঘটা আর্মেনীয় গণহত্যার পেছনের আসল অর্থনৈতিক কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে। লেখক স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে আর্মেনীয়দের ওপর যে ভয়াবহ অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, তা শুধু তাদের মেরে ফেলার জন্য বা নিছক জাতিগত বিদ্বেষ থেকে হয়নি। এর পেছনে সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য ছিল তাদের বাড়িঘর, দোকানপাট, ব্যবসা এবং সমস্ত সম্পত্তি চিরতরে দখল করে নেওয়া।
অবাক করার বিষয় হলো, সাধারণ স্থানীয় মানুষ ও নেতারা খুব আগ্রহের সঙ্গে এই ধ্বংসযজ্ঞে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের মূল লোভই ছিল আর্মেনীয়দের ফেলে যাওয়া বিপুল ধনসম্পদ ও জায়গাজমি নিজেদের করে নেওয়া। তৎকালীন সরকারও নানা আইনের মারপ্যাঁচে (যাকে তারা ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি আইন’ বলত) এই বিশাল লুটপাটকে আইনি বৈধতা দিয়েছিল। যুগের পর যুগ ধরে আর্মেনীয়দের জমানো সম্পদ জোর করে কেড়ে নেওয়া হয় এবং সেই লুট করা সম্পদের ওপর ভর করেই তুরস্কে নতুন এক ধনী গোষ্ঠীর জন্ম হয়। সহজ কথায়, এই বই প্রমাণ করে যে আর্মেনীয়দের তাড়িয়ে তাদের সহায়-সম্বল লুট করাই ছিল এই গণহত্যার একটি প্রধান কারণ এবং এই চুরি করা সম্পদের ওপর ভিত্তি করেই ওই অঞ্চলের আধুনিক অর্থনীতি ও পুঁজিপতি শ্রেণির বিকাশ ঘটেছে।
আর্মেনীয় জেনোসাইড নিয়ে লেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বইয়ের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেনরি মরগেনথাউয়ের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ ‘অ্যাম্বাসেডর মরগেনথাউস স্টোরি’, যেখানে অটোমান সরকারের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সরাসরি প্রমাণ রয়েছে। ঐতিহাসিক দলিলের পাশাপাশি তুর্কি ইতিহাসবিদ তানের আকচামের লেখা ‘আ শেইমফুল অ্যাক্ট’ বইটি অত্যন্ত সাহসী একটি কাজ। কারণ, তিনি প্রথম তুর্কি গবেষক হিসেবে অটোমান আর্কাইভ ঘেঁটে এই গণহত্যার রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা প্রমাণ করেন।
জেনোসাইড অস্বীকার করার প্রক্রিয়াটি কিন্তু হত্যাকাণ্ড শেষ হওয়ার পরে শুরু হয়নি, বরং এটি হত্যার মূল পরিকল্পনার সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল। অপরাধীরা এই দৃঢ় বিশ্বাস থেকেই এমন ভয়াবহ অপরাধে লিপ্ত হয় যে এর জন্য তাদের কোনো আইনি পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে না। অস্বীকারের একটি বড় প্রমাণ হলো ১৯১৬ সালে অটোমান সরকার কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণামূলক বই। বইটির নাম হলো ‘Ermeni Komitelerinin Amaal ve Harekat-htilaliyesi’ (যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়: '‘আর্মেনীয় কমিটিগুলোর লক্ষ্য ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড’। এই বইয়ে খুব সুকৌশলে অপরাধী এবং অপরাধের শিকার যারা, তাদের অদলবদল করে দাবি করা হয় যে অটোমান রাষ্ট্র অত্যন্ত সহনশীল ছিল এবং উল্টো আর্মেনীয়রাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করেছিল।
রাষ্ট্র কীভাবে মিথ্যা প্রমাণ তৈরি করে, তার একটি চমৎকার উদাহরণ হলো আরাম দিলদিলিয়ান নামক একজন আর্মেনীয় ফটোগ্রাফারের ঘটনা। দিলদিলিয়ানকে জোরপূর্বক সাজানো অস্ত্রের ছবি তুলতে বাধ্য করা হয়েছিল। মারজোবান শহরে তাঁকে একটি কফিনের ছবি তুলতে বলা হয়, যেটিতে কোনো মরিচাবিহীন নতুন অস্ত্রশস্ত্র সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বকে দেখানো যে আর্মেনীয়রা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
