দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শুরু হওয়া শীতল যুদ্ধ ১৯৯১ সালে সমাপ্ত হলেও রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই মুখোমুখি অবস্থানে। ফলে ইউক্রেনে রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষা হবে, এমন পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র বাগড়া দেবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর থেকেও বড় কারণ রয়েছে। আর সেটা হলো রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অভিলাষ ও ইউরোপের দেশগুলোর নিরাপত্তা। এই দুটি বিষয়ই অবশ্য একটি অপরটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

পুতিনের অভিলাষের কথাই ধরা যাক। এই রুশ নেতা বিশ্বাস করেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়াটা বেদনার। এ নিয়ে ২০২১ সালের জুলাইয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছেন এই নেতা। সেটি ক্রেমলিনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এর শুরুতেই রুশ ও ইউক্রেনীয়দের সম্পর্ক নিয়ে তিনি লিখেছেন। পুতিন মনে করেন, রুশ ও ইউক্রেনীয়রা আসলে একই মানুষ।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ইউক্রেন ও অন্যান্য দেশের জন্মকে তিনি রাশিয়ার শরীর কেটে ফেলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। লিখেছেন, ‘এক হাজার বছরের বেশি সময় ধরে যেসব মানুষ আমাদের অঙ্গীভূত ছিল, তারা এখন বিচ্ছিন্ন। এটা মানা কঠিন।’

সোভিয়েত অঞ্চলের এই দেশগুলোর ইতিহাস–ঐতিহ্য তুলে ধরে প্রায় সাত হাজার শব্দের এই লেখা লিখেছিলেন পুতিন। তিনি যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া মেনে নিতে পারেননি, সেটা বারবার বুঝিয়ে দিয়েছেন এই লেখায়। এ নিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত হলো, পুতিন আসলে সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিরে পেতে চান। ক্রিমিয়া দখল কিংবা ইউক্রেনে সামরিক অভিযান এরই অংশ হিসেবে দেখা হয়।

এখানেই সংকটটা। সোভিয়েত ভেঙে গিয়ে যে দেশগুলোর জন্ম হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই আর রাশিয়ার সংস্পর্শে নেই। এখন অধিকাংশ দেশের মিত্র হলো পশ্চিমারা। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিয়েছে। এমনকি অনেকে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোতেও যোগ দিয়েছে। এখন পুতিন যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন ফেরত পেতে চান বা পূর্ব ইউরোপে তাঁর আধিপত্য বাড়াতে চান, তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অস্তিত্বের হুমকিতে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। এ ছাড়া একই সঙ্গে ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোও নিরাপত্তা–সংকটে পড়বে।

পুতিন একা পূর্ব ইউরোপকে নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে দেবেন, এটা নিশ্চয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন হতে দেবে না। একই কথা ন্যাটোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আর এখানেই আসে যুক্তরাষ্ট্রের কথা। এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শুধু তা–ই নয়, পূর্ব ইউরোপ বা ইউরোপের নিরাপত্তা যদি রাশিয়ার কারণে বিঘ্নিত হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের যে মোড়লিপনা আছে, তা যে উবে যাবে, সেটাও অনুমেয়।

আবার রাশিয়া যদি এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে একটি স্বাধীন দেশের অংশবিশেষ কিংবা পুরোটা দখল করে নেওয়ার নজির প্রতিনিয়ত স্থাপন করতে পারে, তবে তা হবে পশ্চিমা বিশ্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো। একই সঙ্গে রাশিয়া এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমা বিশ্বকে এ বার্তা দিয়ে দেবে যে তারা চাইলে ইউরোপে যেকোনো কিছুই করতে পারে।

অর্থাৎ চুক্তিগত কারণে হোক কিংবা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হোক, ইউরোপের যেকোনো বিপদে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসতে অনেকটা বাধ্য। আর এ কারণেই ইউক্রেনকে সহযোগিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

