যে তিন অস্ত্র ইউক্রেন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে

ইউক্রেনীয় এক সেনার কাঁধে একটি জ্যাভেলিন অস্ত্রছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের রুশ হামলা শুরুর এক বছর পূর্তি হয়েছে। এক বছর আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন ইউক্রেনে তাঁর বাহিনী পাঠান, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন যুদ্ধে দ্রুত জয় নিশ্চিত করবে মস্কো। তবে রাশিয়ার সাফল্য নিয়ে দেওয়া পূর্বাভাসগুলো বাস্তবে রূপ পায়নি। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জিত না হওয়ার পেছনে ইউক্রেনীয় বাহিনীর দক্ষ সামরিক কৌশলসহ বেশ কয়েকটি কারণ শনাক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা মনে করছেন, পশ্চিমা বিশ্বের সরবরাহ করা অস্ত্রগুলো এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া তিনটি অস্ত্র নিয়ে সিএনএন-একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। সেগুলো হলো—জ্যাভেলিন, হিমার্স ও বেরাকতার টিবি২।

জ্যাভেলিন

যুদ্ধের শুরুর দিকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের দিকে দ্রুত এগিয়ে গিয়েছিল রুশ বাহিনী। সে সময় ইউক্রেনের জন্য এমন কিছুর প্রয়োজন ছিল, যা প্রতিপক্ষের হামলা ঠেকাতে পারবে। আর সে কাজটিই বেশ ভালোভাবে করতে পেরেছে জ্যাভেলিন। এটি কাঁধ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ব্যক্তি একাই এটি পরিচালনা করতে পারেন। ব্যবহারের পদ্ধতি সহজ হওয়ার কারণে এ অস্ত্রের গ্রহণযোগ্যতাও বেশি। মার্কিন কোম্পানি লকহিড মার্টিন ও রেথিয়ন যৌথভাবে ক্ষেপণাস্ত্রটি তৈরি করেছে।

লকহিড মার্টিনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জ্যাভেলিন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার আগে ডিসপ্লেতে কার্সর দিয়ে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে দিতে হয়। জ্যাভেলিন ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর এটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই পরিচালনাকারী ব্যক্তি নিরাপদ অবস্থানে সরে যেতে পারেন। এতে তিনি পাল্টা হামলা থেকেও রেহাই পান।

ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকে রুশ বাহিনী যখন শহর এলাকাগুলোয় ঢোকার চেষ্টা করছিল, তখন জ্যাভেলিন ব্যবহার করে ভালো ফল পেয়েছিল ইউক্রেন। জ্যাভেলিন অপারেটর কোনো ভবন কিংবা গাছের আড়াল থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে নিরাপদে সরে যেতে পারতেন।

রুশ ট্যাংকের দুর্বল জায়গাগুলোও ভেদ করতে পেরেছে জ্যাভেলিন। কারণ, জ্যাভেলিন ছোড়ার পর তা বক্ররেখার মতো ওপরের দিকে উঠে যায় এবং ওপর থেকে নিচে থাকা লক্ষ্যবস্তুর ওপর আছড়ে পড়ে।

যুদ্ধের শুরুর দিকে বেশ কিছু রুশ ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা গিয়েছিল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জ্যাভেলিনের আঘাতের কারণে এমনটা হতে দেখা গেছে।

জ্যাভেলিনের ভূমিকা এতটাই ভালো ছিল যে যুদ্ধের আড়াই মাসের মাথায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আলাবামায় এর উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শন করেছিলেন। ইউক্রেনের সুরক্ষায় সহায়তার জন্য সেখানকার কর্মীদের প্রশংসা করেছিলেন তিনি।

জ্যাভেলিন ব্যবহারের আরও একটি সুবিধা হলো এটি রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য। অন্টারিওর ব্রক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মাইকেল আর্মস্ট্রং দ্য কনভারসেশনে লিখেছিলেন, কম খরচ এবং প্রতিরক্ষামূলক ব্যবহারের কারণে অন্য দেশগুলোর জন্য এগুলো সরবরাহ করাটা রাজনৈতিকভাবেও সহজ।

হিমার্স রকেট-ব্যবস্থা
ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

হিমার্স

এর পুরো নাম এম১৪২ হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম। মার্কিন কোম্পানি লকহিড মার্টিন হিমার্স–ব্যবস্থার প্রস্তুতকারক ও স্বত্বাধিকারী। আসলে হিমার্স–ব্যবস্থা হচ্ছে একটি পাঁচ টন ওজনের ট্রাক, যেখানে একটি উৎক্ষেপণব্যবস্থা আছে এবং তা থেকে প্রায় একই সঙ্গে ছয়টি রকেট ছোড়া যায়। যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখ সারিতে হামলা চালিয়ে পাল্টা হামলা এড়াতে এটি দ্রুত অবস্থান বদল করে ফেলতে পারে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক কানসিয়ান জানুয়ারিতে লেখেন, ‘যুদ্ধের শুরুর ধাপে জ্যাভেলিন যেমন খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তেমনি পরবর্তী ধাপে হিমার্স গুরুত্বপূর্ণ ওঠে।’

হিমার্স যে ধরনের যুদ্ধাস্ত্র ছোড়ে, সেগুলোকে গাইডেড মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম (জিএমএলআরএস) নামে অভিহিত করা হয়। এসব রকেট ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার (প্রায় ৫০ মাইল) দূরত্বের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। জিপিএস–ব্যবস্থায় পরিচালিত হওয়ার কারণে হিমার্স অত্যন্ত যথার্থভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে।

গত জুলাইয়ে রুশ সাংবাদিক রোমান সাপেনকভ বলেছিলেন, তিনি খেরসন বিমানবন্দরে একটি রুশ ঘাঁটিতে হিমার্স রকেট–ব্যবস্থা দিয়ে হামলা হতে দেখেছেন। খেরসন এলাকাটি তখন রুশ বাহিনীর দখলে ছিল।

রোমান সাপেনকভ লিখেছেন, ‘ছোট একটি জায়গার ওপর একসঙ্গে পাঁচ থেকে ছয়টি রকেট এসে পড়ছে, এমন দৃশ্য দেখে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম।’

ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের অধ্যাপক ইয়াজিল হেনকিন বলেন, হিমার্সের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আছে। এ অস্ত্র দিয়ে হামলার কারণে রুশ বাহিনী তাদের গোলা বারুদের ভান্ডার সরিয়ে নিয়েছিল। এতে যুদ্ধক্ষেত্রের খুব কাছে গোলা বারুদ পাওয়াটা রুশ বাহিনীর জন্য খুব একটা সহজ ছিল না। যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাওয়াটা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।

সেতুর মতো লক্ষ্যবস্তুগুলোয় দীর্ঘ পাল্লার এই রকেট ব্যবহার করে হামলা চালানোর কারণে রুশ সরবরাহ প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তুরস্কের বেরাকতার কোম্পানির তৈরি টিবি২ ড্রোন
ছবি: এএফপি

বেরাকতার টিবি২ ড্রোন

এ ড্রোন তুরস্কের নকশায় তৈরি। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে এটি বিশ্বে সবচেয়ে পরিচিত চালকবিহীন ড্রোনগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

এ ড্রোন অপেক্ষাকৃত সস্তা। এটিতে অভিযানের ভিডিও রেকর্ড করা থাকে। এসব ভিডিওতে দেখা গেছে, এ ড্রোন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র, লেজার নিয়ন্ত্রিত রকেট এবং স্মার্ট বোমা ছুড়ে রুশ সাঁজোয়া যান, গোলাবারুদ ও সরবরাহ–ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক আরন স্টেইন লিখেছেন, টিবি২–এর ভাইরাল ভিডিওগুলো টিকটক যুগে আধুনিক যুদ্ধাবস্থার যথার্থ দৃষ্টান্তকে উপস্থাপন করছে। বেরাকতার টিবি২ কোনো জাদু অস্ত্র নয়, তবে এটি যথেষ্ট রকমে ভালো।

তবে বেরাকতার টিবি২ দুর্বল দিকও আছে। আরন স্টেইন মনে করেন, এর গতি কম। আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে এর সক্ষমতাও কম।

যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিও তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে। গোয়েন্দা প্রতিরক্ষাবিষয়ক ওয়েবসাইট ওরিক্সের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেন যে ৪০ থেকে ৫০টি টিবি২ ড্রোন পেয়েছিল, তার মধ্যে ১৭টি যুদ্ধক্ষেত্রে ধ্বংস হয়ে গেছে।

তবে স্টেইন মনে করেন, ড্রোনগুলো সস্তা হওয়ায় এগুলো ধ্বংস হলেও খুব একটা কিছু যায় আসে না। সস্তা হওয়ায় এসব ড্রোন নষ্ট হলে আবার সহজে নতুন ড্রোন নিয়ে আসা যায়।

টিবি২ নিয়ে ইউক্রেনে একটি মিউজিক ভিডিও তৈরি হয়েছে। আর তাতেই বোঝা যায় টিবি২ ইউক্রেনীয়দের কাছে কতটা জনপ্রিয়।