দিলদিলিয়ানের স্মৃতিকথা অনুযায়ী, এ ঘটনা ঘটেছিল ১৯১৫ সালের ১৮ জুন। অর্থাৎ, সেই অঞ্চলে আসল নির্বাসন ও হত্যাকাণ্ড শুরু হওয়ার আগেই রাষ্ট্র নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের জন্য মিথ্যার জাল বুনছিল। জেনোসাইডের পরও ১৯৪০-এর দশকে তুরস্কের প্রদেশগুলোতে অবশিষ্ট আর্মেনীয়দের ওপর অবর্ণনীয় বৈষম্যমূলক কর ও নিপীড়ন চালানো হয়। প্রদেশগুলোতে টিকে থাকা এই আর্মেনীয়দের ‘চিরস্থায়ী নির্বাসিত’ বলা হতো, যারা পরবর্তীতে টিকতে না পেরে নিজেদের আসল পরিচয় গোপন করে ইস্তাম্বুলের মতো বড় শহরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে এই অস্বীকারের রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় একাডেমিক গবেষণায় ঢুকে পড়ে এবং একধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক সহিংসতার জন্ম দেয়। জেনোসাইড অস্বীকার এবং এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে জোরালো কাজ করেছেন মার্ক্সবাদী ইতিহাসবিদ হ্যারি ডি হারোতুনিয়ান। তিনি একাডেমিকজগতের তীব্র সমালোচনা করে দেখিয়েছেন যে পশ্চিমা উপনিবেশবাদ নিয়ে অনেকে সরব থাকলেও অটোমান বা জারশাসিত সাম্রাজ্যগুলোর মতো ঐতিহাসিক সাম্রাজ্যগুলোর গণহত্যামূলক আগ্রাসনকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়।
তাঁর মতে, উত্তর-উপনিবেশবাদে প্রভাবিত এই তাত্ত্বিকেরা সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে অনেক কথা বলেন, কিন্তু তাঁরা এই রূঢ় বাস্তবতাটি ভুলে যান যে অটোমান সাম্রাজ্যে আর্মেনীয়দের কেবল শাসনই করা হয়নি, বরং তাদের স্রেফ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। হারোতুনিয়ান যুক্তি দেন যে রাষ্ট্রীয় অস্বীকারের কারণে ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতাগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ‘না-বলা স্মৃতি’ হিসেবে রয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় বইপত্র যখন সুকৌশলে সত্যকে মুছে ফেলে, তখন সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি, ডায়েরি এবং মুখে মুখে প্রচলিত গল্পের মধ্য দিয়েই প্রকৃত ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। যাদের জীবন রাষ্ট্রীয় খাতায় হিসাব করা হয়নি, তাদের সেই ‘অহিসাবকৃত জীবন’–এর গল্পগুলোই ইতিহাসের আসল সাক্ষী।
আর্মেনীয় গণহত্যার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো নারীদের ওপর হওয়া অমানুষিক নির্যাতন। পুরুষদের মেরে ফেলার পর নারী ও শিশুদের যখন জোর করে সিরিয়ার মরুভূমির দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন তাদের ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় কষ্ট। পথে পথে অসংখ্য নারী ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন ও অপহরণের শিকার হন। অনেক নারীকে পরিবার থেকে কেড়ে নিয়ে দাসিদের বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয় অথবা জোর করে তুলে নিয়ে আটকে রাখা হয়।
