দ্য গার্ডিয়ানের এক্সপ্লেইনার
সেউতায় অভিবাসীদের ঢল: কেন এ সংকট, কীভাবে সীমান্ত পেরোল হাজারো মানুষ
সাম্প্রতিক দিনগুলোয় স্পেনের ছোট স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সেউতা ও মরক্কোর মধ্যকার সীমান্তে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। এ সুযোগে ৫০ থেকে ৬০ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী হঠাৎ করেই সেউতায় প্রবেশ করেন। এতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ৬৭ জনের মতো মারা গেছেন।
সেউতায় পৌঁছানো অভিবাসনপ্রত্যাশী মানুষের সংখ্যা সেখানকার স্বাভাবিক জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। গত শুক্রবার সেখানে একটি গুরুতর মানবিক সংকট তৈরি হয়।
শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষকে আবার মরক্কো সীমান্তে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় আরও শত শত মানুষকে ফিরতে দেখা গেছে।
মরক্কোর সঙ্গে সেউতা ছাড়াও স্পেনের আরেক স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড মেলিইয়ার সীমান্ত রয়েছে। এ দুই শহর আফ্রিকাকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করেছে। মেলিইয়া অঞ্চলটি উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল থেকে প্রায় ২৫০ মাইল পূর্বে অবস্থিত।
মরক্কোর সঙ্গে সেউতা ছাড়াও স্পেনের আরেক ভূখণ্ড মেলিইয়ার সীমান্ত রয়েছে। শহর দুটি আফ্রিকার সঙ্গে ইউরোপকে যুক্ত করেছে। মেলিইয়া অঞ্চলটি উত্তর আফ্রিকার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল থেকে প্রায় ২৫০ মাইল পূর্বে অবস্থিত।
১৫৮০ সাল থেকে স্পেনের নিয়ন্ত্রণে আছে সেউতা। অঞ্চলটিতে খ্রিষ্টান ও মুসলিম—দুই সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। স্পেন ও মরক্কো থেকে আসা বাসিন্দা এবং দিনমজুরেরা তুলনামূলক শান্তিপূর্ণভাবেই সেখানে বসবাস করেন। তবে মরক্কো আনুষ্ঠানিকভাবে সেউতা ও মেলিইয়াকে স্পেনের ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। দেশটি এগুলো প্রায়ই ‘দখলকৃত ভূখণ্ড’ বলে উল্লেখ করে থাকে।
সেউতা কেন অভিবাসন সংকটের অন্যতম কেন্দ্র
উন্নত অর্থনৈতিক সুবিধার খোঁজে কিংবা নিজ দেশে সহিংসতা ও সংঘাত থেকে পালিয়ে ইউরোপে আসতে চাওয়া মানুষের জন্য অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে স্পেন। উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের ওই দুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তাই মরক্কো এবং আফ্রিকার অন্যান্য দেশ থেকে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করা মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। এ কারণে অঞ্চল দুটিতে অত্যন্ত কঠোর সীমান্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও রয়েছে।
সেউতা বা মেলিইয়াতে পৌঁছানো অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশীকে সঙ্গে সঙ্গেই মরক্কোতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে কেউ কেউ স্পেনে আশ্রয়লাভের আবেদন করার সুযোগ পান এবং আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের অভিবাসী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়।
সেউতায় পৌঁছাতে অনেকে মরক্কোর উপকূলীয় শহর ফনিদেক থেকে প্রায় তিন মাইল (পাঁচ কিলোমিটার) সাঁতরে সমুদ্র পাড়ি দেন। আবার কেউ আরও কাছের শহর বেলিউনেশ থেকেও সেউতা পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
২০২২ সালে মরক্কো থেকে মেলিইয়াতে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় প্রায় ২ হাজার অভিবাসীর মধ্যে অন্তত ২৩ জন নিহত হন। তাঁদের বেশির ভাগই সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে অবস্থিত আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিক। এরও আগে ২০১৪ সালে সেউতায় প্রায় ২০০ অভিবাসী সীমান্তবেড়া টপকে অথবা শহরটিকে মরক্কোর ভূখণ্ড থেকে আলাদা করা সমুদ্রবাঁধের পাশ দিয়ে সাঁতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়।
তবে সাধারণভাবে সেউতা ও মেলিইয়াতে পৌঁছানো অভিবাসীর সংখ্যা স্পেনের ক্যানারি ও বালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ হয়ে দেশটিতে পৌঁছানো অভিবাসীর তুলনায় অনেক কম।
২০২২ সালে মরক্কো থেকে মেলিইয়াতে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় প্রায় দুই হাজার অভিবাসীর মধ্যে অন্তত ২৩ জন নিহত হন। তাঁদের বেশির ভাগই সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে অবস্থিত আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিক। এরও আগে ২০১৪ সালে সেউতায় প্রায় ২০০ অভিবাসী সীমান্তবেড়া টপকে অথবা শহরটিকে মরক্কোর ভূখণ্ড থেকে আলাদা করা সমুদ্রবাঁধের পাশ দিয়ে সাঁতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়।