এখন এই সহযোগিতা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যা দিচ্ছে, তা আসলেই চোখে পড়ার মতো। এমন কোনো খাত নেই, যেখানে ইউক্রেনকে সহযোগিতা করছে না যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়া থেকে শুরু করে খাবার, এমনকি ইউক্রেনীয় সেনাদের বেতনের জন্য অর্থও দিচ্ছে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সরকার।

বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনের জন্য যা করছে, সেটা ঘোষণা দিয়ে করছে; কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়ে করছে। তবে বাইডেনের বিরোধী শিবির রিপাবলিকানরা এখন প্রশ্ন তুলছেন, আর কত? এই প্রশ্ন যে শুধু বাইডেনের বিরোধী শিবির তুলছে, এমনটা নয়। এই প্রশ্ন বাইডেনের দল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতারাও তুলছেন। তাঁরাও চাইছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে বাইডেন আলোচনার উদ্যোগ নেবেন। যদিও এ–সংক্রান্ত একটি চিঠি দিয়ে তা আবার ফেরত নিয়েছেন ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিশীল নেতারা।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই দলের নেতাদের মধ্যে একটি গোষ্ঠী তাদের সুর চড়াচ্ছে এটা বলে যে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দেওয়া কমাতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে। আর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পর রিপাবলিকানরা কী পদক্ষেপ নেবেন, সেটা আগেই বলেছেন দলটির প্রতিনিধি পরিষদের হবু স্পিকার কেভিন ম্যাকার্থি। তিনি বলেছেন, ইউক্রেনকে অর্থ দেওয়ার ব্যাপারে বাইডেন এত দিন যে স্বাধীনতা পেয়েছেন, তা আর থাকবে না। তবে রিপাবলিকান পার্টির সবাই যে এমনটা চাচ্ছেন, এটা নয়।
এখন প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সাহায্য কমিয়ে দেয়, তাহলেই কি ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে? এই প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর পাওয়া আসলে কঠিন। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য কমালেও সাহায্য বন্ধ করবে না। কারণ, দেশটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এই যুদ্ধ যত দিন চলবে, তত দিন ইউক্রেনের পাশে থাকবে।

আবার রাশিয়া যে এই যুদ্ধ সহজে হাল ছাড়বে না, সেটা বারবারই স্পষ্ট করেছেন পুতিন। আর সম্প্রতি ইউক্রেনে বৈদ্যুতিক অবকাঠামোয় হামলার মধ্য দিয়ে সেটা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে রুশ বাহিনী।

তাহলে সমাধান কী, সেটাই বড় প্রশ্ন। প্রথমেই বলা হয়েছে, যুদ্ধ নির্ধারিত হয় নেতাদের মর্জিতে। এখন মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষ থেকেই যদি নেতারা আওয়াজ তোলেন, বাইডেনকে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার পথ বেছে নিতে হবে। একই সঙ্গে যদি অর্থসাহায্যের পরিমাণ কমে আসে, তখন হয়তো সংকট সমাধানের পথে হাঁটতে হবে বাইডেনকে।

এদিকে রুশ সামরিক শক্তি নিয়ে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের সাম্প্রতিক অভিমত হলো, মস্কো দুর্বল হয়ে পড়ছে। এখন এটা যদি সত্যি হয় তাহলে মস্কোও আলোচনার জন্য বসতে চাইবে। কারণ, তারা পরাজয় এড়ানোর জন্য হলেও যুদ্ধের সমাপ্তি চাইবে।

অর্থাৎ প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের অবস্থান, তাতে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন এই সংকট সমাধানের পথ খুলে দিতে পারে। তবে সেই পথে হাঁটতে আরও সময়ের দরকার। আর সময়ের মধ্যে যুদ্ধে মানুষ মারা যাবে, অর্থ যাবে। মূলত ক্ষতি হবে সাধারণ মানুষেরই।


তথ্যসূত্র: সিএনএন, বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, ক্রেমলিনের ওয়েবসাইট