আর্মেনীয় গণহত্যার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো নারীদের ওপর হওয়া অমানুষিক নির্যাতন। পুরুষদের মেরে ফেলার পর নারী ও শিশুদের যখন জোর করে সিরিয়ার মরুভূমির দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন তাদের ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় কষ্ট। পথে পথে অসংখ্য নারী ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন ও অপহরণের শিকার হন। অনেক নারীকে পরিবার থেকে কেড়ে নিয়ে দাসিদের বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয় অথবা জোর করে তুলে নিয়ে আটকে রাখা হয়। নারীদের ওপর এই অত্যাচার শুধু শারীরিক ছিল না; এটি ছিল একটি পুরো জাতির মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং তাদের বংশ চিরতরে শেষ করে দেওয়ার একটি নিষ্ঠুর কৌশল।
নারীদের ওপর এই নির্যাতনের পাশাপাশি আরেকটি বড় অপরাধ ছিল জোর করে ধর্ম পরিবর্তন করানো। বেঁচে যাওয়া নারী ও অনাথ শিশুদের ওপরই এই জুলুম সবচেয়ে বেশি হয়েছিল। হাজার হাজার আর্মেনীয় নারী ও শিশুকে জোর করে ধর্মান্তরিত করে তুর্কি বা কুর্দি পরিবারগুলোতে দাসি বা স্ত্রী হিসেবে থাকতে বাধ্য করা হয়। তাঁদের খ্রিষ্টান নাম পাল্টে ফেলা হয় এবং মাতৃভাষা বলা নিষিদ্ধ করা হয়। অনেক সময় তাঁদের মুখে বা হাতে জোর করে উল্কি (ট্যাটু) এঁকে দেওয়া হতো, যাতে তাঁরা আর কখনোই নিজেদের পুরোনো জীবনে ফিরে যেতে না পারেন। এই নারীরা তাঁদের নতুন পরিবারে মুসলিম হিসেবেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেন। অনেক সময় তাঁরা ভয়ে তাঁদের নিজেদের সন্তানদের কাছেও প্রকাশ করতেন না যে তাঁরা আসলে আর্মেনীয়। জোর করে পরিচয় মুছে ফেলার এই গভীর ক্ষত আজও তুরস্কে অনেক মানুষের মনে (হিডেন আর্মেনীয় বা লুক্কায়িত আর্মেনীয় হিসেবে যাঁদের বলা হয়) এক নীরব যন্ত্রণা হয়ে লুকিয়ে আছে।
অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি হিসেবে আধুনিক তুরস্ক রাষ্ট্র কখনোই আর্মেনীয় হত্যাযজ্ঞকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে মেনে নেয়নি। তাদের সরকারি ভাষ্যমতে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে সাম্রাজ্যের পতন ঠেকাতে যে গৃহযুদ্ধ ও সংঘাত হয়েছিল, তাতে আর্মেনীয় ও তুর্কি—উভয় পক্ষেরই বহু মানুষ মারা গেছেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয়ভাবে তারা এটিকে একটি সুপরিকল্পিত জাতিগত নিধনের বদলে কেবল একটি ‘যুদ্ধকালীন ট্র্যাজেডি’ বা ‘পারস্পরিক সংঘাত’ হিসেবে তুলে ধরে।
তুরস্ক সরকারের প্রধান দাবি হলো, আর্মেনীয়রা সেই সময় শত্রুদেশ রাশিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে অটোমান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। তাই রাষ্ট্রের সুরক্ষার স্বার্থেই ১৯১৫ সালের ‘তেহসির আইন’ (Tehcir Law) বা স্থানান্তর আইনের মাধ্যমে তাদের কেবল সিরিয়া অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল, সম্পূর্ণ ধ্বংস করার কোনো পূর্বপরিকল্পনা রাষ্ট্রের ছিল না।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তুরস্ক সরকার বিপুল অর্থ খরচ করে লবিং চালায় যেন অন্য কোনো দেশ বা রাষ্ট্রপ্রধান একে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি না দেয়। সে জন্য তুরস্ক প্রায়ই কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দিয়ে থাকে। এভাবেই ইতিহাসকে চাপা দিতে রাষ্ট্রযন্ত্র তার পুরো শক্তি ব্যবহার করে আসছে।
