প্রধান যে চারটি জোট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে তারা হলো—

১. মধ্যপন্থী এনসেম্বলে জোট। এতে রয়েছে মাঁখোর রেনেসাঁ (নির্বাচনের আগমুহূর্তে গত ৫ মে দলের নতুন এই নাম দেওয়া হয়), দ্য ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট, হরাইজনস ও তাদের জোটসঙ্গী।

২. বামপন্থী নিউ ইকোলজিক অ্যান্ড সোশ্যাল পিপলস ইউনিয়ন (এনইউপিইএস)। লা ফ্রান্স আসিমিস (এলএফআই), দ্য সোশ্যালিস্ট পার্টি, ইকোলজিস্ট পোল, ফ্রেঞ্চ কমিউনিস্ট পার্টি ও সমমনা দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত জোট।

৩. ইউনিয়ন অব দ্য রাইট অ্যান্ড সেন্টার (ইউডিসি)। এতে রয়েছে রিপাবলিকানরা, দ্য ইউনিয়ন অব ডেমোক্র্যাটস অ্যান্ড ইনডিপেনডেন্টস ও তাদের জোটসঙ্গী।

৪. চরম ডানপন্থী ন্যাশনাল র‌্যালি (আরএন)।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই মাসের মাথায় এনইউপিইএস জোট গঠিত হয়, যখন কিনা বামপন্থার প্রতি অনুরক্ত ভোট ভাগ হয়ে গেছে। নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় দুই পর্বে।
দ্বিতীয় পর্বে মাখোঁর মধ্যপন্থী এনসেম্বলে জোট বেশির ভাগ (২৪৫) আসন নিশ্চিত করতে সমর্থ হয়, কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে দলটির দরকার ছিল আরও ৪৪ আসন।

এনইউপিইএস জেতে ১৩১ আসনে। অন্যদিকে চরম ডানপন্থী আরএন এককভাবে সবচেয়ে বেশি ৮৯ আসনে জয় পায়। ডানপন্থী ইউডিসি হারলেও তাদের ঝুলিতে যাওয়া ৬৪ আসন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে; সরকার গঠনের জন্য দলটি ‘কিংমেকার’ এর আসনে চলে আসে।

রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকারদের মতে, নির্বাচনের এই ফলাফল মাখোঁর জন্য যেমন বড় ধাক্কা, তেমন তা পার্লামেন্টেও অচলাবস্থা সৃষ্টি করেছে।

মাখোঁ ঘোষণা দেন, এরই মধ্যে যেসব দল সরকারে আছে, জোটবদ্ধভাবে বা এককভাবে তাদের নিয়ে জোট সরকার গঠনের কার্যক্রম শুরু হতে পারে। সরকারে থাকা দলগুলো হলো দ্য পার্টি কমিউনিস্ট, দ্য গ্রিন পার্টি, ইইএলভি, পিএস, মাখোঁর এনসেম্বলে জোট ও রক্ষণশীল এলআর।

মাখোঁর এমন ঘোষণায় বামপন্থী লা ফ্রান্স আসিমিস (এলএফআই) ও চরম দক্ষিণপন্থী আরএন, যারা কখনো সরকারে ছিল না, তারা সরকার গঠনের প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ে যায়। এই ‘গভর্নমেন্ট অব অ্যাকশন’–এর নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী এলিজাবেথ বর্নি।
এই জোট সরকারের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর।

অর্থনীতিবিদ জঁ পিসানি–ফেরির ভাষ্য, রাশিয়ার ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের পরিণতিতে ফ্রান্সের জাতীয় আয়ের ২০ শতাংশ কমে যেতে পারে; নাগরিকদের ব্যক্তিগত আয় কমতে পারে ২ শতাংশ। ফলে এটা এমন কিছু আশ্চর্যের নয় যে পুতিনের সঙ্গে দেনদরবারের সময় মাঁখো ‘রাষ্ট্রনায়কোচিত’ আচরণ পছন্দ করেন।

ফ্রান্সের প্রধান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কোম্পানি এডিএফকে পুনরায় রাষ্ট্রীয়করণের সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলেছে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী বর্নি বলেছেন, পুনরায় রাষ্ট্রীয়করণের সিদ্ধান্তের বড় কারণ অবশ্যই দেশের স্বার্থ। যদিও রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর প্রতিবেশী জার্মানির তুলনায় ফ্রান্সের নির্ভরতা কম, তারপরও এ খাতে রাশিয়ার ওপর আর নির্ভরশীল থাকতে চায় না ফ্রান্স।

ফ্রান্সের পথে নেই যুক্তরাজ্য। দেশটির সরকার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোনো সীমা বেঁধে দেয়নি। এখনই এ খাতের কোম্পানিগুলো যাদের প্রায় ৪০ শতাংশ বিদেশি মালিকানাধীন, রেকর্ড মুনাফা উপভোগ করছে। টোরি সরকারের ‘নিষ্ক্রিয়তার’ সুযোগ নিতে পারে কোম্পানিগুলো।

ফ্রান্স তার প্রয়োজনের প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ পায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিশ্চিতের অংশ হিসেবে সরকার ইএফডির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ৮৪ থেকে বাড়িয়ে ১০০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইএফডি ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনও করে কেন্দ্রটি।

রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি বন্ধ করার পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট ঘাটতি পূরণে সরকার ফ্রান্সের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন ঘটানোর পরিকল্পনা করছে। এ পরিকল্পনার অংশ নতুন প্রজন্মের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরস বা পারমাণবিক চুল্লিগুলো। বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে রয়েছে আণবিক চুল্লি, যেগুলো প্রধানত গত শতকের আশির দশকে নির্মিত। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই অতি জরুরি নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক চুল্লি ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা কেবল জ্বালানি ঘাটতি পূরণ করার জন্য নয়, পুরোনোগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে খরচের খাতা বন্ধ করাও।

মানুষের বাসাবাড়িতে দেওয়া বিদ্যুতের দাম এ বছর ৪ শতাংশের বেশি বাড়াতে পারবে না বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো—সরকার এমন সিদ্ধান্তের কথা এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে সরকার নানা কল্যাণ ভাতা বাড়ানোসহ বেশ কিছু জনহিতকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

সম্প্রতি ইউরোপীয় পার্লামেন্ট গ্যাস ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকে ‘গ্রিন’ জ্বালানির শ্রেণিভুক্ত করেছে। তাদের এমন পদক্ষেপ নেওয়ার কারণ ছিল এ ব্যাপারে ফ্রান্স সরকারের অনুরোধ। যদিও সমালোচকেরা একে ‘গ্রিনওয়াশিং’ আখ্যায়িত করেছেন। তবে এ সিদ্ধান্তের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথাকথিত গ্রিন ইনিশিয়েটিভে সরকার ভর্তুকি দিতে পারবে। ফ্রান্স সরকার এরই মধ্যে দেশটির সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ইএফডির বাজেটে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন বা ২১০ কোটি ডলার ভর্তুকি দিতে সম্মত হয়েছে।

ফ্রান্সের ইডিএফ ব্রিটেনের বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের চতুর্থ শীর্ষ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্রিটেনের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশের জোগানদাতা। ব্রিটেনের মোট চাহিদার ১২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ হিস্যা রয়েছে জার্মানির।

নটিংহ্যামে অবস্থিত ইএফডির মালিকানাধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে এখনই বন্ধ করছে না ব্রিটিশ সরকার। দেশটির এমন পদক্ষেপকে পরিবেশবাদী সমালোচকেরা ‘ভন্ডামি’ আখ্যায়িত করেছেন। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি দূষণ ঘটে।

ফ্রান্সের পথে নেই যুক্তরাজ্য। দেশটির সরকার বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোনো সীমা বেঁধে দেয়নি। এখনই এ খাতের কোম্পানিগুলো, যাদের প্রায় ৪০ শতাংশ বিদেশি মালিকানাধীন, রেকর্ড মুনাফা উপভোগ করছে। টোরি সরকারের ‘নিষ্ক্রিয়তার’ সুযোগ নিতে পারে কোম্পানিগুলো।

অবশ্য শিগগিরই তেমন কিছু ঘটছে না। চলতি মাসের গোড়ায় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ইস্তফা দেওয়ার ঘোষণার পর থেকে টোরি সরকারে অচলাবস্থা চলছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ৫ সেপ্টেম্বর জনসনের উত্তরসূরি নতুন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেবেন। এ সময়ের মধ্যে টোরিদের নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা।

যিনি টোরিদের নতুন নেতা নির্বাচিত হবেন, ছয় বছরের মধ্যে তিনি হবেন যুক্তরাজ্যের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী। তাই একের পর এক হাস্যকর সংকটে পতিত টোরি সরকারের হাসির পাত্রে পরিণত হওয়ায় বিস্ময়ের কিছু নেই। ফ্রান্সেরও সমস্যা আছে, কিন্তু এর মধ্যে হাসির খোরাক হওয়ার উপাদান নেই।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন