যুদ্ধে মারা গেছেন ভেবে মৃতদেহ সৎকার করল পরিবার, দুই বছর পর মা পেলেন ছেলের ফোন

বিবিসির প্রতিবেদনের একাংশের স্ক্রিনশট।Tausif Ahmed

ইউক্রেনীয় সেনাসদস্য নাজার দালিটস্কি যুদ্ধে নিহত হয়েছেন বলেই নিশ্চিত ছিল তাঁর পরিবারের সদস্যরা।

এমনকি ২০২৩ সালে পশ্চিম ইউক্রেনের একটি গ্রাম্য কবরস্থানে তাঁরা নাজার ভেবে একজনের মরদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াও করেছিলেন।

ওই ঘটনার প্রায় দুই বছর পর ঘটল সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা। সম্প্রতি সেই নাজারই তাঁর মাকে ফোন করেছেন। জানিয়েছেন, তিনি শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল ও ক্লান্ত হলেও বেঁচে আছেন।

সম্প্রতি বন্দিবিনিময়ের আওতায় রুশ বন্দিশালা থেকে মুক্তি পেয়েছেন নাজার।

সেই সেনাসদস্যের মা নাতালিয়া বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘আমার আবেগ খুব তীব্র ছিল।’ তিনি এখনো ঘোরের মধ্যে আছেন।

প্রথম সেই ফোনকল পাওয়ার পর পুরো পরিবারের যে আনন্দ, তা ভিডিওতে ধরা পড়েছে, যা দেখে যে কারও মন ছুঁয়ে যাবে।

নাতালিয়া তাঁর ছেলেকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি অক্ষত আছেন কি না। তিনি জানতে চাচ্ছিলেন, ‘তোমার হাত-পা সব ঠিক আছে তো?’ তিনি বলেছেন, ‘আমার সোনা বাচ্চা, আমি কত দিন ধরে তোমার অপেক্ষায় ছিলাম।’

ভিডিওর শেষের অংশে নাজারের চাচাতো বোন রোকসোলানাকে আনন্দে চিৎকার করতে ও লাফাতে দেখা যায়। নাতালিয়া বলেন, ‘বিষয়টি ছিল বেশ অদ্ভুত। কারণ, আমার ছেলে নিহত হয়েছিলেন। আমি নিজে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ছিলাম। অথচ এখন তাঁর কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি। একজন মায়ের সেই সময়ের অনুভূতিগুলো কী হতে পারে, আপনি কল্পনা করতে পারেন? আনন্দ! ভীষণ আনন্দ! আমি আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলাম না।’

সমাধি থেকে নাজারের ফিরে আসার পুরো গল্প অকল্পনীয়। বিশেষ করে দেশ যখন যুদ্ধের এই ডামাডোলের মধ্যে, এমন সুসংবাদ ইউক্রেনীয়দের কাছে দারুণ খুশির।

২০২২ সালে যখন রাশিয়া পুরোমাত্রায় ইউক্রেন আক্রমণ শুরু করে, ৪২ বছর বয়সী নাজার সরাসরি রণক্ষেত্রে চলে যান। তিনি ইতিমধ্যে ২০১৪ সালে যুদ্ধ করেছিলেন। তাই তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ।

নাজারের চাচাতো বোন বিবিসিকে বলেন, তাঁর মনে কোনো দ্বিধা ছিল না। তিনি তৎক্ষণাৎ যুদ্ধে চলে যান।

কিন্তু যুদ্ধের প্রথম বছরে মে মাসেই রণাঙ্গনে নিখোঁজ হন নাজার।

এরপর নাজারের মা রুশ ভাষায় কথা বলা এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি ফোন পান। সেই ব্যক্তি বলেন, নাজারকে বন্দী করা হয়েছে, কিন্তু ‘সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে’।

সেই রহস্যময় কণ্ঠটি নাজার কোথায় আছেন, কারা তাঁকে আটকে রেখেছে, কিংবা তিনি আহত কি না, সে সম্পর্কে কিছুই বলেনি। পরিবার বুঝে উঠতে পারছিল না, তাঁর কথাগুলো বিশ্বাস করবে কি না। আর সরকারিভাবেও নাজারের পরিবার কোনো খবর পাচ্ছিল না।