তুরস্কে আর্মেনীয় জেনোসাইড নিয়ে কথা বলার কারণে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক রোষানলের শিকার হওয়ার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলেন নোবেলজয়ী তুর্কি ঔপন্যাসিক ওরহান পামুক। ২০০৫ সালে একটি সুইস পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি যখন প্রকাশ্যে বলেন যে ‘এই ভূমিতে ৩০ হাজার কুর্দি এবং ১০ লাখ আর্মেনীয়কে হত্যা করা হয়েছে’, তখন তিনি মূলত তুরস্কের এক শতাব্দীর পুরোনো একটি অলিখিত রাষ্ট্রীয় ট্যাবু ভেঙেছিলেন।
এর প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত তীব্র ও ভীতিকর। উগ্র জাতীয়তাবাদীরা তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্বেষমূলক প্রচারণা শুরু করেন; রাস্তায় তাঁর বই পোড়ানো হয় এবং তুরস্কের বেশ কয়েকটি প্রদেশের গভর্নররা স্থানীয় লাইব্রেরি থেকে তাঁর বই সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। এমনকি তুরস্কের বিতর্কিত দণ্ডবিধির ৩০১ নম্বর ধারায় ‘তুর্কি পরিচয়কে অপমান’ করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাও করা হয়। এ মামলায় তাঁকে আদালতে হাজিরা দিতে হয়, যেখানে উগ্রপন্থীরা তাঁর ওপর হামলার চেষ্টাও করেন। পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পাওয়ার দৌড়ে থাকা তুরস্ক সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের প্রবল চাপের মুখে ২০০৬ সালে মামলাটি প্রযুক্তিগত কারণ দেখিয়ে বাতিল করা হয়। ওই বছরই তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেও নিজ দেশে তাঁকে ‘বিশ্বাসঘাতক"’ আখ্যা দিয়ে ক্রমাগত হত্যার হুমকি দেওয়া হতে থাকে। এর ফলে তিনি দীর্ঘদিন পুলিশি নিরাপত্তায় থাকতে বাধ্য হন এবং একপর্যায়ে নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই তাঁকে তুরস্ক ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাতে হয়।
অন্যদিকে তুর্কি-আর্মেনীয় সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী হ্রান্ট ডিঙ্কের পরিণতি ছিল আরও মর্মান্তিক। দ্বিভাষিক সংবাদপত্র আগোস-এর প্রতিষ্ঠাতা ডিঙ্ক তুরস্ক ও আর্মেনিয়ার মধ্যে একটি সেতুবন্ধ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক চাপের চেয়ে তুরস্কের নিজেদের ভেতর থেকে অতীত ইতিহাসের স্বীকৃতি আসাটা বেশি জরুরি। কিন্তু তাঁর এই শান্তির বার্তা এবং ১৯১৫ সালের গণহত্যা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ লেখালেখি তাঁকে তুরস্কের উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী এবং রাষ্ট্রের ভেতরের গোপন চক্রের (ডিপ স্টেট) প্রধান লক্ষবস্তুতে পরিণত করে।
পামুকের মতোই তাঁকে ৩০১ ধারায় বারবার বিচারের মুখোমুখি করে সাজা দেওয়া হয়, যা কার্যত তাঁকে সামাজিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলে। ক্রমাগত হত্যার হুমকি পাওয়া সত্ত্বেও তুরস্কের পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী তাঁকে কোনো সুরক্ষা দেয়নি। এর চরম মূল্য তাঁকে চুকাতেও হয়—২০০৭ সালের ১৯ জানুয়ারি ইস্তাম্বুলে তাঁর নিজ কার্যালয়ের বাইরে প্রকাশ্য দিবালোকে এক উগ্র জাতীয়তাবাদী তরুণের গুলিতে তিনি নির্মমভাবে নিহত হন। তাঁর এই হত্যাকাণ্ড শুধু তুরস্কের পুলিশ প্রশাসনের চরম গাফিলতিই প্রমাণ করেনি, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের একাংশের সঙ্গে উগ্রবাদীদের গোপন আঁতাতের বিষয়টি ফাঁস করে দেয়। তবে ডিঙ্কের মৃত্যু তুরস্কে এক অভূতপূর্ব জাগরণের জন্ম দেয়। তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় লক্ষাধিক মানুষ রাস্তায় নেমে এসে ‘আমরা সবাই হ্রান্ট ডিঙ্ক, আমরা সবাই আর্মেনীয়’ স্লোগান দিয়ে এই রাষ্ট্রীয় অবিচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
