পদত্যাগের ভাষণে কী কী বললেন কিয়ার স্টারমার
স্যার কিয়ার স্টারমার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদ ও লেবার পার্টির নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। আজ সোমবার এক বক্তব্যে তিনি পদত্যাগ করার ঘোষণা দেন।
বক্তব্যে স্টারমার বলেন, ‘ধন্যবাদ। সবাইকে ধন্যবাদ। দুই বছর আগে এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত। দীর্ঘ ১৪ বছর পর একটি নতুন লেবার সরকার গঠিত হয়েছিল। কয়েক বছরের হতাশা আর নৈরাশ্যের পর আমাদের দেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লাখ লাখ মানুষের জীবনকে আরও উন্নত করার এক অনন্য সুযোগ আমাদের সামনে এসেছিল। মূলত এই পরিবর্তনের জন্যই আমি রাজনীতিতে এসেছিলাম। তবে এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না।’
স্টারমার বলেন, ‘ছয় বছর আগে আমি যখন লেবার পার্টির দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তখন দলটি রাজনৈতিক, আর্থিক ও নৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। বারবার আমাকে বলা হয়েছিল, আমার দল শেষ হয়ে গেছে।’
লেবার পার্টির এই নেতা বলেন, ‘বলা হয়েছিল, আমরা ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছি। নির্বাচনে জয় তো দূরের কথা, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়াও অসম্ভব বলে অনেকে মনে করতেন। কিন্তু আমরা তাদের ভুল প্রমাণ করেছি। কারণ, আমরা আমাদের দলকে বদলে ফেলেছিলাম।’
স্টারমার বলেন, ‘আমরা দল থেকে ইহুদিবিদ্বেষের বিষ উপড়ে ফেলেছি। অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করেছি।’
প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বলেন, ‘আমরা এমন এক দলে পরিণত হয়েছি, যারা আবারও আমাদের জাতীয় পতাকার পাশে সগৌরবে দাঁড়িয়েছে। আমাদের এই পরিবর্তনের কঠোর পরিশ্রমের পেছনে ছিল একটিই উদ্দেশ্য। সেটি শুধু ক্ষমতার জন্য নয়, বরং যুক্তরাজ্যের উন্নতির জন্য।’
বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি বৈষম্যহীন দেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগিয়েছি, যেখানে থাকবে মর্যাদা ও সম্মান; যেখানে প্রতিটি মানুষ গুরুত্ব পাবে। সুযোগ-সুবিধা কেবল গুটিকয় সুবিধাভোগীর জন্য নয়, বরং সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। গত দুই বছরে আমরা যা অর্জন করেছি, তার দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন।’
এই লেবার নেতা বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের অর্থনীতি শক্তিশালী এবং সমমনা দেশগুলোর চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রতি মাসে মুদ্রাস্ফীতির চেয়েও দ্রুতগতিতে মানুষের আয় বেড়েছে। আমরা বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছি এবং অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের মধ্যে এনএইচএস বা স্বাস্থ্যসেবার দীর্ঘ প্রতীক্ষার তালিকার দ্রুত সমাধান করেছি।’
স্টারমার বলেন, এক প্রজন্মের মধ্যে শ্রমিক ও ভাড়াটেদের অধিকারের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন ঘটেছে। স্নায়ুযুদ্ধের পর প্রতিরক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ছোট নৌকায় করে অবৈধ অনুপ্রবেশ কমেছে, আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত হোটেলগুলো বন্ধ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং আমার নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলে ৫ লাখ শিশু দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেয়েছে।
কিয়ার স্টারমার বলেন, ‘বিশ্বে যুক্তরাজ্যের হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধার হয়েছে। শিষ্টাচার, সম্মান এবং আইনের শাসনের পক্ষে যুক্তরাজ্য আবারও অবস্থান নিয়েছে। আমরা বাণিজ্যিক চুক্তি নিশ্চিত করেছি, ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছি, আমাদের মূল্যবোধকে রক্ষা করেছি এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করেছি।’
স্টারমার আরও বলেন, ‘লেবার সরকার পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছিল। পরিবর্তনের জন্য লড়াই করেছিল এবং সেই পরিবর্তন নিশ্চিত করেছে।’
দুই বছরের মধ্যে পদত্যাগ করতে যাওয়া এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তবে আমি জানি, এখন প্রশ্নটি এই নয় যে—কার নেতৃত্বে লেবার পার্টি বদলেছে বা ক্ষমতায় এসেছে বা কার জন্য লাখ লাখ মানুষের জীবন উন্নত হয়েছে। সেই সব প্রশ্নের উত্তর আগেই মিলেছে।’
পদত্যাগের বক্তৃতায় স্টারমার বলেন, ‘আমার দল এখন যে প্রশ্নটি করছে, তা হলো আগামী সাধারণ নির্বাচনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমিই কি উপযুক্ত ব্যক্তি? পার্লামেন্টারি পার্টি থেকে আমি এই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি। আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছি।’
স্টারমার বলেন, ‘আমি যে সিদ্ধান্তই নিয়েছি, তা আমার প্রিয় দেশকে সবার আগে রাখার চিন্তা থেকেই নিয়েছি। এ কারণেই আমি প্রধানমন্ত্রীর পদ ও লেবার পার্টির নেতার পদ থেকে পদত্যাগ করছি। আজ সকালে আমি রাজার (রাজা তৃতীয় চার্লস) সঙ্গে কথা বলে তাঁকে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছি।’
বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি লেবার পার্টির ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটিকে (এনইসি) একটি সময়সূচি নির্ধারণ করতে বলব। এতে মনোনয়ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া ৯ জুলাই শুরু হবে এবং গ্রীষ্মকালীন ছুটির আগেই শেষ হবে। যদি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়, তবে সেপ্টেম্বরে পার্লামেন্ট আবার চালু হওয়ার আগেই দলের নতুন নেতা নির্বাচিত হবেন।’
স্টারমার বলেন, ‘এই নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি প্রধানমন্ত্রীর পদে দায়িত্ব পালন করে যাব। শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য আমি আমার পক্ষ থেকে সবকিছু করব।’
লেবার নেতা আরও বলেন, ‘আমার উত্তরসূরিকে আমি পূর্ণ ও নিঃশর্ত সমর্থন দেব। আমি জানি, দুই বছর আগে আমি যেমন যুক্তরাজ্য পেয়েছিলাম, তাঁর হাতে তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও ন্যায্য একটি দেশ থাকবে। সেই যুক্তরাজ্য ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনেক বেশি প্রস্তুত এবং দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় যাওয়ার পথে লেবার পার্টিকে সফল করার সামর্থ্য রাখবে।’
স্টারমার বলেন, ‘গত ছয় বছর যাঁরা আমার পাশে থেকেছেন, সেসব বন্ধু ও সহকর্মীর প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাঁদের অসামান্য প্রতিশ্রুতি, সেবা ও সমর্থনের জন্য আমি তাঁদের ধন্যবাদ জানাই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি যখন দেশের সবচেয়ে বড় এই দায়িত্ব ছেড়ে চলে যাব, তখন থেকে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটিতে আরও বেশি সময় দেব। তা হলো আমার প্রিয় স্ত্রী ভিকের জন্য একজন আদর্শ স্বামী হওয়া, যে ভালো-মন্দ সব সময়ে পাহাড়ের মতো আমার পাশে থেকেছে। আর আমার সন্তানদের কাছে একজন ভালো বাবা হওয়া, যারা আমার গর্ব ও আনন্দের উৎস।’