বুধবার পুতিন জাতির উদ্দেশে টেলিভিশনে ভাষণ দেন পুতিন। এতে তিনি ‘আংশিক সেনা সমাবেশ’ করার ঘোষণা দেন। এ আংশিক সেনা সমাবেশে তিন লাখ রিজার্ভ সৈন্যকে ডাকা হবে বলে তিনি জানান। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় রাশিয়ার এ সেনা সমাবেশকে বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে দেখা হচ্ছে। পুতিনের এ ঘোষণার পর বিক্ষোভ শুরু করেন যুদ্ধবিরোধী রুশ নাগরিকেরা। মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গ ছাড়াও বিক্ষোভ হয়েছে সাইবেরিয়ার ইরকুতস্ক শহর ও ইয়েকাতেরিনবার্গের মতো শহরগুলোতে।

এদিকে পুতিনের এমন ঘোষণার পর রাশিয়া থেকে ছাড়া বিমানের টিকিট বিক্রি বেড়ে গেছে। অনেকেই তড়িঘড়ি করে দেশ ছাড়ছেন। যেসব দেশে ভিসা ছাড়াই রুশ নাগরিকেরা যেতে পারেন, সেখান দিয়েই ছুটছেন তাঁরা। বিশেষ করে জর্জিয়া সীমান্ত দিয়ে লোকজন দেশ ছাড়ছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ সীমান্ত দিয়ে ১ লাখ ৪০ হাজার লোক দেশ ছেড়েছেন। তবে রুশ কর্তৃপক্ষ লোকজনের দেশ ছেড়ে পালানোর খবরকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

পুতিন তাঁর ভাষণে ইউক্রেন ও এর পশ্চিমা মিত্রদের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘রাশিয়ার ভূখণ্ড রক্ষায় সামর্থ্যে থাকা সব উপায় প্রয়োগ করব। প্রয়োজনে পারমাণবিক অস্ত্রও ব্যবহার করা হবে। পশ্চিমারা যদি “পারমাণবিক ব্ল্যাকমেল” অব্যাহত রাখে, তাহলে মস্কো তার হাতে থাকা অস্ত্রের বিশাল মজুতের শক্তি দিয়েই জবাব দেবে।’

এদিকে নতুন করে সেনা মোতায়েনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের সতর্ক করেছে রাশিয়ার সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয়। বিক্ষোভকে অননুমোদিত আখ্যা দিয়ে ওই কার্যালয় থেকে বলা হয়, ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিক্ষোভে অংশ নিতে আহ্বান করা হলে এবং বিক্ষোভে অংশ নিলে সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীকে অসম্মান করা, ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান সম্পর্কে ‘ভুয়া খবর’ ছড়ানো বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিক্ষোভে অংশ নিতে উত্সাহিত করার অভিযোগ আনা হতে পারে।

রুশ মানবাধিবার সংগঠন ওভিডি–ইনফো জানায়, এরই মধ্যে সমাবেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে আটক ১৬ জনকে সামরিক দায়িত্ব পালনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশটির অনেক বিশ্লেষক বলছেন, অননুমোদিত বিক্ষোভকারীদের কারাদণ্ড ছাড়াও ইউক্রেনে সম্মুখযুদ্ধে পাঠানো হতে পারে।

বন্দিবিনিময়

রাশিয়া ও ইউক্রেন হঠাৎ প্রায় ৩০০ বন্দী বিনিময় করেছে। সাত মাস আগে ইউক্রেনে রুশ হামলার পর এটাই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বন্দী বিনিময় করার ঘটনা। সৌদি আরব ও তুরস্ক এর মধ্যস্থতা করেছে। মুক্তি পাওয়া যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মরক্কোর নাগরিকও রয়েছেন। ইউক্রেনে আটক হওয়ার পর ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে অভিযুক্ত করে তাঁদের কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। রাশিয়া প্রায় ২১৫ ইউক্রেনীয়কে মুক্তি দিয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মারিউপোলে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে ইউক্রেনের দীর্ঘ সময় প্রতিরোধ গড়ে তোলা পাঁচ কমান্ডারও তাঁদের মধ্যে রয়েছেন। বিনিময়ে ৫৫ রুশ নাগরিক এবং রুশপন্থী নিষিদ্ধ একটি দলের নেতা ভিক্তর মেদভেদচুককে মুক্তি দেয় ইউক্রেন। মস্কোপন্থী এই ইউক্রেনীয় নেতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

রাত্রিকালীন ভাষণে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ‘এটি স্পষ্টভাবে আমাদের দেশ ও গোটা জাতির জন্য বিজয়। সবচেয়ে বড় কথা, ২১৫টি পরিবার তাদের প্রিয়জনকে নিরাপদ এবং বাসায় দেখতে পাচ্ছে।’ এ জন্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকেও ধন্যবাদ জানান জেলেনস্কি।

এর আগে ১০ জন বিদেশির মুক্তির বিষয়টি জানায় সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণে নিজের অব্যাহত অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যস্থতায় তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, এই ১০ জনের মধ্যে ৫ জন ব্রিটিশ নাগরিক, ২ জন মার্কিন, ১ জন ক্রোয়েশিয়ান, মরক্কোর ১ জন আর সুইডেনের ১ জন রয়েছেন। তাঁরা সৌদি পৌঁছেছেন। তাঁদের নিরাপদে নিজ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চালাচ্ছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

রাশিয়ার শাস্তি দাবি

ইউক্রেন যুদ্ধের ফলাফল পক্ষে আনতে প্রয়োজনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট। পুতিনের এ হুমকির পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিলেন জেলেনস্কি। ইউক্রেনে হামলা চালানোয় রাশিয়ার শাস্তি দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। গত বুধবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভিডিও ভাষণে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট এ দাবি জানান।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের চলমান অধিবেশনে একমাত্র জেলেনস্কিকেই ভার্চ্যুয়ালি ভাষণ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তিনি তাঁর ভাষণে ১৫ বার ‘শাস্তি’ কথাটি উল্লেখ করেন। জেলেনস্কি ইংরেজিতে ভাষণ দেন। তাঁর ভাষণটি আগে রেকর্ড করা ছিল। তিনি তাঁর সুপরিচিত সবুজ সামরিক টি-শার্ট পরে ভাষণ দেন। সাধারণ পরিষদে থাকা বিশ্বনেতারা দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান দেখান, যা বিরল।

জেলেনস্কি বলেন, ‘আমাদের ভূখণ্ড চুরির চেষ্টার জন্য ইউক্রেন শাস্তির (রাশিয়ার) দাবি করছে। হাজারো মানুষের হত্যার জন্য এ শাস্তি দাবি। নারী-পুরুষদের নির্যাতন-অপদস্থের জন্য শাস্তি দাবি করে।’

রাশিয়াকে জবাবদিহির আওতায় আনতে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের আহ্বান জানান জেলেনস্কি। তিনি বলেন, এটি হবে সম্ভাব্য সব আক্রমণকারীর জন্য একটি সতর্কবার্তা। রাশিয়ার হামলার শিকার হওয়ার জন্য ক্ষতিপূরণও দাবি করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, রাশিয়াকে তার নিজস্ব সম্পদ দিয়ে ক্ষতিপূরণের এ অর্থ দেওয়া উচিত।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা জারির পরিকল্পনা করছে। ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। পুতিনের নতুন করে সেনা সমাবেশের ঘোষণার পর ২৭টি দেশ বিভিন্ন ক্ষেত্র ও ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যক্রম দেওয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

ইউরোপ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন