পাহাড়ের চূড়ার কাছে প্রেমিকাকে ফেলে যান প্রেমিক, বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে কী হতে পারে
বছরখানেক আগে অস্ট্রিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতের চূড়ার কাছে ঠান্ডায় জমে ৩৩ বছর বয়সী এক নারীর মৃত্যু হয়। গত বৃহস্পতিবার তাঁর প্রেমিককে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রেমিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মারা যাওয়া নারীর নাম কেরস্টিন গুর্টনার। তিনি গত বছর জানুয়ারিতে পর্বতারোহী একটি দলের সঙ্গে অস্ট্রিয়ার সর্বোচ্চ পর্বত গ্রোসগ্লকনা জয়ে বের হন। কিন্তু মাঝপথে অভিযাত্রী দলটি ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। পাহাড়ের চূড়ার কাছে হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কেরস্টিন মারা যান।
পরে অভিযোগ ওঠে, ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ভোরের দিকে ঝোড়ো আবহাওয়ার মধ্যে কেরস্টিনের প্রেমিক তাঁকে চূড়ার কাছাকাছি এলাকায় অরক্ষিত ও ক্লান্ত অবস্থায় ফেলে রেখে ‘সাহায্যের খোঁজে’ চলে যান।
এখন সেই প্রেমিককে গুরুতর অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। এই বিচার শুধু অস্ট্রিয়াতেই নয়, দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে আরও বহু দূর পর্যন্ত পর্বতারোহী দলগুলোর মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ ও বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
প্রসিকিউটররা বলেছেন, বেশি অভিজ্ঞ পর্বতারোহী হিসেবে বিচারের মুখে থাকা ওই ব্যক্তি এই অভিযানের ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত গাইড’ ছিলেন। কিন্তু তিনি পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সময়মতো ফেরত আসেননি বা সময়মতো প্রেমিকার জন্য সাহায্য চাইতে ব্যর্থ হয়েছেন।
অস্ট্রিয়ার গণমাধ্যমগুলোয় ওই ব্যক্তির নাম টমাস পি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
টমাসের আইনজীবী কার্ল ইয়েলিনেক আদালতের সামনে কেরস্টিনের মৃত্যুকে ‘একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
মর্মান্তিক এই ঘটনা ঘটে ১২ হাজার ৪৬০ ফুট উচ্চতার গ্রোসগ্লকনার পর্বতে আরোহণ করতে গিয়ে।
প্রসিকিউটররা টমাস পির বিরুদ্ধে শুরু থেকেই ভুল করার অভিযোগ আনেন। তাঁরা টমাসের ৯টি ভুলের একটি তালিকাও আদালতের সামনে তুলে ধরেছেন।
এ মামলায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কখন ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও ঝুঁকি গ্রহণ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অপরাধমূলক অবহেলার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
যদি এ মামলায় ওই পর্বতারোহীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, তবে তা পর্বতারোহণ জগতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
অস্ট্রিয়ার টিরোল প্রদেশের রাজধানী ইনসব্রুকে এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘টমাসকে অভিযানের দায়িত্বপ্রাপ্ত গাইড হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ, তিনি তাঁর প্রেমিকার তুলনায় উচ্চ-উচ্চতার আলপাইন সফরে অধিকতর অভিজ্ঞ ছিলেন এবং ওই অভিযানের পরিকল্পনা করেছিলেন।’
কী ঘটেছিল
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, টমাসই ওই পর্বতাভিযানের পরিকল্পনা করেছিলেন। যদিও তিনি জানতেন যে তাঁর প্রেমিকা এর আগে কখনোই এ ধরনের দীর্ঘ, কঠিন এবং উচ্চ উচ্চতার আলপাইন পর্বতাভিযানে যাননি। শীতকাল হওয়ায় পরিস্থিতিও বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল।
আইনজীবীদের আরও অভিযোগ, টমাস নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দুই ঘণ্টা দেরিতে অভিযান শুরু করেছিলেন এবং ‘তাঁবুসহ পর্যাপ্ত জরুরি সরঞ্জাম’ সঙ্গে নিতে ব্যর্থ হন। এ ছাড়া তিনি তাঁর প্রেমিকাকে এমন বুট–জুতা ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন, যেগুলো পাহাড়ের উচ্চতায় বরফ ও শিলামিশ্রিত ভূমিতে ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত নয়।
আসামিপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এক বিবৃতিতে টমাসের আইনজীবী বলেছেন, এই প্রেমিক জুটি একসঙ্গে বসে এই অভিযানের পরিকল্পনা করেছিলেন।
