এআই ব্যবহার করে যৌন নিপীড়নের শঙ্কা, অনলাইনে শিশুর ছবি দেওয়া নিয়ে সতর্কবার্তা
শিশুদের ছবি অনলাইনে সবার জন্য উন্মুক্ত করে না রাখতে মা–বাবাদের পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে তৈরি যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট বা উপাদানের বৃদ্ধি মোকাবিলায় এক যুগান্তকারী নির্দেশিকার অংশ হিসেবে এ পরামর্শ দেওয়া হয়।
এনসিএ এবং শিশু সুরক্ষাবিষয়ক পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশন’ (আইডব্লিউএফ) কর্তৃক জারি করা এই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, মা–বাবা কিংবা আইনি অভিভাবকেরা যেন তাঁদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলো ব্যক্তিগত (প্রাইভেট) করে রাখেন অথবা কেবল একটি ‘ক্লোজ ফ্রেন্ডস’ (ঘনিষ্ঠ বন্ধু) গ্রুপের মাধ্যমে শিশুদের ছবি দেন।
এনসিএ এবং আইডব্লিউএফ জোর দিয়ে বলেছে, তারা মা–বাবাদের অনলাইনে কেমন আচরণ করা উচিত, তা নির্ধারণ করে দিচ্ছে না। তবে এই সমস্যা এবং এটি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সে সম্পর্কে তাঁদের সচেতন হওয়া উচিত।
এই নির্দেশিকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলো পর্যালোচনা করে এমন পুরোনো ছবি খুঁজে বের করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা অপরাধীরা ব্যবহার করতে পারে। একই সঙ্গে ছবি ব্যবহারের সম্মতিসংক্রান্ত চুক্তিগুলো (যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা স্পোর্টস ক্লাবের সঙ্গে) পুনর্বিবেচনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব চুক্তি হয়তো এআইয়ের অগ্রগতির কয়েক বছর আগে সই করা হয়েছিল যখন ছবি বিকৃতির বিষয়টি সম্ভব ছিল না।
এনসিএর জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক টিম রাইট বলেন, ‘আমরা মা–বাবা ও অভিভাবকদের আজই কয়েকটি সহজ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করছি।’
নির্দেশিকায় তিনটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টের ‘প্রাইভেসি সেটিংস’ পরীক্ষা করা; শিশুদের ছবি কারা দেখতে পাচ্ছেন তা পর্যালোচনা করা এবং ব্যক্তি বা বিভিন্ন সংস্থাকে শিশুদের ছবি অনলাইনে প্রকাশের অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনা করা।
আপনি যদি কোনো ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আপনার শিশুদের ছবি সরিয়ে নিতে চান, তবে আপনি তা পূর্ণ অধিকার বা স্বাধীনতা নিয়ে নির্দ্বিধায় করতে পারেন।—টম ডাইসন, বিপণনপ্রধান, আইডব্লিউএফ
এনসিএ জানিয়েছে, অধিকাংশ মা–বাবা ও অভিভাবকেরাই হয়তো অবগত নন যে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে অপরাধীরা এখন এমন কিছু উন্মুক্ত টুল বা মাধ্যম পেয়ে গেছে, যার সাহায্যে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বা সম্পর্ক তৈরি (গ্রুমিং) না করেই শিশুর যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্ট বা উপাদান (সিএসএএম) তৈরি করা সম্ভব।
এনসিএর শিশু যৌন নিপীড়নবিষয়ক এডুকেশনাল ম্যানেজার লরনা সিনক্লেয়ার বলেন, ‘সাধারণত মা–বাবা বা অভিভাবক অনলাইনে শিশুর কোনো ছবি দেওয়ার সময় এটি ভাবেন না যে সেই ছবি হাতিয়ে নিয়ে সিএসএএমএ রূপান্তর করা হতে পারে। এমন অনেক মা–বাবা ও অভিভাবক আছেন, যাঁরা জানেনই না যে এ ধরনের কোনো সমস্যা বাস্তবে আছে।’
পরিস্থিতি উদ্বেগজনক
আইডব্লিউএফের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনে এআই দিয়ে তৈরি শিশুর যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্টের পরিমাণ গত বছর ১৪ শতাংশ বেড়েছে। সংস্থাটি ২০২৫ সালে বাস্তবের মতো দেখায় এমন ৮ হাজার ২৯টি এআইনির্মিত সিএসএএম ছবি ও ভিডিও শনাক্ত করেছে।
আইডব্লিউএফ সিএসএএম–সংক্রান্ত ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করে এবং একটি রিপোর্টিং হটলাইন পরিচালনা করে। সংস্থাটির সঙ্গে ১৮ বছরের কম বয়সী এমন কিশোর-কিশোরীরা যোগাযোগ করেছে, এআই দিয়ে তাদের ছবি নগ্নরূপে বিকৃত করার পর তারা চাঁদাবাজদের ব্ল্যাকমেলের শিকার হয়েছে।
সম্মতি ছাড়া নেওয়া ১৮ বছরের কম বয়সীদের আপত্তিকর ছবিগুলো ইন্টারনেট থেকে সরিয়ে ফেলার একটি গোপন পরিষেবার নাম ‘রিপোর্ট রিমুভ’। তারাও এ ধরনের ছবি বিকৃতির উদাহরণ পেয়েছে। সেখানে সাধারণ, সম্পূর্ণ পোশাক পরা সেলফিগুলোকে এআই দিয়ে চরম পর্নোগ্রাফিতে রূপান্তর করার ঘটনা ঘটেছে।
চাইল্ডলাইন নামের একই ধরনের একটি পরিষেবার কাছে আসা অন্য একটি ঘটনায় এক ১৫ বছর বয়সী কিশোরী জানিয়েছে, একজন অপরিচিত ব্যক্তি ‘দেখতে একেবারে বাস্তবের মতো’ তার একটি ভুয়া নগ্ন ছবি তৈরি করেছে। ছবিটিতে তার চেহারা এবং শোবার ঘর ব্যবহার করা হয়েছিল। এই ছবিটি মূল উপাদান (সোর্স ম্যাটেরিয়াল) সম্ভবত মেয়েটির ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া হয়েছিল।
এই নির্দেশিকা প্রকাশের পেছনে এমন কিছু ঘটনাও রয়েছে, যেখানে যুক্তরাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইটগুলো ব্ল্যাকমেলারদের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। তারা ওয়েবসাইট থেকে শিশুদের ছবি হাতিয়ে নিয়ে এআই টুলের সাহায্যে সেগুলোকে শিশু যৌন নিপীড়নমূলক কনটেন্টে রূপান্তর করে এবং পরে তা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়।
অনলাইন ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের একটি পরামর্শক সংস্থা ‘আর্লি ওয়ার্নিং ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (ইডব্লিউডব্লিউজি), যার সদস্যদের মধ্যে এনসিএ এবং আইডব্লিউএফ রয়েছে। ইডব্লিউডব্লিউজি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে শিক্ষার্থীদের সহজে চেনা যায়, এমন চেহারার ছবি সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দিয়েছে।
আইডব্লিউএফের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ড্যান সেক্সটন বলেন, শিশুদের ছবি সবার জন্য উন্মুক্ত (পাবলিক) না রাখার কথা মা–বাবাদের বলতে তাঁর ‘খুবই অস্বস্তি লাগছিল’। কিন্তু এর কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘অভিভাবকদের এ ছাড়া আর কী বলব আমি জানি না। (অনলাইনে শিশুদের ছবি দেওয়ার ক্ষেত্রে) আমি নিজে খুবই সতর্ক থাকতাম, কারণ সেখানে কোনো সুরক্ষা বা নিরাপত্তা নেই।’
মা–বাবা ও অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ
এনসিএ এবং আইডব্লিউএফের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ‘আপনি যদি অনলাইনে আপনার শিশুর ছবি দিতে চান, তবে একটি “ক্লোজ ফ্রেন্ডস” গ্রুপ তৈরি করার অথবা ছবি দেখার সুযোগ সীমিত করার পরামর্শ দিচ্ছি আমরা, যাতে কেবল নির্দিষ্ট করে দেওয়া ব্যক্তিরাই তা দেখতে পারেন।’
শিশুবিষয়ক দাতব্য সংস্থা এনএসপিসিসি ১৮ বছরের কম বয়সীদের তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে ‘প্রাইভেট সেটিংস’ কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছে।
এই নির্দেশিকার অংশ হিসেবে প্রকাশিত কিছু ভিডিওতে কাল্পনিক কিছু দৃশ্য দেখানো হয়েছে, যেখানে মা–বাবারা তাঁদের শিশুদের খেলাধুলা করা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফটকে দাঁড়িয়ে থাকার মতো দৈনন্দিন দৃশ্যের ছবি তুলছেন আর তাঁদের অনলাইনে ছবি দেওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এনসিএ এবং আইডব্লিউএফ জানিয়েছে, তারা মা–বাবা ও শিশুরা অনলাইনে ছবি দেওয়ার ক্ষেত্রে অস্বস্তি বোধ করলে যেন ‘না’ বলে দেয়, সে উৎসাহ দিতে চায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনার নির্দেশিকার মধ্যে রয়েছে ব্যবহারকারীদের নিজের অ্যাকাউন্ট পরীক্ষা করা, যাতে ছবিতে তাঁদের শিশুদের ‘মুখ, শরীর বা স্কুলের ইউনিফর্ম’ দেখা যাচ্ছে কি না, ছবিটি এখনো অনলাইনে রাখার বিষয়ে তাঁরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন কি না এবং এটি মুছে ফেলা বা প্রাইভেট করা যায় কি না, সেটি ভালো করে ভেবেচিন্তে দেখতে পারেন।
নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের অন্য সদস্যরা শিশুদের কোনো ছবি (পুরোনো পোস্টসহ) অনলাইনে দিচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করা এবং এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নিয়ে ‘স্পষ্ট ও শান্তভাবে’ আলোচনা করা।
এর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নার্সারি বা ক্লাবগুলোতে শিশুদের ছবি ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে মা–বাবা কিংবা অভিভাবকদের সই করা সম্মতিপত্রগুলো পর্যালোচনা করার এবং সেই অনুমতি বা সম্মতি তাঁরা প্রত্যাহার করতে চান কি না, তা বিবেচনা করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে এই নির্দেশিকায়।
আইডব্লিউএফের বিপণনপ্রধান টম ডাইসন বলেন, ‘আপনি যদি কোনো ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আপনার শিশুদের ছবি সরিয়ে নিতে চান, তবে আপনি তা পূর্ণ অধিকার বা স্বাধীনতা নিয়ে নির্দ্বিধায় করতে পারেন।’