ভারত কি সত্যিই রাশিয়ায় তেল রপ্তানি করছে, নায়ারা এনার্জি কেন আলোচনায়
ইউক্রেন রাশিয়ার তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে রাশিয়ায় জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয় তেল কোম্পানি নায়ারা এনার্জি রাশিয়ায় জ্বালানি তেল বিক্রি করেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
গত বুধবার শিল্প খাতের একাধিক সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, ভারত থেকে অন্তত ৬০ হাজার মেট্রিক টন পেট্রোলিয়াম রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টন করে পেট্রোলিয়াম বহনকারী দুটি ট্যাংকারও রাশিয়ার উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার আলাদা দুটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, নায়ারা এনার্জি এ পেট্রল উৎপাদন করেছে এবং তা আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে রাশিয়ার কাছে বিক্রি করেছে।
নায়ারা এনার্জি আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করেনি।
ভারতের তেলমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি বৃহস্পতিবার বলেন, ভারতীয় কোম্পানিগুলো সরাসরি রাশিয়ার কাছে জ্বালানি বিক্রি করছে না। তবে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে রাশিয়া ভারতে উৎপাদিত জ্বালানি কিনে থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এ বিষয়ে এ পর্যন্ত যা জানা গেছে—
রাশিয়ার জ্বালানিসংকটের কারণ কী
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনের বাহিনী রাশিয়ার বিভিন্ন তেল স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় একাধিক তেল স্থাপনায় আগুন লাগে এবং রাজধানী মস্কোসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি কেনার জন্য দীর্ঘ সারি দেখা দেয়।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ায় এমন জ্বালানিসংকট আগে কখনো দেখা যায়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটির অনেক অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এপির হিসাব অনুযায়ী, মার্চ মাস থেকে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার, তেল সংরক্ষণাগার, তেল টার্মিনাল এবং অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামোতে ৫০টির বেশি হামলা চালিয়েছে।
গত বছরের জুলাইয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নায়ারা এনার্জির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর আওতায় রুশ অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করে প্রক্রিয়াজাত করা পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি শোধনাগারটির জন্য ইইউভিত্তিক জাহাজ বিমা, আর্থিক সেবা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পরিষেবার সুযোগও সীমিত করে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপেও একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪ সালে রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইউক্রেনের এই উপদ্বীপ দখল করে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
এপির হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার কিছু তেল স্থাপনায় একাধিকবার হামলা হয়েছে। এর মধ্যে কৃষ্ণসাগরের তীরবর্তী তুয়াপসে শহরের তেল শোধনাগারটি চারবার হামলার শিকার হয়।
গত রোববার সরকারি মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন স্বীকার করেন, ইউক্রেনের হামলায় দেশটির কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছু অঞ্চলে জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
তবে পুতিন দাবি করেন, এই ঘাটতি ‘গুরুতর নয়’ এবং ‘সাময়িক’।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বার্তায় বলেন, পুতিন টেলিভিশনে যতই বলেন, সবকিছু তাঁর নিয়ন্ত্রণে আছে। রাশিয়ার মানুষ কিন্তু দেখছে, যুদ্ধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তেলসমৃদ্ধ দেশ রাশিয়াও এখন জ্বালানির সংকটে পড়েছে।
নায়ারা এনার্জি কী
নায়ারা এনার্জি একটি তেল পরিশোধন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় গুজরাট রাজ্যের ভাদিনারে কোম্পানিটি ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বেসরকারি শোধনাগারটি পরিচালনা করে। প্রতিদিন চার লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল শোধনের সক্ষমতা আছে এ শোধনাগারের।
নায়ারা এনার্জি কোম্পানি ২০১৫ সালে আর্থিক সংকটে থাকা ভারতীয় প্রতিষ্ঠান এসার-এর কাছ থেকে শোধনাগারটি কিনেছিল। এটি ছিল ভারত ও রাশিয়ার সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি চুক্তির অংশ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এ চুক্তি অনুমোদন করেছিলেন।