আইনজীবী আরও বলেন, এই জুটির দুজনই নিজেদের যথেষ্ট অভিজ্ঞ, পর্যাপ্ত প্রস্তুত ও সুসজ্জিত মনে করেছিলেন। দুজনেরই আলপাইনে অভিযানের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ছিল এবং তাঁরা দুজনই খুব ভালো শারীরিক অবস্থায় ছিলেন।
এ মামলায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কখন ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও ঝুঁকি গ্রহণ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অপরাধমূলক অবহেলার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
প্রসিকিউটররা বলেন, পর্বতে ঘণ্টায় ৭৪ কিলোমিটার পর্যন্ত বেগে প্রবল বাতাস বয়ে যাচ্ছিল। তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু প্রবল বাতাসের কারণে অনুভূত তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এমন তীব্র ঠান্ডার পরিবেশে ওই প্রেমিক যুগলের আর সামনে অগ্রসর না হয়ে ফিরে আসা উচিত ছিল।
জবাবে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, প্রেমিক জুটি ১৮ জানুয়ারি বেলা ১টা ৩০ মিনিটে ফ্র্যুশটুক্সপ্লাত্স নামের একটি জায়গায় পৌঁছান। এটি ছিল অভিযানের এমন একটি পর্যায়, যার পর চূড়ায় ওঠার আগে আর ফিরে আসার সুযোগ ছিল না।
তা ছাড়া যেহেতু ওই জুটির কেউই ‘অতিরিক্ত ক্লান্ত ছিলেন না’, তাই তাঁরা এগিয়ে যেতে থাকেন; যোগ করেন টমাসের আইনজীবী।
প্রসিকিউটররা অভিযোগ তুলে বলেন, ১৮ জানুয়ারি রাত প্রায় ৮টা ৫০ মিনিটে প্রেমিক যুগল আটকে পড়েন। এরপর টমাস পুলিশে ফোন করতে ব্যর্থ হন এবং রাত প্রায় ১০টা ৫০ মিনিটে যখন পুলিশের একটি হেলিকপ্টার তাঁদের ওপর দিয়ে উড়ে যায়, তখনো তিনি কোনো বিপদসংকেত পাঠাননি।
টমাসের আইনজীবী জবাবে বলেন, ওই সময় তাঁর মক্কেল ও মক্কেলের প্রেমিকা দুজনই তখন পর্যন্ত নিজেদের শারীরিকভাবে সুস্থ ও ভালো অনুভব করছিলেন। তা ছাড়া, তাঁরা চূড়ার খুব কাছাকাছি ছিলেন বলে সাহায্য চাননি।
ওয়েবক্যামের ছবিতে দেখা যায়, ওই জুটি সে সময় পাহাড় বেয়ে উঠছিলেন এবং তাঁদের টর্চের আলো জ্বলছিল।
আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতের কাছে দাবি করেন যে কিছুক্ষণ পরই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। তাঁর মক্কেল ‘সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে’ দেখতে পান, তাঁর প্রেমিকার মধ্যে ‘হঠাৎ করেই অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যেতে শুরু করে’। ততক্ষণে ফিরে আসার আর সময় ছিল না।
১৯ জানুয়ারি রাত ১২টা ৩৫ মিনিটে টমাস পর্বত পুলিশকে ফোন করেন। কথোপকথনের বিস্তারিত স্পষ্ট নয়। তবে টমাসের আইনজীবী দাবি করেন, তাঁর মক্কেল সাহায্য চেয়েছিলেন এবং পুলিশকে বলেননি যে ‘সবকিছু ঠিক আছে’।
পুলিশের অভিযোগ, এরপর টমাস ফোনটি সাইলেন্ট মোডে রাখেন। পুলিশ তাঁকে বারবার ফোন করেছিল। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি।
টমাস ও কেরস্টিন গ্রোসগ্লকনার চূড়ার ক্রস চিহ্নের প্রায় ১৩০ ফুট নিচ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, এরপর কেরস্টিন অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তিনি আর নড়াচড়া করতে পারছিলেন না। তখন টমাস তাঁকে রেখে সাহায্যের খোঁজে বেরিয়ে যান। তিনি চূড়ায় পৌঁছান এবং অন্য পাশ দিয়ে নিচে নেমে যান।
প্রসিকিউটররা বলেন, টমাস রাত দুইটার দিকে কেরস্টিনকে ফেলে রেখে চলে যান। যখন তিনি পর্বতশিখর থেকে নামছিলেন, তখন ওয়েবক্যামেরায় টর্চের আলোয় তাঁর চেহারা ধরা পড়ে।
প্রসিকিউটররা বলেন, টমাস অ্যালুমিনিয়াম রেসকিউ ব্ল্যাঙ্কেট বা অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করে কেরস্টিনকে ঠান্ডা থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেননি। আর জরুরি পরিষেবাকে জানানোর জন্য রাত সাড়ে তিনটা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন।
সম্ভবত ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। রাতের বেলায় ঝোড়ো বাতাসের ভেতর উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের পক্ষে কাজ করা সম্ভব হয়নি। বরফঢাকা পাহাড়ে তুষারের নিচে একাকী ঠান্ডায় জমে মারা যান কেরস্টিন।
যদি এ মামলায় টমাস দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে তাঁর সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
এ মামলার প্রভাব শুধু টমাসের ওপর নয়, অন্য পর্বতারোহীদের ওপরও পড়তে পারে। ভবিষ্যতে পর্বতারোহীরা তাঁদের সঙ্গীদের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল হবেন, তা হয়তো এ মামলার রায় অনেকটা নির্ধারণ করে দেবে।