ইউক্রেন যুদ্ধে রুশবাহিনীর যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ খুঁজতে গত মে মাসে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত দল গঠন করে জাতিসংঘের কাউন্সিল অব ইনকোয়ারি (সিওআই)। এই দলের তিনজন তদন্তকারী গতকাল সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদকে প্রথমবার মৌখিকভাবে তাঁদের অভিমত জানিয়েছেন। তাঁরা জানান, ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও দেশটির চেরনিহিভ, খারকিভ ও সুমি অঞ্চলে বিভিন্ন ঘটনা সরেজমিন তদন্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে এসব অঞ্চলে রুশবাহিনীর যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ তাঁদের হাতে এসেছে। এখন তাঁরা আরও বিস্তারিত তথ্য–প্রমাণ খুঁজছেন।

যুদ্ধ শুরুর সাত মাসের প্রাক্কালে জাতিসংঘের তদন্তকারী দলের প্রধান এরিক মোজ বলেছেন, রাশিয়ার সেনাবাহিনী ইউক্রেনের বেসামরিক স্থাপনা ও জনবহুল এলাকায় হামলা চালিয়েছে, বোমা ফেলেছে। এসব ঘটনায় বেসামরিক মানুষজনের প্রাণ গেছে। তাঁরা ক্ষতির শিকার হয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইনে যা যুদ্ধাপরাধের শামিল।

পরিষদকে এরিক মোজ আরও জানান, তাঁরা তদন্তের কাজে ইউক্রেনের যেসব এলাকা ভ্রমণ করেছেন, সেখানে রুশ বাহিনীর দ্বারা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের প্রমাণ পেয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক মানুষকে পেছনে হাত বাঁধা অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে। অনেকের মাথায় গুলি করা হয়েছে। অনেককে গলা কেটে হত্যা করেছে রুশবাহিনী।’

ইউক্রেনের ১৬টি শহর ও বসতিতে রুশবাহিনীর পরিচালিত এমন হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্ত করছে জাতিসংঘ। এরিক মোজ জানান, এ ছাড়াও ইউক্রেনের আরও অনেক জায়গায় রুশবাহিনীর আইনবিরুদ্ধ কাজের অভিযোগ তাঁরা পেয়েছেন। এসব অভিযোগের নথিপত্র সংগ্রহের কাজ চলছে।

জাতিসংঘের তদন্তকারীর এমন অনেক বুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছেন, যাঁরা রুশবাহিনীর দ্বারা সরাসরি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেককে নির্যাতনের পর বন্দী করে রাশিয়ার কারাগারে আটক রাখা হয়েছিল। বন্দী হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর মুক্তি পান তাঁরা। তবে অনেকেই নির্যাতনের পর গুমের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে, এমনটাই জানিয়েছেন এরিক মোজ।  

এ ছাড়া ইউক্রেনে রুশ সেনাদের দ্বারা সংঘটিত ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের বিভিন্ন অভিযোগ জাতিসংঘের তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। এরিক মোজ জানান, ভুক্তভোগী শিশু ও নারীদের বয়স ৪ থেকে ৮২ বছরের মধ্যে। এই বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত শেষ হলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনতে পারবেন জাতিসংঘের তদন্তকারীরা।

জাতিসংঘের তদন্তকারী ব্যক্তিরা যখন রুশ যুদ্ধাপরাধ নিয়ে নিজেদের অভিমতের কথা জানিয়েছে, ঠিক তখনই ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলছেন, পূর্বাঞ্চলের ইজিয়াম শহরে একটি গণকবরের সন্ধান পেয়েছেন তাঁরা। এই গণকবরে ৪৩৬ জনের মরদেহ রয়েছে।

তাঁদের অভিযোগ, এসব মানুষ রুশবাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৩০টি মরদেহে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ইউক্রেনের অনেক শহরে গণকবরের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে ইউক্রেন।

ইউক্রেনের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভের আঞ্চলিক গর্ভনর ওলেহ সিনিহুবভ ও পুলিশ প্রধান ভলোদিমির তিমোশকো সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ইজিয়াম শহরটি রুশবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ থেকে পুনরুদ্ধারের পর আরও তিনটি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে শহরটি নিয়ন্ত্রণে নেয় ইউক্রেনের বাহিনী।

রাশিয়া ছাড়ছেন অনেকেই

ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানোর পর থেকে রাশিয়ার নাগরিকেরা দেশ ছাড়তে শুরু করেছেন। রাশিয়া ছাড়তে অনেকে জর্জিয়া সীমান্তে জড়ো হয়েছেন। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, জর্জিয়া সীমান্তে গাড়ির জটলা প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জর্জিয়া সীমান্ত দিয়ে ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ রাশিয়া ছেড়েছেন। তবে রুশ কর্তৃপক্ষ লোকজনের দেশ ছেড়ে পালানোর খবরকে ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছে।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন