যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রথম ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে আদৌ কি কোনো ফল আসবে
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকেরা গতকাল শুক্রবার থেকে আলোচনায় বসেছেন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পুরোদমে হামলা শুরু হওয়ার পর এটি তিন দেশের মধ্যে প্রথম বৈঠক। তবে আলোচনার কাঠামোতে পরিবর্তন এলেও দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধের মূল জায়গাটি একই থেকে গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনে একটি শান্তিচুক্তি নিশ্চিত করতে জোরেশোরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি শান্তিচুক্তির প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, দুই পক্ষ যদি সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারে, তাহলে তারা ‘বোকামি’ করবে।
তবে ট্রাম্পের নিজের দূতরা জোরালোভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে গেলেও ইউক্রেন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রথম যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হচ্ছে, সেখানে এখনো কয়েকটি বড় সমস্যার মীমাংসা হয়নি।
ইউক্রেন মূলত দুটি কারণে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। প্রথমত, তারা চায় শান্তি প্রতিষ্ঠা হোক। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ধরে রাখাও তাদের জন্য খুব জরুরি। গত বছর তারা এর মূল্য বুঝেছে। কারণ, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছু সময়ের জন্য গোয়েন্দা তথ্য আদান–প্রদান ও সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বৈঠক ছিল ‘খুবই ইতিবাচক’। তিনি আশা করছেন, রাশিয়ার লাগাতার হামলা প্রতিহত করতে ইউক্রেন আরও বেশি আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা পাবে।
জেলেনস্কি বলেছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি রূপরেখা চুক্তি প্রস্তুতের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে শেষ ১০ শতাংশ কাজই সবচেয়ে কঠিন। রাশিয়া পুরো প্রস্তাবটাই নাকচ করে দিতে পারে বলে এখনো আশঙ্কা আছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর জেলেনস্কিকে সাধারণত গম্ভীর মুখেই দেখা যায়। কিন্তু এবার তাঁকে তুলনামূলক বেশ চনমনে মনে হয়েছে।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলমান আলোচনার ফল কী হতে পারে, তা নিয়ে বলার ক্ষেত্রে তিনি এখনো সাবধানী। তিনি এই বৈঠককে একটি ‘পদক্ষেপ‘ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে একে সরাসরি ইতিবাচক ধাপ বলতে চাননি।
জেলেনস্কি বলেন, ‘আমরা আশা করতে পারি, এটা আমাদের শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে আরেকটু এগিয়ে নেবে।’
জেলেনস্কি বলেছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি রূপরেখা চুক্তি প্রস্তুতের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে শেষ ১০ শতাংশ কাজই সবচেয়ে কঠিন। রাশিয়া পুরো প্রস্তাবটাই নাকচ করে দিতে পারে বলে এখনো আশঙ্কা আছে।
জেলেনস্কি ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘সবকিছুই আমাদের দেশের পূর্বাঞ্চল ঘিরে। সবকিছুই জমি নিয়ে। এই বিষয়টাই এখনো মীমাংসা হয়নি।’ তাঁর মতে, এটিই সবচেয়ে বড় বাধা।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর বৈঠক ছিল ‘খুবই ইতিবাচক’। তিনি আশা করছেন, রাশিয়ার লাগাতার হামলা প্রতিহত করতে ইউক্রেন আরও বেশি আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা পাবে।
রাশিয়া জোর দিয়ে বলেছে, ইউক্রেনকে পূর্বাঞ্চলের দনবাস এলাকার একটি বড় অংশ তাদের কাছে ছেড়ে দিতে হবে। যুদ্ধক্ষেত্রে তারা এ এলাকাটির দখল নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে রাশিয়ার এ শর্ত মানতে রাজি নয় ইউক্রেন।
ইউক্রেনের জন্য দনবাসের সীমারেখা শুধু কাগজে আঁকা কোনো রেখা নয়, এটি আঁকা হয়েছে সেসব সেনার রক্ত দিয়ে, যারা এই ভূমি রক্ষায় প্রাণ দিয়েছেন। জেলেনস্কি সে সীমারেখা পার হয়ে যেতে পারেন না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে আলোচনার আরেকটি বড় বিষয় হলো—যদি কোনো দিন রাশিয়া আবার ইউক্রেনে হামলা করে, তখন যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে কী করবে? ইউক্রেন এটিকে তাদের ‘নিরাপত্তা নিশ্চয়তা‘ বলে মনে করে এবং এটিকে অত্যন্ত জরুরি বিষয় বলে উল্লেখ করে।
জেলেনস্কি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে সমঝোতা হয়ে গেছে।
তবে এর বিস্তারিত এখনো জানা যায়নি।
রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া কী হবে, সেটিও এখন একটি বড় প্রশ্ন।
এ ছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নিশ্চয়তা কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা নিয়ে বড় সন্দেহ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট গ্রিনল্যান্ড ‘অধিগ্রহণ‘ করার প্রতি এতটাই মনোযোগ দিয়েছেন যে তা ন্যাটোকে অনেক দুর্বল করে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এর মধ্য দিয়ে তিনি একটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল নীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন, যা পশ্চিমা দেশের ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার মূল ভিত্তি।
সুতরাং পরবর্তী সংকট থেকে উদ্ধার করার জন্য কিয়েভ কি ট্রাম্পের ওপর ভরসা রাখতে পারবে? আপাতত দেশটির হাতে খুব একটা বিকল্প নেই।
আর ভ্লাদিমির পুতিনকে বিশ্বাস করার বিষয়টি—এখানে সবার ধারণা একই যে তাঁর লক্ষ্য বদলে গেছে।
জেলেনস্কি দাভোসে বলেছেন, ‘তিনি (পুতিন) সত্যিই শান্তি চাচ্ছেন না।’
ক্রেমলিন বলেছে, তারা যা চায় তা যদি আলোচনার টেবিলে না থাকে, তাহলে তারা ‘যুদ্ধের মধ্য দিয়ে’ তা অর্জন করে নেবে।
যদিও এখন পর্যন্ত যুদ্ধের ময়দানে বিপুলসংখ্যক সেনাকে হারানোর পরও রাশিয়া তাদের লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়নি। এখন তারা আগের চেয়ে আরও পরিকল্পিত, ধারাবাহিক এবং বিধ্বংসীভাবে ইউক্রেনের নাগরিক ও স্থাপনা ধ্বংস করছে। মানুষকে ঘরের ভেতর প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে জবুথবু হয়ে থাকতে হচ্ছে।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো আবারও শহরের বাসিন্দাদের অনুরোধ করেছেন, যদি কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে তবে ঘর থেকে বেরিয়ে সেখানে চলে যেতে।
ভিতালি ক্লিৎসকো সতর্ক করে বলেছেন, ‘শত্রুপক্ষ সম্ভবত শহর ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ চালাতে থাকবে।’
বারবারের হামলার ফলে এসব ব্যবস্থা খুব দুর্বল হয়ে গেছে।
মেয়র স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি সোজাসাপ্টা বাসিন্দাদের বলছি, পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন এবং হয়তো এখনো সবচেয়ে কঠিন সময়টা আসেনি।’