১ হাজার ৫৭০ কোটি ডলারের সেতু বানানোর প্রতিবাদে ইতালিতে বিক্ষোভ

মেসিনা প্রণালির ওপর সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। সিসিলি দ্বীপের মেসিনায়, ৯ আগস্ট ২০২৫ছবি: এএফপি

সরকারিভাবে একটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন ইতালির সিসিলি দ্বীপের বাসিন্দারা। গতকাল শনিবার সিসিলির মেসিনা শহরে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছে।

১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো (১ হাজার ৫৭০ কোটি ডলার) মূল্যের একটি অবকাঠামো প্রকল্পের আওতায় সেতুটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেতুটি ইতালির মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরের দ্বীপ সিসিলির সংযোগ তৈরি করবে। নির্মাণ হলে এটি হবে বিশ্বের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতু। এসব কারণে শনিবার সিসিলির মেসিনা শহরে প্রায় ১০ হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন।

তবে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রস্তাবিত স্টেট অব মেসিনা ব্রিজ নামক প্রকল্পটির বিরোধিতা করছেন। তাদের আশঙ্কা, সেতুটি নির্মাণ হলে পরিবেশের ক্ষতি হবে, ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়বে এবং মাফিয়ারা প্রভাব বিস্তার করবে।

মেসিনা প্রণালির ওপর সেতুটি নির্মাণের প্রস্তাব নিয়ে কয়েক দশক ধরেই বিতর্ক চলছিল। চলতি সপ্তাহে ইতালির সরকারের কৌশলগত সরকারি বিনিয়োগ–সংক্রান্ত তদারকি কমিটি প্রকল্পটি অনুমোদন করে।

ইতালির পরিবহনমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি এই পরিকল্পনাকে ‘পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প’ বলে অভিহিত করেছেন।

সালভিনি বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রকল্প বছরে ১ লাখ ২০ হাজারের মতো কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং তা দক্ষিণ ইতালির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়ক হবে। তা ছাড়া প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে কয়েক শ কোটি ইউরো বিনিয়োগ করা হবে।

তবে সমালোচকেরা তাতে সন্তুষ্ট নন; বরং ক্ষুব্ধ। কারণ, সেতু নির্মাণের জন্য প্রায় ৫০০ পরিবারকে উচ্ছেদ করতে হবে। তবে সালভিনি বলেন, এসব পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

শনিবার বিক্ষোভকারীরা মেসিনাতে মিছিল করার সময় স্লোগান দিচ্ছিলেন ‘মেসিনা প্রণালিতে হাত দেওয়া যাবে না।’ তাঁদের অনেকের হাতে থাকা ব্যানারে লেখা ছিল ‘নো পোন্তে’ (সেতু নয়)।

মেসিনার ৭৫ বছর বয়সী বাসিন্দা মারিওলিনা দি ফ্রান্সেস্কোর বাড়িটি সেতুর জন্য পরিকল্পিত ৩৯৯ মিটার (৪৪০ গজ) উঁচু একটি ল্যান্ড টাওয়ারের কাছে অবস্থিত। তিনি বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, ‘তারা (সরকার) আমাকে আমার বাড়ির তিন গুণ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করতে পারে; কিন্তু আমার তাতে আগ্রহ নেই। আমার কাছে প্রাকৃতিক দৃশ্য গুরুত্বপূর্ণ। তারা (সরকার) মেসিনা প্রণালি স্পর্শ করতে পারবে না।’

নিজের ঘরের সোফায় মেসিনার ৭৫ বছর বয়সী বাসিন্দা মারিওলিনা দি ফ্রান্সেস্কো
ছবি: রয়টার্স

প্রবীণ ওই বাসিন্দা আরও বলেন, ‘আমাদের আইনজীবীরা ব্যবস্থা নেবেন এবং তাঁদের রুখে দেবেন। এটা নিশ্চিত।’

প্রস্তাবিত সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার (২ দশমিক ৩ মাইল)। এর মধ্যে ঝুলন্ত অংশের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩ কিলোমিটার (২ মাইলের বেশি)। নির্মিত হলে এটি হবে বিশ্বের একক স্প্যান বা সবচেয়ে দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু, যার দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী স্থানে কোনো স্তম্ভ (পিলার) থাকবে না। বর্তমানে তুরস্কের চানাক্কালে সেতুটি বিশ্বের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতু। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১ দশমিক ২৮ কিলোমিটার বা ১ হাজার ২৭৭ মিটার।

ইতালির আলোচিত সেতুটির কাজ শুরুর জন্য দেশটির অডিট আদালতের অনুমোদন লাগবে। আশা করা হচ্ছে, আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ বা অক্টোবরের শুরুতে প্রাথমিক কাজ শুরু হতে পারে। তবে পুরোদমে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ২০২৬ সালে। সাত থেকে আট বছর পর ২০৩২ থেকে ২০৩৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সেতুটি নির্মিত হলে সিসিলি ও ইতালির মূল ভূখণ্ডের মধ্যে আসা-যাওয়ার সময় অনেক কমে যাবে। পরিবহন মন্ত্রী সালভিনির তথ্যমতে, বর্তমানে ফেরিতে করে প্রণালিটি পার হতে সময় লাগে প্রায় ১০০ মিনিট বা ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট। আর সেতু হয়ে গেলে গাড়িতে করে পার হতে সময় লাগবে ১০ মিনিট। সেতু হয়ে গেলে ট্রেনের মাধ্যমে যাত্রার সময়ও ২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট কমবে।

এ প্রকল্প ইতালিকে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। ন্যাটো ইতালিকে এ লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে। ইতালির সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা সেতুটিকে প্রতিরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখাবে।

ইতালি সরকারের যুক্তি হলো, এই সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে দ্রুত সেনা ও সরঞ্জাম মোতায়েনের জন্য একটি কৌশলগত করিডর তৈরি হবে। তাই এটিকে ‘নিরাপত্তা জোরদারকারী অবকাঠামো’ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জমা দিয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, প্রকল্পটি পরিযায়ী পাখিদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে ইতালির প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেছেন, অন্যান্য বড় আকারের অবকাঠামো প্রকল্পের মতোই এই প্রকল্পটিও মাফিয়াবিরোধী আইন মেনে বাস্তবায়িত হবে।