ওই সময় পুতিন রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি রোসনেফট–এ সরকারের মালিকানার অংশ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এর অংশ হিসেবে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলো রোসনেফট-এ অংশীদারত্ব কিনেছিল। পরে রোসনেফট বর্তমানে নায়ারা এনার্জি নামে পরিচিত কোম্পানিটির ৪৯ শতাংশ মালিকানা অধিগ্রহণ করে।
এ ছাড়া নায়ারা এনার্জির আরও ৪৯ শতাংশ শেয়ার রাশিয়ার সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ক্যাপিটাল পার্টনারস-এর মালিকানাধীন।
এক বিবৃতিতে নায়ারা এনার্জি বলেছে, তারা ‘ভারতে থেকে, ভারতের জন্য‘ কাজ করে এবং দেশটির ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কোম্পানিটি আরও দাবি করেছে, ‘আমরা ভারতের সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণশীল বেসরকারি ফুয়েল স্টেশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করি এবং সারা দেশের গ্রাহকদের কাছে মানসম্মত জ্বালানি সরবরাহ করি।’
নায়ারা এনার্জি একটি তেল পরিশোধন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় গুজরাট রাজ্যের ভাদিনারে কোম্পানিটি ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বেসরকারি শোধনাগারটি পরিচালনা করে। প্রতিদিন ৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল শোধনের সক্ষমতা আছে এ শোধনাগারের।
তবে মালিকানার কাঠামোর কারণে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত রুশ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে আছে। ধারণা করা হয়, নায়ারা এনার্জি ছাড়মূল্যে কেনা রুশ অপরিশোধিত তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে তারা সেই তেল আমদানি করে।
গত বছরের জুলাইয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নায়ারা এনার্জির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর আওতায় রুশ অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করে প্রক্রিয়াজাত করা পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি শোধনাগারটির জন্য ইইউভিত্তিক জাহাজ বিমা, আর্থিক সেবা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পরিষেবার সুযোগও সীমিত করে দেওয়া হয়।
নায়ারা এনার্জির ওপর কেন নিষেধাজ্ঞা এবং এ বিষয়ে কোম্পানিটির প্রতিক্রিয়া কী
নায়ারা এনার্জির ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিষেধাজ্ঞা মূলত রাশিয়ার তেল খাতকে লক্ষ্য করে আরোপিত বৃহত্তর নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের অংশ।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর মস্কোর বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ১৮তম নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজে রুশ অপরিশোধিত তেল থেকে উৎপাদিত তেলজাত পণ্য ইইউভুক্ত দেশগুলোতে রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়। এতে ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপ তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হয়েছিল।
ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা ভাদিনারে অবস্থিত নায়ারা এনার্জির শোধনাগারে বর্তমানে শুধু রুশ অপরিশোধিত তেলই প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। কারণ, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর অন্য অনেক সরবরাহকারী কোম্পানিটির সঙ্গে ব্যবসা থেকে সরে যায়।
এর পর থেকে নায়ারা অপরিশোধিত তেল আমদানি এবং পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানির জন্য আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করে আসছে।
জাহাজ চলাচল–সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান এলএসইজি ও কেপলারের তথ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে রয়টার্স জানতে পেরেছে, জুন মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সমুদ্রে থাকা জাহাজে ইতিমধ্যে তুলে ফেলা রুশ তেলের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার পর এমনটা হয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যে জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা লাঘব করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই পদক্ষেপ নেন।
গত বৃহস্পতিবার রয়টার্স ট্যাংকারের একটি চালানপত্র হাতে পেয়েছে। এর মধ্য দিয়ে জানা গেছে, ক্যামেরুন পরিচালিত ‘অগ্নি’ নামের একটি জাহাজ ২০ জুন ভাদিনার থেকে পেট্রোলিয়াম নিয়ে ফুজাইরাহর উদ্দেশে যাত্রা করেছে। তবে এলএসইজি–এর তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি পরে ফুজাইরাহ পার হয়ে সুয়েজ খালে প্রবেশ করার পর উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এটি আরও উত্তরের কোনো গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিল।