মারা গেছেন জার্মান দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী ইয়ুর্গেন হেবারমাস

ইহুদি জাদুঘরে ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং অ্যান্ড টলারেন্স’ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন জার্মান দার্শনিক অধ্যাপক ইয়ুর্গেন হেবারমাস। বার্লিন, জার্মানি; ১৩ নভেম্বর ২০১০ছবি: রয়টার্স

রাজনৈতিক ঐকমত্য গঠন তত্ত্বের জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত প্রখ্যাত জার্মান দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী ইয়ুর্গেন হেবারমাস মারা গেছেন। তিনি জনপরিসর তত্ত্বের প্রবর্তক হিসেবেও পরিচিত। শনিবার জার্মানির স্টার্নবার্গে ৯৬ বছর বয়সে হেবারমাসের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে তাঁর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জুহকাম্প।

যুদ্ধোত্তর জার্মানির জনপরিসরে যেকোনো জনপ্রিয় বুদ্ধিজীবীর চেয়ে তাঁর চিন্তার প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘ সাত দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান জার্মানিকে বিভিন্ন সংকটময় মুহূর্তে পথ দেখিয়েছে।

পঞ্চাশের দশকে ফ্যাসিবাদী চিন্তাধারার তীব্র সমালোচনা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানিতে পুনরুত্থান ঘটা সামরিকবাদ ও জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে তাঁর জোরালো সতর্কবার্তা—সবকিছুই দেশটির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে।

শুধু তাঁর দীর্ঘায়ু নয়, বরং যে দেশে যুদ্ধোত্তর শান্তিবাদ ক্রমে ম্লান হয়ে আসছে এবং কট্টর ডানপন্থী দল ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’ (এএফডি) পার্লামেন্টে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিতে পরিণত হয়েছে, সেখানে তাঁর চিন্তাধারার নতুন প্রাসঙ্গিকতাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

‘জনতার দিশারি’

১৯২৯ সালের ১৮ জুন ডুসেলডর্ফের এক বুর্জোয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন হেবারমাস। জন্মের পর এবং শৈশবের শুরুর দিকে ঠোঁটকাটা সমস্যার কারণে তাঁর দুবার অস্ত্রোপচার হয়েছিল। এর ফলে সৃষ্ট কথা বলার জড়তা তাঁর ‘যোগাযোগ’ বা ‘কমিউনিকেশন’ সংক্রান্ত তত্ত্বের ওপর প্রভাব ফেলেছিল বলে প্রায়ই বলা হয়।

হেবারমাস একটি কট্টর প্রোটেস্ট্যান্ট পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন অর্থনীতিবিদ, যিনি ১৯৩৩ সালে নাৎসি পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে হেবারমাসের ভাষ্যমতে, তাঁর বাবা ছিলেন কেবল একজন ‘নিষ্ক্রিয় সমর্থক’।

তৎকালীন জার্মানির অধিকাংশ কিশোরের মতো হেবারমাসও ‘হিটলার ইয়ুথ’-এ যোগ দিয়েছিলেন। যুদ্ধের শেষ দিকে ১৫ বছর বয়সে সামরিক পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি নাৎসি বাহিনীতে নিয়োগ এড়াতে সক্ষম হন।

বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় হেবারমাস তাঁর সহপাঠী উটে ভেসেলহফ্টের প্রতি আকৃষ্ট হন। আধুনিক শিল্পকলা, চলচ্চিত্র এবং সাহিত্যের প্রতি তাঁদের দুজনেরই ছিল গভীর অনুরাগ। ১৯৫৫ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। গত বছর ভেসেলহফ্ট মারা যান। তাঁদের সন্তান তিলমান ও জুডিথ জীবিত আছেন। তাঁদের তৃতীয় সন্তান রেবেকা ছিলেন একজন আধুনিক যুগের ইতিহাসবিদ। তিনি ২০২৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৫০-এর দশকে একজন সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে প্রথম পরিচিতি লাভ করেন হেবারমাস। তিনি ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল এবং থিওডোর অ্যাডর্নো ও ম্যাক্স হরখাইমারের মতো মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন।

নিজের গবেষণাপত্রে হেবারমাস ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ বা জনপরিসরের বিবর্তনের রূপরেখা তুলে ধরেন। এতে আঠারো শতকের ইউরোপীয় বুর্জোয়া শ্রেণির বৈঠকখানা থেকে শুরু করে বিশ শতকে গণমাধ্যম-নিয়ন্ত্রিত জনপরিসরে এর রূপান্তরের বিষয়টি উঠে আসে।

হেবারমাসের এই বার্তা যুদ্ধোত্তর পশ্চিম জার্মানদের হৃদয়ে গভীরভাবে সাড়া জাগিয়েছিল। নাৎসি একনায়কতন্ত্র থেকে মুক্তির পর সেই সময়ের পশ্চিম জার্মানরা তখন সবে স্বাধীনভাবে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে শিখছিল। এমন এক রক্ষণশীল সরকারের প্রেক্ষাপটে তারা এই শিক্ষা নিচ্ছিল, যাদের ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা ছিল খুবই সামান্য।

হেবারমাসের জীবনীগ্রন্থ ‘দ্য ফিলোসফার’–এর লেখক ফিলিপ ফেলশ বলেছেন, হেবারমাস যুদ্ধোত্তর জার্মানদের জন্য একধরনের ‘জনতার দিশারি’ হয়ে উঠেছিলেন। একটি উদারনৈতিক গণতন্ত্র বজায় রাখার ক্ষেত্রে জার্মানদের সক্ষমতা নিয়ে তিনি একই সঙ্গে আশাবাদী এবং সন্দিহান ছিলেন।