দাভোসে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প কতগুলো মিথ্যা বলেছেন
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ইউরোপীয় মিত্রদের তিরস্কার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল বুধবার সেখানে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি আবারও গ্রিনল্যান্ড দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন।
বক্তব্যে গ্রিনল্যান্ডের ইতিহাস বিকৃত করে কথা বলেছেন ট্রাম্প। তিনি পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোকে আক্রমণ করেছেন এবং অর্থনীতি ও নিজের রেকর্ড নিয়ে পুরোনো কিছু মিথ্যা তথ্যের পুনরাবৃত্তি করেছেন।
এখানে ট্রাম্পের বক্তব্যের তথ্য-যাচাই তুলে ধরা হলো।
ট্রাম্প যা বলেছেন
‘যুদ্ধের পর আমরা ডেনমার্কের কাছে গ্রিনল্যান্ড দ্বীপটি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। এটি অত্যন্ত বোকামি ছিল; কিন্তু আমরা তা করেছি। আমরা এটি ফিরিয়ে দিয়েছি।’
ট্রাম্পের এ বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। এখানে তিনি সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা বোঝাচ্ছিলেন; কিন্তু সেই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডের ওপর সার্বভৌমত্ব বা নিয়ন্ত্রণ দেয়নি।
১৯৫১ সালেও তৎকালীন ট্রুম্যান প্রশাসন গ্রিনল্যান্ড কেনার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে একটি সামরিক চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় দ্বীপটির ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয়, যার বিনিময়ে তারা সেখানে কেবল সামরিক ঘাঁটি তৈরির সুযোগ পায়।
১৯৪১ সালে নাৎসিরা ডেনমার্ক আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ডেনিশ রাষ্ট্রদূত এ চুক্তি করেন। চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডকে রক্ষার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অধিকার দেওয়া হয়।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক স্টিভেন প্রেস বলেন, ‘চুক্তিটি আইনিভাবে নড়বড়ে ছিল। কারণ, এতে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ডেনিশ রাষ্ট্রদূত ছাড়া ডেনমার্ক রাষ্ট্রের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। ওই রাষ্ট্রদূত মূলত একটি নির্বাসিত সরকার হিসেবে কাজ করছিলেন।’
কোপেনহেগেনের ডেনিশ ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক মিকেল রুঞ্জ ওলেসেন বলেছেন, ওই রাষ্ট্রদূত একতরফাভাবে চুক্তিটি করলেও তিনি নিশ্চিতভাবেই দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করেননি। তিনি শুধু সেখানে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অধিকার দিয়েছিলেন।
চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের কথা একাধিকবার উল্লেখ আছে। সেখানে ডেনমার্ককে দ্বীপটির মাতৃভূমি বলা হয়েছে। একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বের প্রতি স্বীকৃতি ও সম্মানের কথা পুনর্ব্যক্ত করছে।
ওলেসেন আরও বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দখল করার সিদ্ধান্ত নিলে ডেনমার্কের কিছুই করার থাকত না; কিন্তু এর কোনো আইনি ভিত্তি থাকত না।
অধ্যাপক স্টিভেন প্রেস বলেন, ‘ট্রাম্পের বক্তব্য তখনই সঠিক বলে গণ্য হতো, ‘যদি আমরা আন্তর্জাতিক চুক্তি বা জনমতের চেয়ে নিছক পেশিশক্তিকেই সার্বভৌমত্বের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিশ্বাস করতাম।’
কিন্তু অধ্যাপক প্রেস বলেন, ‘জোর যার মুল্লুক তার—এমন পেশিশক্তির রাজনীতির বাইরে গ্রিনল্যান্ড দখল করা কিংবা এর ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করার কোনো আইনি অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের ছিল না।’
গত বছর ট্রাম্পের জোরাজুরিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে সামরিক ব্যয় ৫ শতাংশে উন্নীত করতে সদস্যদেশগুলো সম্মত হলেও ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত কোনো দেশই সেই লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি।
১৯৫১ সালেও তৎকালীন ট্রুম্যান প্রশাসন গ্রিনল্যান্ড কেনার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে একটি সামরিক চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আবার দ্বীপটির ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয়, যার বিনিময়ে তারা সেখানে কেবল সামরিক ঘাঁটি তৈরির সুযোগ পায়।
অধ্যাপক প্রেস বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বই সেখানে অতীত ও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির আইনি ভিত্তি দিয়েছে।
ট্রাম্প যা বলেছেন
‘আমি (ক্ষমতায়) আসার আগ পর্যন্ত ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর (প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির) ২ শতাংশ ব্যয় করার কথা ছিল; কিন্তু তারা তা করত না। এমনকি বেশির ভাগ দেশ কোনো অর্থ ব্যয় করত না। বলতে গেলে ন্যাটোর শতভাগ ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হতো। আমি সেটি বন্ধ করেছি। আমি বলেছি, এটা অন্যায্য। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমি ন্যাটোর দেশগুলোকে ৫ শতাংশ ব্যয় করতে রাজি করিয়েছি এবং এখন তারা তা দিচ্ছে।’
ট্রাম্পের এই দাবিও বিভ্রান্তিকর। কয়েক বছর ধরেই তিনি ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর সামরিক ব্যয়ের বিষয়টি ভুলভাবে উপস্থাপন করে আসছেন। মূলত সদস্যদেশগুলো তাদের জাতীয় আয়ের ভিত্তিতে সরাসরি এই জোটে অর্থ দিয়ে থাকে। এ ছাড়া দেশগুলো তাদের জিডিপির একটি নির্দিষ্ট অংশ নিজেদের সামরিক খাতে ব্যয় করতেও রাজি আছে।
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পের চাপের কারণে ন্যাটোর সাধারণ তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান কিছুটা কমেছে। আগে এই জোটের কেন্দ্রীয় বাজেটের প্রায় ২২ শতাংশ দিত যুক্তরাষ্ট্র, যা ২০১৯ সালে ১৬ শতাংশে এবং এই মাসে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
২০১৪ সালে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে তাদের সামরিক ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছিল। ২০১৬ সালে ৩০টির বেশি দেশের মধ্যে মাত্র চারটি দেশ এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছিল। ২০২০ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় আটটিতে।
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে যুদ্ধ করতে মিত্র দেশগুলো হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছিল। শুধু ডেনমার্কই ১৮ হাজার সেনা পাঠিয়েছিল, যাদের মধ্যে ৪৩ জন ২০০২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে নিহত হন
তবে ২০২৪ সালে ১৮টি এবং ২০২৫ সালের মধ্যে ৩১টি দেশ এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। ন্যাটো কর্মকর্তারা সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির জন্য ট্রাম্পকে কিছুটা কৃতিত্ব দিলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণই দেশগুলোকে ব্যয় বাড়াতে বেশি বাধ্য করেছে।
এ ছাড়া গত বছর ট্রাম্পের জোরাজুরিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে সামরিক ব্যয় ৫ শতাংশে উন্নীত করতে সদস্যদেশগুলো সম্মত হলেও ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত কোনো দেশই সেই লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি।
ট্রাম্প যা বলেছেন
‘ইউরোপকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং এখন রাশিয়ার কবল থেকে রক্ষা করা ছাড়া ন্যাটোর কাছ থেকে আমরা কিছুই পাইনি।’
এটি মিথ্যা। ন্যাটো তাদের ইতিহাসে মাত্র একবারই ‘পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ধারা’ (আর্টিকেল ৫) কার্যকর করেছিল, আর তা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে নাইন ইলেভেন হামলার পর।
ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্যদেশের ওপর আক্রমণের অর্থ তা জোটের সব দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হয়। এই ধারার অধীন ন্যাটোর মিত্রদেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমায় রাডার বিমান মোতায়েন থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগরে নৌবাহিনীর টহল—সবখানেই মিত্ররা পাশে ছিল।
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে যুদ্ধ করতে মিত্র দেশগুলো হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছিল। শুধু ডেনমার্কই ১৮ হাজার সেনা পাঠিয়েছিল, যাদের মধ্যে ২০০২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ৪৩ জন নিহত হন।
ট্রাম্পের অন্যান্য মিথ্যা দাবি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও কিছু ভুল ও ভিত্তিহীন দাবি করেছেন, যা ইতিপূর্বে নিউইয়র্ক টাইমস যাচাই করেছে—
১. ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ১৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে এসেছেন, যা সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে এই অঙ্ক তাঁর নিজের হোয়াইট হাউসের হিসাবের চেয়েও দ্বিগুণ এবং এর বড় অংশই কেবল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাধারণ ‘প্রতিশ্রুতি’, যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
২. ট্রাম্প দাবি করেছেন, গত গ্রীষ্মে তাঁর স্বাক্ষরিত রিপাবলিকান কর ও অভ্যন্তরীণ নীতি বিলে ‘সামাজিক নিরাপত্তার ওপর কোনো কর রাখা হয়নি’। এটি বিভ্রান্তিকর। কারণ, ওই আইনের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা আয়ের ওপর কর কিছুটা কমানো হলেও তা পুরোপুরি বিলুপ্ত করা হয়নি।
৩. ট্রাম্পের দাবি, চীনে কোনো বায়ুকল নেই। অথচ বাস্তবতা হলো, বর্তমানে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে চীনের সবচেয়ে বেশি বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে।
৪. জো বাইডেনের প্রশাসন ইউক্রেনকে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। তবে সরকারি ও স্বতন্ত্র বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রকৃত অঙ্কটি ট্রাম্পের দাবি করা অর্থের প্রায় অর্ধেক।
৫. ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে আটটি যুদ্ধ থামিয়েছেন বলে দাবি করেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং অন্যগুলোতে এখনো যুদ্ধ থামেনি।
৬. ট্রাম্প দাবি করেন, বাজারে মুদিপণ্যের দাম ‘কমে আসছে’। অথচ বাস্তবে এখনো নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী।
৭. ট্রাম্প বলেছেন, ওষুধের দাম ৫০০ থেকে ৮০০ শতাংশ এমনকি ২০০০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। সরকারি ও স্বতন্ত্র পরিসংখ্যান বলছে, ওষুধের দাম উল্টো বেড়েছে।
৮. বাইডেন প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে ১১ হাজার ৮৮৮ জন খুনিকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে বলে ট্রাম্প দাবি করেছেন। তাঁর এ দাবি ভুল ও বিভ্রান্তিকর। এই সংখ্যার মধ্যে এমন অভিবাসীও রয়েছেন, যাঁরা ৪০ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে দেশটিতে ঢুকেছেন।
৯. কোনো প্রমাণ ছাড়াই ট্রাম্প দাবি করেছেন, জাহাজে তাঁর সামরিক হামলার ফলে সমুদ্রপথে মাদক পাচার ৯৭ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এমনটি ঘটার কোনো আশঙ্কা নেই।