গত কয়েক দশকে স্পেনে অভিবাসী জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ৫ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে প্রায় ১ কোটি মানুষ বিদেশি। তাঁদের অনেকে কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা ও মরক্কো থেকে এসেছেন এবং কৃষি, পর্যটন, সেবাসহ স্পেনের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন।
অন্তত ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রতিবছর উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ও তুরস্ক থেকে হাজারো মানুষ ইউরোপে আশ্রয় পাওয়ার আশায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে আসছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের ৩৫ হাজার ১৫৩টি মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৬ সালের প্রথম ৭ মাসেই ১ হাজার ৪৯৩ অভিবাসী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন।
কীভাবে এত মানুষ সীমান্ত পার হতে পারল
এটি ঠিক কী কারণে ঘটেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে মরক্কোর কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। সীমান্ত অতিক্রম ঠেকাতে তারা কতটা কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল, সেটিও পরিষ্কার নয়।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এ ঘটনা মরক্কো ও আলজেরিয়ার দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সাম্প্রতিক আলজিয়ার্স সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে থাকতে পারে।
এর আগে ২০২১ সালের মে মাসে পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের সংগঠন পোলিসারিও ফ্রন্টের নেতাকে কোভিড-১৯-এর চিকিৎসার জন্য স্পেনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়াকে কেন্দ্র করে দেশটির সঙ্গে মরক্কোর কূটনৈতিক বিরোধ হয়েছিল। সেই বিরোধ চলাকালে মরক্কো তাদের সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে দেয়। এতে হাজারো মানুষ একযোগে সেউতায় ঢুকতে সক্ষম হন।
মরক্কো ও পোলিসারিও ফ্রন্ট—উভয়ই পশ্চিম সাহারার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দাবি করে থাকে। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত অঞ্চলটি স্পেনের উপনিবেশ ছিল। পরে স্পেন পশ্চিম সাহারার নিয়ন্ত্রণ মরক্কো ও মৌরিতানিয়ার হাতে তুলে দেয়।
২০২২ সালে সেই কূটনৈতিক সংকটের অবসান হয়। তখন স্পেন বহু বছরের নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে এসে পশ্চিম সাহারা নিয়ে মরক্কোর প্রস্তাবকে সমর্থন করে। এতে পলিসারিও ফ্রন্টকে সমর্থনকারী আলজেরিয়ার সঙ্গে স্পেনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
এরপর গত ২০ জুলাই স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্স সফর করেন। এটি ছিল চার বছরের মধ্যে স্পেনের কোনো প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সে দেশ সফর। এ সফরকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
শুক্রবার সেউতা সফরকালে সানচেজ বলেন, আকস্মিক এই অভিবাসী–ঢলের জন্য মানব পাচারকারীদের ছড়ানো গুজব দায়ী। তাঁরা রটিয়েছিলেন, সমুদ্রপথে স্পেনে পৌঁছানো অনিয়মিত অভিবাসীদের আর সঙ্গে সঙ্গে ফেরত পাঠানো যাবে না বলে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন।
সরকার ও কর্তৃপক্ষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে
সীমান্ত দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রবেশ করার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্পেন অতিরিক্ত পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করে। পেদ্রো সানচেজ এ ঘটনাকে ‘স্পেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন’ বলে আখ্যায়িত করেন।
সীমান্তে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার ছবি ও ভিডিও প্রকাশের পর স্পেন সরকার রাজনৈতিক চাপে পড়ে। একই সঙ্গে এ ঘটনাকে ঘিরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোর মধ্যেও মতভেদ দেখা দেয়। ডানপন্থী রাজনীতিকেরা এ ঘটনার জন্য চলতি বছর অনিয়মিতভাবে দেশে থাকা কয়েক লাখ অভিবাসীকে বৈধতা দিতে স্পেন সরকারের নেওয়া নীতিকে দায়ী করেছেন।
ইতালির কট্টর ডানপন্থী সরকার তো স্পেনকে শেনজেন মুক্ত চলাচল অঞ্চল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কারের আহ্বানও জানিয়েছে। যদিও সেউতা ও মেলিইয়া শেনজেন ব্যবস্থার আওতাভুক্ত নয়।
এদিকে ফ্রান্স তার স্পেনসংলগ্ন সীমান্তে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করেছে।