বলা প্রয়োজন, ২০০৮ সালে তুরস্কে ‘আমি ক্ষমা চাইছি'’ নামে একটি প্রচারণার সূচনা হয়েছিল, যেখানে প্রায় ৩০ হাজার তুর্কি নাগরিক অটোমান আর্মেনীয়দের ওপর ঘটে যাওয়া মহাবিপর্যয়ের জন্য ক্ষমা চান। আপাতদৃষ্টিতে এটি খুব ভালো উদ্যোগ মনে হলেও কোনো কোনো লেখক এর কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁদের মতে, আর্মেনীয়দের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা ভূমি, কারখানা ও সম্পত্তির মালিকানা ফেরত না দিয়ে এবং তাদের কোনো ক্ষতিপূরণ না দিয়ে কেবল মুখে মুখে ক্ষমা চাওয়া একধরনের আধিপত্যবাদী দাদাগিরি। উমিত কুর্তের গবেষণার সূত্র ধরে বলা যায়, কারও সম্পদ লুট করে সেই সম্পদের ওপর দাঁড়িয়ে কেবল ‘দুঃখিত’ বলা মানে পরোক্ষভাবে সেই ঐতিহাসিক অপরাধকেই জারি রাখা।
২০০৮ সালে তুরস্কে ‘আমি ক্ষমা চাইছি’ নামে একটি প্রচারণার সূচনা হয়েছিল, যেখানে প্রায় ৩০ হাজার তুর্কি নাগরিক অটোমান আর্মেনীয়দের ওপর ঘটে যাওয়া মহাবিপর্যয়ের জন্য ক্ষমা চান। আপাতদৃষ্টিতে এটি খুব ভালো উদ্যোগ মনে হলেও কোনো কোনো লেখক এর কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, আর্মেনীয়দের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা ভূমি, কারখানা ও সম্পত্তির মালিকানা ফেরত না দিয়ে এবং তাদের কোনো ক্ষতিপূরণ না দিয়ে কেবল মুখে মুখে ক্ষমা চাওয়া একধরনের আধিপত্যবাদী দাদাগিরি।
এই জেনোসাইডে কুর্দি এবং অন্যান্য স্থানীয় গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা আছে। কুর্দি বুদ্ধিজীবী ফিরাত আইদিনকায়া স্বীকার করেন যে আর্মেনীয় জেনোসাইডে স্থানীয় কুর্দিরা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং এর পেছনে তিনি স্থানীয় লুণ্ঠনসংস্কৃতিকেই দায়ী করেন।
অন্যদিকে আলেভি চিন্তাবিদ হালিস ইলদিরিমের বিশ্লেষণ আমাদের জেনোসাইডের ভয়াবহ ধারাবাহিকতাকে বুঝতে সাহায্য করে। আধুনিক তুরস্কে ১৯৭৮ সালে মারাশ এবং ১৯৯৩ সালে সিভাস নামক শহরগুলোতে আলেভি সম্প্রদায়ের ওপর যে বীভৎস হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই শহরগুলোতেই একসময় আর্মেনীয়দের বাস ছিল। ইলদিরিম বোঝাতে চেয়েছেন যে জেনোসাইডের ৮০-৯০ বছর পর বিচারহীনতার সুযোগ নিয়ে একই স্থানে আরেকটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর সমান্তরালভাবে সহিংসতা চালানো হয়েছে। বিচারহীনতা এভাবেই সমাজের গভীরে অবিচারের বীজ বপন করে রাখে।
পরিশেষে বলা যায়, একুশ শতকে এসে আর্মেনীয় জেনোসাইড অস্বীকারের রাজনীতি কেবল অতীতকে আড়াল করার চেষ্টা নয়। লুণ্ঠিত সম্পদের মাধ্যমে একটি জাতির অর্থনৈতিক ভিত গড়া, একাডেমিক তত্ত্বের আড়ালে সত্যকে বিকৃত করা এবং ক্ষতিপূরণহীন ক্ষমা চাওয়ার নামে প্রকৃত ন্যায়বিচার থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া—এই সবকিছুই জেনোসাইড অস্বীকারের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ। এই অস্বীকারের সংস্কৃতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে অর্থনৈতিক লুণ্ঠন এবং অতীত অপরাধের বিচার না হলে তা কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অবিচারকে স্থায়ী রূপ দান করে। সত্যের মুখোমুখি হওয়া এবং লুণ্ঠিত সম্পদের ইতিহাস স্বীকার করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া কোনো জাতির পক্ষেই একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সম্ভব নয়।