যুক্তরাজ্যে চ্যাটজিপিটি বিতর্কে আলোচিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইনজীবীর সনদ ছয় মাস স্থগিত

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের আইনজীবী মুহাম্মদ মুজিবুর রহমানছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইনজীবী মুহাম্মদ মুজিবুর রহমানের আইনজীবী সনদ ছয় মাস স্থগিত করা হয়েছে। তাঁকে আইন পেশা থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে যুক্তরাজ্যের বার স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ড (বিএসবি)। এর আগে এই আইনজীবী চ্যাটজিপিটি থেকে নেওয়া একটি অস্তিত্বহীন মামলা আদালতে উদ্ধৃত করে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।

বিএসবি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ প্যানেল চলতি বছরের ১৮ মে মুজিবুর রহমানকে তাৎক্ষণিকভাবে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দেয়। এই স্থগিতাদেশ ছয় মাসের জন্য কার্যকর থাকবে। একই সঙ্গে ছয় মাসের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য আরেকটি অন্তর্বর্তীকালীন শুনানি হবে। তবে কোন অভিযোগের ভিত্তিতে মুজিবুর রহমানকে বরখাস্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি বিএসবি।

এ বিষয়ে জানতে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে বিএসবি বরাবর ই–মেইল করলে সংস্থাটি অভিযোগের প্রকৃতি প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানায়। বিএসবির মুখপাত্র গ্রাহাম ই–মেইলে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বার স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ড সাধারণত কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অসদাচরণ সংক্রান্ত তথ্য পেয়েছে কি না বা কীভাবে সে তথ্য তাদের কাছে এসেছে, সে বিষয়ে মন্তব্য করে না। তবে অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারির প্রেক্ষাপটে আমরা নিশ্চিত করছি, এই মামলার কার্যক্রম চলমান।’

গ্রাহাম আরও বলেন, এ ধরনের বিষয় সাধারণত গোপনীয়ভাবে পরিচালিত হয়। শুধু কোনো মামলা ডিসিপ্লিনারি ট্রাইব্যুনালের শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হলে তা প্রকাশ করা হয় এবং শুনানি জনসমক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।

বিএসবির এই মুখপাত্র আরও বলেন, ‘মুহাম্মদ মুজিবুর রহমানকে গত ১৮ মে তাৎক্ষণিকভাবে আইন পেশা থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এই স্থগিতাদেশ ছয় মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। পাশাপাশি ছয় মাসের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য স্থগিতাদেশ প্যানেলের আরেকটি অন্তর্বর্তীকালীন শুনানি হবে।’

এর আগে গত বছর লন্ডনের আপার ট্রাইব্যুনাল (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম চেম্বার) মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন। আদালত বলেন, তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক টুল চ্যাটজিপিটি থেকে পাওয়া একটি ভুয়া মামলা আদালতে উদ্ধৃত করে অপেশাদার আচরণ করেছেন। মামলাটি যুক্তরাজ্যে প্রথম বড় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে একজন আইনজীবী চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে তৈরি করা অস্তিত্বহীন একটি মামলার নজির আদালতে উপস্থাপন করেছেন। বিষয়টি আইন পেশায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ঝুঁকি ও নৈতিকতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

আদালতের নথি অনুযায়ী, মুজিবুর রহমান তাঁর আপিলের খসড়ায় ‘ওয়াই (চায়না) [২০১০] ইডব্লিউসিএ সিভিল ১১৬’ নামে একটি মামলা উদ্ধৃত করেছিলেন। পরে দেখা যায়, বাস্তবে এমন কোনো মামলার অস্তিত্ব নেই। প্রথমে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করলেও আদালতে জেরার মুখে এক পর্যায়ে স্বীকার করেন, উদ্ধৃতিটি চ্যাটজিপিটি থেকে এসেছে এবং আদালতে জমা দেওয়ার আগে তিনি এর সত্যতা যাচাই করেননি।

রায়ে বিচারপতি জাস্টিস ডভ ও জজ লিভসলি বলেন, আদালতের প্রতি একজন আইনজীবীর প্রথম দায়িত্ব হলো, সত্য ও সঠিক তথ্য দেওয়া। যাচাই-বাছাই ছাড়া এআই-সৃষ্ট তথ্য আদালতে ব্যবহার করা বিপজ্জনক ও অপেশাদার আচরণ।

বিচারপতিরা উল্লেখ করেন, এ ঘটনায় একাধিকবার বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দিয়ে আইনজীবী মুজিবুর রহমান সততা ও পেশাদারত্বের মানদণ্ড লঙ্ঘন করেছেন। তবে ট্রাইব্যুনাল মনে করেন, এটি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া মামলা তৈরির ঘটনা নয়। তাই আদালত অবমাননা বা পুলিশি তদন্তের প্রয়োজন নেই। কিন্তু এ ধরনের আচরণ আদালত ও আইন পেশার প্রতি জনআস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই বিষয়টি তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বার স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ডে পাঠানো হয়েছে।

বার স্ট্যান্ডার্ড বোর্ড হলো যুক্তরাজ্যের আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এটি আইনজীবীদের পেশাগত নীতি, আচরণবিধি ও মানদণ্ড নির্ধারণ করে এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মান তদারক করে। কোনো আইনজীবী আদালতে ভুয়া তথ্য দিলে, অনৈতিক আচরণ করলে বা তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন না করলে বার স্ট্যান্ডার্ড বোর্ড শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। যেমন সতর্কীকরণ, জরিমানা, সাসপেনশন বা চূড়ান্তভাবে আইনজীবী লাইসেন্স বাতিল করা।

এ বিষয়ে মুজিবুর রহমানের বক্তব্য জানতে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁর মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত বার্তা পাঠিয়ে স্থগিতাদেশের কারণ, অভিযোগের প্রকৃতি এবং তিনি এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করবেন কি না, সেসব বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।