নাজারের পরিবারের এমন অবস্থা এক বছর চলেছিল। পরে নাতালিয়াকে জানানো হয়েছিল, তাঁর দেওয়া ডিএনএ নমুনা ব্যবহার করে দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের একটি মর্গে একটি মৃতদেহ শনাক্ত করা হয়েছে।

রোকসোলানা ব্যাখ্যা করেন, দেহটি মারাত্মকভাবে পুড়ে গিয়েছিল। একটি পোড়া বাসের ভেতর থেকে তারা বেশ কয়েকটি মরদেহ খুঁজে পেয়েছিল। যখন তারা নিখোঁজ সৈনিকদের তালিকা দেখতে শুরু করল, তখন তথ্যটি মিলে যায়।

রোকসোলানা বলেন, তাঁরা সেই মরদেহটিকে নাজার হিসেবেই শনাক্ত করেন।

এরপর পরিবারটি সেই মরদেহ গ্রহণ করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে। পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া।

এরপর গত সেপ্টেম্বরে নাতালিয়া জীবনের সবচেয়ে বড় চমকটি পান।

রাশিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া এক ইউক্রেনীয় সেনা তাঁদের ফোন করে জানান, নাজার বেঁচে আছেন। তিনি তাঁকে কারাগারে দেখেছেন।

সে সময়ের অনুভূতি মনে করে রোকসোলানা বলেন, ‘আমরা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, এটা বিশ্বাস করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু তিনি কেনই–বা মিথ্যা বলবেন?’

তবুও নাজারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা বা তাঁকে দেখা ছাড়া, তাঁরা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছিলেন না।

অবশেষে চলতি সপ্তাহে, নাজার ফোন করেন, তিনি ইউক্রেনের মাটিতে ফিরেছেন।

নাতালিয়ার ছেলে দীর্ঘ ৩ বছর ৯ মাস নিখোঁজ ছিলেন।

যখন নাতালিয়ার পরিবারের সদস্যরা তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় পুনর্মিলনের জন্য অপেক্ষা করছেন, তখন তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নাজারের শেষকৃত্যের তথ্য সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন, যাতে তিনি (নাজার) কষ্ট না পান।

নাতালিয়ার পরিবারকে গ্রামের ‘নিহত বীরদের’ প্রদর্শনী থেকেও নাজারের ছবিটি নামিয়ে ফেলতে হয়েছে।

কীভাবে এমন মর্মান্তিক ভুল হলো, তা খতিয়ে দেখতে এখন তদন্ত চলছে।

কিন্তু এই মুহূর্তে পরিবারটির মনোযোগ দেওয়ার মতো আরও অনেক বিষয় রয়েছে।

নাজারের মা তাঁর সন্তানের প্রিয় সব খাবার রান্না করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

রোকসোলানা বলেন, ‘আমি চাই, আমাদের মতো অন্য পরিবারগুলোও এমন ইতিবাচক খবর পাক। সবার প্রিয়জনেরা যেন ঘরে ফিরে আসে।’

ইউক্রেনে বর্তমানে সরকারিভাবে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ নিখোঁজ, যাঁদের বড় অংশই সেনাসদস্য। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা গেছেন এবং তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করাও সম্ভব হয়নি।

তবে অনেকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটকে আছেন এবং তাঁদের পরিবারের কাছে নাজারের এই ফিরে আসা আশার ক্ষীণ আলো হয়ে থাকবে।

নাতালিয়া বলেন, ‘আমি চাই, সব নারী, মা ও সন্তান যেন আমাদের মতো এমন একটি ফোনকল আর এমন আনন্দের দেখা পান।’

নাতালিয়া বলেন, ‘আমি এখন শুধু আমার ছেলের অপেক্ষায় আছি, ওকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে। আমি ওকে অনেক ভালোবাসি।’